আমার এইসব বিশ্বাসের কথা আমি কাউকে বলতে পারব না, বলতে চাইও না। কে শুনবে। পাগল ভেবে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবে। আমি জানি, এ সংসার ছেড়ে মা এখনও যেতে পারেননি। তিনি অন্য তরঙ্গে, আমাদের চোখে ধরা পড়ে না এমন রূপে বর্তমান। মাতামহ তা হলে অমন তুলসী তুলসী করতেন না। তার সেই দৃষ্টি ছিল। তিনি ছিলেন গৃহী তান্ত্রিক। তার অনেক বিভূতি ছিল। অদ্ভুত অদ্ভুত সব দুর্ঘটনা থেকে পিতৃদেব কীভাবে রক্ষা পেয়ে আসছেন? এ পাড়ায় আমাদের শত্রুর তো অভাব নেই। মাঝে মাঝেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কে তাদের দাঁত ভেঙে দেন! গুরুজনের সঙ্গে আমি তর্কে নামতে চাই না, আমি শুধু আমার বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই।
এই যে কাকিমা এখন ড্রয়ার খুলে সব কাপড়চোপড় গোছগাছ করতে লেগেছেন, কার হুকুমে! নিজের অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। ড্রয়ারের দ্বিতীয় খোপে আমার মায়ের কিছু শাড়ি আর ব্লাউজ আছে, রেশমের মতো নরম এক ধরনের পেটিকোট আছে। কী যেন তার নাম, স্যারাঙ্গ না সারঙ্গ। সব ছেড়ে ওইসব নিয়ে টানাটানি করছেন কেন! জানেন না ওগুলো হল পবিত্র স্মৃতি! আমি ঘরে বসে আছি, একবার আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলেন না। পিঠের দিকে আঁচলে ঝুলছে চাবির থোলো। আমাদের সংসারের চাবি কবে কীভাবে ওঁর অধিকারে চলে গেল! তাজ্জব ব্যাপার! ভদ্রমহিলা কি আমার মায়ের স্থান অধিকার করতে চাইছেন? চেহারায় বেশ একটা লাবণ্য এসেছে। রং যেন ফেটে পড়ছে। চোখে এক ধরনের জ্যোতি এসেছে। সব ব্যাপারেই বাড়তি উৎসাহ। ধরে আনতে বললে বেঁধে আনেন।
মাঝে মাঝে আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখছি। খুব শুদ্ধ দৃষ্টি নয়। শুদ্ধ হলে শরীরের চিন্তা আসত না। এই মহিলার পাশাপাশি থেকে সাধনভজন অসাধ্য। আচারের ঘরে অম্বলের রুগি বাঁচতে পারে না! তিলে তিলে মৃত্যুই আমার কপালের লিখন।
ভদ্রমহিলা মাঝে মাঝে এটা সেটা প্রশ্ন করছেন, যার উত্তরে আমাদের পারিবারিক ইতিহাস বেরিয়ে আসবে। মায়ের সঙ্গে আমার পিতার সম্পর্ক কেমন ছিল! জানেন আমার কিছুই জানার কথা নয় তবু যতসব মেয়েলি প্রশ্ন। কোনওটারই উত্তর আমি দিচ্ছি না, হুঁ হাঁ করে যাচ্ছি বা চুপ করে থাকছি। এক একটা জিনিস বেরোচ্ছে, প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসছে, উত্তর ফিরছে না।
আমি খাটে পাশ ফিরে শুয়ে আছি। পিতৃদেব দ্বিপ্রহরের আহারের পর সামান্য বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমার শরীরও ভাল নয়, তা ছাড়া মাতুল আজ সন্ধের ট্রেনে ফিরে চলেছেন। আজ আর আমার অফিসে যাওয়া হল না। দেরাদুনে যাবার সময় এগিয়ে আসছে। আর তানানানা করে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। কাকিমা মাতুলের সঙ্গে যেতে রাজি হলেন না। ভদ্রমহিলার প্রখর মানসম্মান বোধ। বললেন, ওখানে গেলে তো আমার মতো থাকতে হবে। এ কথা আর কাউকে অবশ্য বলেননি, বলেছেন আমাকেই, একান্তে। শুনে আমি স্তম্ভিত। সেই মুহূর্তে খুব খারাপ একটা কথা আমার জিভের ডগায় এসেছিল, কোনওরকমে আটকে ফেলেছিলুম, তা না হলে বলেই ফেলতুম, খেতে পেলে শুতে চায়!
