আমি বলেছি, পলাশ।
চমকে উঠলুম। আমার পিতা জীবনে এই বোধহয় প্রথম ভাল নাম ধরে সম্বোধন করলেন। মুখের চেহারা শীতল। চোখদুটি ইস্পাতের ফলার মতো তীক্ষ্ণ। আশ্চর্য! পিতা কি এই মহিলাকে আগলাবার জন্যে ছুটে এসেছেন? এটা কি এক ধরনের আশকারা নয়, যার উৎস মানুষের মনের দুর্বলতা? পিতা আরও ঠান্ডা আরও কঠিন গলায় বললেন, আমি বলেছি। তুমি না জেনে এইরকম রূঢ় কথা বলতে পারলে? তোমার স্বভাব দেখছি বেশ পালটেছে! পাখি তুমি, বেশ উড়তে শিখেছ, আর এ বাসার প্রয়োজন কী, তাই না?
মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আপনিও বেশ পালটেছেন।
ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেললুম, এ আমি কী বলেছি! পিতৃদেব বললেন, আমি? আমি সেই একই আছি, দ্যাট সেম ওল্ড হরিশঙ্কর। তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপারে আমি পালটেছি, কাল আমার যে বয়েস ছিল, আজ তা একদিন বেড়েছে। আগামীকাল বেড়ে যাবে আরও এক দিন। তোমার দেখার ভুল। আমি জানি তোমার কী হয়েছে! তোমার দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছে!
আপনি আমার পালটানোর কী দেখলেন?
শুনবে তা হলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
প্রথম পরিবর্তন, তোমার মধ্যে সবসময় একটা রাগের খেলা চলেছে। কোনও কথাই আগের মতো আর সহজ সরল করে বলতে পারছ না। ছিলে ফুটন্ত ফুলের মতো, হয়ে গেছ কুঁড়ি। অকারণে, আজকাল তুমি আমাকে এড়িয়ে চলতে চাও।
কারণ আছে।
জানি জানি, কারণ ছাড়া কার্য হয় না।
আপনি কারণটা সঠিক জানেন না।
হতে পারে। অনুমান সবসময় সঠিক পথে চলে না। তবে একটা কথা তোমাকে বলি, স্নেহ আর ভালবাসা দুটো মানুষকে এক সুরে বেঁধে দেয়, একই তরঙ্গে তারা কেঁপে কেঁপে ওঠে। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, বলল ঠিক কি না! সত্য বলবে। বি ফ্র্যাঙ্ক।
স্বামী নির্মলানন্দ আমাকে ফ্র্যাঙ্ক হতেই বলেছেন। কিছু চেপে রাখবে না। জলের তোড়ে ঠেলে বের করে দেবে। বললুম, ঠিক ঘৃণা নয়, তবে সমালোচনা করতে ইচ্ছে করে। আপনার সবকিছু আর আগের মতো সমর্থন করতে পারি না, মেনে নিই।
সমালোচনার মতো কিছু দেখলে অবশ্যই সমালোচনা করবে। তুমি যেমন আমার পুত্র তেমনই আমার বন্ধু। বলো তুমি, কোথায় আমি তোমার সমর্থন হারিয়েছি?
যেমন ধরুন, যেসব জিনিস আমার মা ব্যবহার করতেন, সেসব জিনিস আমার কাছে ভীষণ পবিত্র। সে জিনিস আমরা ছাড়া অন্য কেন স্পর্শ করবে?
তোমার মা কি আমার স্ত্রী ছিলেন না?
ছিলেন।
দু’জনেরই সমান অধিকার।
আমার কিছু বেশি, পবিত্রতার দিক থেকে। স্ত্রীর চেয়ে মা অনেক বেশি পবিত্র।
স্ত্রী পবিত্র নয়?
মায়ের সঙ্গে সন্তানের রক্তের সম্পর্ক।
ও, তার মানে তুমি দুটো সম্পর্কে একটা ভেদ টানতে চাইছ? একটা রক্তের, সেই হেতু পবিত্র, আর একটা দেহের, সেই হেতু অপবিত্র। দেহ কখন রক্তে এসে যায় জানো কি? তুমি তো বিজ্ঞানের ছাত্র, ফিউশন কাকে বলে জানো? জানো কি এমন বন্ধন আছে যা অবিচ্ছেদ্য, মৃত্যু ছাড়া যে বন্ধন খোলে না। জানো তুমি?
