স্বামীজি আমাকে দেখে দু’চরণ গান গেয়ে উঠলেন: তোমার চরণ পেয়ে হরি! আজকে আমি হেসে মরি/কী ছাই নিয়ে ছিলাম আমি, হায় রে কী ধন চাহি নাই।
বড় সুন্দর সাধা গলা। এই গানটি আমার মাতামহ প্রায়ই গাইতেন। গানটি আমার জানা। আমার এই মুহূর্তের আবেগের সঙ্গে ভীষণ খাপ খেয়ে যাচ্ছে। প্রথম চরণটি গাইবার লোভ সামলাতে পারছি না। গেয়েই ফেললুম, আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্ব-ঘরে পেতাম না ঠাই/ দু’জন যদি হত আপন, হত না মোর আপন সবাই।
স্বামীজি সোৎসাহে বললেন, এই তো, এই তো, বেরিয়ে এসো। সহজ হও, সুন্দর হও, নির্মল হও। বৈরাগ্য, বৈরাগ্য। নিত্য আমি অনিত্যরে আঁকড়ে ছিলাম রুদ্ধ দ্বারে/ কেড়ে নিলে দয়া করে তাই হে চির! তোমারে চাই।
অনুচ্চ কণ্ঠে, সন্ধ্যার আবেশে, আমাদের দুজনের কণ্ঠ বাতাসে ভেসে ভেসে মহালোকের দিকে পবিত্র পাখির মতো উড়ে গেল। এমন বৈরাগ্যের ভাব আগে কখনও অনুভব করিনি। স্বামীজি আমার পাশে এসে মাথায় হাত রাখলেন। সে স্পর্শের কী অনুভূতি! কোথায় লাগে প্রেয়সীর হাত, পিতার হাত, মাতার হাত। স্নেহ আমরা কাকে বলি! এ স্পর্শে স্নেহের স্নেহ, প্রেমের প্রেম, ভালবাসার ভালবাসা। আবেগে চোখে জল এসে গেল।
স্বামীজি বললেন, কী হবে সংসারে থেকে! এমন একটা মন যখন পেয়েছ, আধারটিকে শুদ্ধ করে আত্মোপলব্ধির দিকে এগিয়ে চলল। তুমি অর্থ দিয়ে অর্থের সঙ্গে লড়তে পারবে না, তুমি ক্ষমতা দিয়ে ক্ষমতার সঙ্গে পারবে না, তুমি হিংসা দিয়ে হিংসার সঙ্গে পেরে উঠবে না। জাগতিক সবকিছুরই বড়র ওপর বড় আছে। প্রভুর ওপর মহাপ্রভু। একমাত্র বৈরাগ্যই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যার ওপরে আর কেউ নেই। বিহায় কামান যঃ সর্বান পুমাংশরতি নিঃস্পৃহঃ/ নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ॥ বৎস চরৈবেতি, চরৈবেতি।
হে রাজেন্দ্র, তোমা কাছে নত হতে গেলে
যে ঊর্ধ্বে উঠিতে হয় সেথা বাহু মেলে
লহো ডাকি, সুদুর্গম বন্ধুর কঠিন
শৈলপথে অগ্রসর করো প্রতিদিন—
চলো, ঘরে চলো, কী এনেছ দেখি! টোম্যাটো সসের বোতলটা নিয়ে এসো।
প্লেটে ফিশফ্রাই, স্যালাড, সস, মনে বৈরাগ্য। আকাশে সন্ধ্যা। নীচে আরতির আয়োজন। সামনে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। শুধু সন্ন্যাসী নন, মহা পণ্ডিত। মন, তুমি আর কী চাও!
১.৬৭ হে অন্তরযামী ত্রাহি
আমি সব মেনে নিতে পারি, পারি না কেবল একটা জিনিস, আমার মায়ের ছেড়ে যাওয়া সংসারে। অন্যের কর্তৃত্ব। অন্যের বিশ্বাসে আমি হাত দিতে চাই না; কিন্তু আমার নিজের একটা বিশ্বাস আছে। মানুষের এই আসা আর যাওয়ার পরও, সংগীতের মতো একটা রেশ থেকে যায়। দেহ থেকে মুক্তি পাবার পর আত্মার স্বাধীনতা বেড়ে যায়। যেখানে আছি, সেখানে আছি, যেখানে নেই সেখানেও আছি। বিজ্ঞান ঘোড়ার ডিম কী বলবে! তার পরিধি কতটুকু! দুইয়ের পাশে দুই রেখে গুনবে, এক দুই-তিন-চার। এক যে চার হতে পারে, অনন্ত হতে পারে সেই সত্যটি জানা আছে কেবল সাধকদের। কবিদেরও সে অনুভূতি আছে। তা না হলে এমন লাইন আসে কোথা থেকে?