হঠাৎ ভালবাসা কেন কুৎসিত ঘৃণার চেহারা নিল! কারণটা কী? স্বামী নির্মলানন্দ বলেছেন, নিজেকে অনুসন্ধান করো। অনুসন্ধানের ফলে যেসব বস্তু বেরিয়ে আসছে, দেখে চমকে উঠছি। কর্পোরেশনের ম্যানহোলে মনে হয় এর চেয়ে কম ময়লা জমে আছে। মনটা একেবারে পচে গেছে। অ্যামপুট না করলে বাঁচার আশা নেই। কুৎসিত এক ধরনের ঈর্ষায় ভেতরটা পুড়ছে। সর্বনাশ! আমার দেবোপম পিতৃদেবকে কি আমি রাইভ্যাল মনে করতে শুরু করেছি! আমার আত্মহত্যা করা উচিত। সাধুসঙ্গে সগ্রন্থপাঠে আমার ঘোড়ার ডিম হবে। আমি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছি। ঘরে বসে বসে, কারুর সঙ্গে না মিশেও আমি গোল্লায় চলে গেলুম। ভেকের মতো ভোগী একটা সত্তা ভেতরে বসে কর্কশ ডাক ছাড়ছে।
আমার সমস্ত চিন্তায় ছেদ পড়ে গেল। কাকিমা খুব সুন্দর একটা সিল্কের শাড়ি নিয়ে আমার খাটের পাশে এসে দাঁড়ালেন, “দেখেছ, কী সুন্দর শাড়ি তখন তৈরি হত! একেবারে নরম তুলতুলে। ডিজাইনটা দেখো একবার! কী তখন থেকে শুয়ে শুয়ে উ উ করছ! ওঠো না।
কাকিমা আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে ওঠাতে চাইলেন। মেয়েদের এ এক ধরনের দানবীয় সোহাগ। ভালবাসার জোয়ারে হজম করা যায়, ঘৃণায় মনে হয় অসহ্য উৎপাত। চুল ধরে তুলতে গিয়ে হাত ফসকে শাড়িটা পাটে পাটে ভেঙে মেঝেতে ধসে পড়ল। দুটো কান আমার গরম হয়ে উঠল। ধৃষ্টতা সীমাহীন! মৃত মানুষ আর দেবতায় কোনও তফাত আছে! এই শাড়িতে আমার মায়ের স্পর্শ, ঘ্রাণ লেগে আছে। যিশুখ্রিস্টের অঙ্গাচ্ছাদনের মতো এই বস্ত্র পবিত্র, আমার কাছে হোলি বাইবেলের মতো।
উঠে বসে বললুম, এ কী করছেন আপনি? এসবে আপনাকে কে হাত দিতে বলেছে। বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে! এ বাড়ির আপনি কে? হু আর ইউ!
রাগের ঝেকে এক নিশ্বাসে কথাটা বলে ফেললুম। অনেকক্ষণ ধরে একটু একটু করে জমছিল। থাইসিসের রুগির ফুসফুসক্ষরিত রক্তের মতো। অপমানে ভদ্রমহিলার টুকটুকে ফরসা মুখ লাল হয়ে গেল। মেয়েদের কী অদ্ভুত মন! সঙ্গে সঙ্গে চোখের কোলে জল এসে গেল। একটি করুণ ছবি ধীরে ধীরে ভোরের শিশির-ভেজা ফুলের মতো চোখের সামনে ফুটে উঠল। নিচু হয়ে অতি যত্নে শাড়িটি তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটি সাদা স্ট্যাচুর মতো পিতৃদেব ঘরে এলেন।