জীবিত অথবা মৃত স্ত্রীকে মানুষ ফেলে দিতে পারে, অস্বীকার করতে পারে, অবহেলা করতে পারে। মাকে তা করা যায় না, যারা করে তারা পাপী।
তার মানে? তুমি বলতে চাইছ আমি তোমার মাকে জীবিত অবস্থায় অবহেলা করেছি, আর মৃত্যুর পর ভুলে গেছি! হায় রে বিচারক! কী তার প্রমাণ।
যে-জিনিস আপনি আমাকেও স্পর্শ করতে দিতেন না, সেই জিনিস আপনি এই মহিলাকে টেনে টেনে বের করার অনুমতি দিয়েছেন, শুধু তাই নয়, অসন্তোষ প্রকাশ করায় তেড়ে এসেছেন আমাকে। অথচ এই মহিলা একদিন আপনার বিছানায় বসেছিলেন বলে, আপনি আমাকে তিরস্কার করেছিলেন।
বিছানায় বসলে এখনও করব। পুরুষের শয্যা পবিত্রস্থান, সাধনপীঠ।
আর মায়ের স্মৃতি বাজারের প্রদর্শনী! মা আর আপনাতে জীবিত নেই। এবার সত্যই তার মৃত্যু হয়েছে।
তোমার ইঙ্গিত বোঝার মতো বুদ্ধি আমার আছে, পলাশ। তবে একটা কথা, তুমি বড় তাড়াতাড়ি। সিদ্ধান্তে এসে গেছ। মানুষ সম্পর্কে তোমার কোনও ধারণা নেই।
মনে আছে, সেই জবার ব্যাপারে আপনি আমাকে কী বলেছিলেন?
তুমি কি তার রিটার্ন দিতে চাইছ?
আমি কেন, জনসাধারণ কী বলছে খবর রাখেন?
জনসাধারণ? তারা কে? আমি কি একটা পাবলিক ফিগার, যে তাদের ভয় করে চলতে হবে! আমি হরিশঙ্কর, একটা ইনডিভিজুয়্যাল ম্যান, যে শুধু তার বিবেকের নির্দেশে চলে, বিবেকের কাছে সমর্থন খোঁজে। তুমি আমাকে দেখছ না? ও, না, আমারই ভুল। তুমি তো চোখে দেখো না, তুমি দেখো কানে, লাইক স্নেকস।
আপনি সংসারের চাবি এই ভদ্রমহিলার হাতে তুলে দিয়েছেন কেন? জানেন এই চাবি আমার মায়ের আঁচলে বাঁধা থাকত!
এতে তোমার মহাভারত এমন কী অশুদ্ধ হল? তোমার শিক্ষা কি পরকে আপন করতে শেখায়নি? কনফিডেন্স শব্দটা কি তোমার কাছে অপরিচিত! তোমার বউ আসুক এ চাবি তো তারই। এটা তো স্টপ গ্যাপ।
বউ কোনওদিনই আসবে না। আমি বিয়ে করব না।
তুমি আমাকে ছোট করে বিদ্রোহ জানাতে চাও?
আপনি ছোট হবেন না, জেনে রাখুন সেই মেয়েটি চরিত্রহীন।
তার মানে? এও কি তোমার এক নতুন আবিষ্কার?
নিজের চোখে দেখা।
আশ্চর্য! চরিত্রহীনতা চোখে দেখা যায়। সে তো অনুসন্ধানের বস্তু, আবিষ্কার করতে হয়।
সত্যের মতো মানুষ হোঁচট খেয়েও তার ওপর পড়তে পারে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে আমি সেই সত্যের ওপর পড়ে গেছি। মেয়েটি আমার চেয়েও ভাল একটি ম্যাচ জোগাড় করে ফেলেছে। তার সঙ্গেই সারা কলকাতা চষে বেড়াচ্ছে। তা ছাড়া, সেদিন বাগবাজারের মোড়ে পঙ্কজবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তিনি আমাকে এমন একটা কথা বলেছেন, যা শুনলে আপনাদের এতদিনকার বন্ধুত্ব বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