একি জ্যোতি, একি ব্যোম দীপ্তদীপ-জ্বালা
দিবা আর রজনীর চির নাট্যশালা
একি শ্যাম বসুন্ধরা, সমুদ্রে চঞ্চল
পর্বতে কঠিন, তরু পল্লবে কোমল,
অরণ্যে আঁধার। এ কি বিচিত্র বিশাল
অবিশ্রাম রচিতেছে সৃজনের জাল
আমার ইন্দ্রিয়যন্ত্রে ইন্দ্রজালবৎ।
প্রত্যেক প্রাণীর মাঝে প্রকাণ্ড জগৎ। সাধকের কথা মিথ্যে, আর টেস্টটিউব নাড়া বিজ্ঞানীর কথা সত্য! যাঁরা না চাখলে মিষ্টির মিষ্টতা স্বীকার করেন না, যারা না দেখলে অস্তিকে নাস্তি করে দেন, তাদের কথায় কল চলতে পারে, মানুষ চলতে পারে না। কেউ না জানুক আমি জানি, এ বাড়ির সর্বত্র মায়ের অস্তিত্ব বর্তমান। একটা কাসার বাটি জোর করে মাটিতে কে বসাবার পর পাশ থেকে দেখলে কী দেখা যাবে? বাটিকে ঘিরে আর একটি বাটি কাঁপছে। অস্তিত্বের এই কম্পন মানুষের বেলায় অত সহজে বিলীন হয় না। কত লক্ষ যোনি ঘুরে মানুষের জন্ম! জীবচক্রের শেষ ক্রম। তারপর কী? সৃষ্টি বিজ্ঞানীরা জানেন না। জানেন সাধক। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, গান থেমেছে? বলব, হ্যাঁ থেমেছে, কিন্তু সুর ভেসে আছে।
কুলদানন্দ ব্রহ্মচারীজির ডায়েরি আমি লাইন বাই লাইন পড়েছি। ভাগলপুরের কাছে বস্তি বলে একটি অঞ্চলে ব্রহ্মচারীজির দাদা থাকতেন। সেখানে নির্জন একটি ঘরে সেই মহাপুরুষ রাতে যে-খাটে শুতেন, সেই খাটটি রোজ রাতে এসে কেউ প্রচণ্ড ঝাঁকিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে চলে যেত। বন্ধ ঘরে মাঝরাতে এই উৎপাতের কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ছিল না। হাসপাতাল-সংলগ্ন আবাসস্থল। ব্রহ্মচারীজির অগ্রজ বললেন, আশ্চর্য হবার কিছু নেই, হতেই পারে। বহু অবাঞ্ছিত মৃত্যু এখানে প্রতিদিন হচ্ছে, বহু আত্মা ঘুরছে চারপাশে। সংলগ্ন হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে, একটি বেডের কথা তিনি বললেন। সেই শয্যায় যাঁকেই রাখা হত, তিনিই পরের দিন তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাতেন। কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সেই খাটে যে ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল, মৃত্যুর পরেও তিনি তার অধিকার ছাড়তে পারেননি। মাঝরাতে এসে আগন্তুকের বুকে চেপে বসে কিল চড় ঘুসি মারতেন। খামচে দিতেন। অবশেষে তুলে ফেলে দিতেন নীচে। কোনও সাধক নিশ্চয়ই ভূতের গল্প বানাবেন না। সাধারণ মানুষের মতো তারা ভূতের ভয়ও পাবেন না। যা সত্য তা সত্য। যার বিশ্বাস আছে তার আছে। প্রেত যদি বায়বীয় একটা ব্যাপারই হবে, তা হলে তার ওজন আসে কোথা থেকে! বুকে চেপে বসলে দম বন্ধ হয়ে আসে কেন? যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই না থাকবে, তা হলে কিল চড় ঘুসি মারে কী করে! সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যেই একটা অজ্ঞাত বিজ্ঞান রয়েছে। পরমহংস বিশুদ্ধানন্দজির কাছে গেলে বুঝিয়ে দিতেন, সূর্যবিজ্ঞানে সবই সম্ভব। সূর্যের রশ্নিজালের মিলনে, গঠনে, অমিলনে, বস্তুজগতের উদ্ভব। সেই মহাত্মা শুধুমাত্র হাতে নাড়াচাড়া করে গাঁদাকে গোলাপ আবার সেই গোলাপকে জবাতে রূপান্তরিত করতে পারতেন সকলের চোখের সামনে অক্লেশে। তিনি বলতেন সূর্যবিজ্ঞানই সৃষ্টিতত্ত্বের মূল রহস্য। সেইজন্যে সূর্যের আর এক নাম সবিতা। এর পাশাপাশি আরও বিজ্ঞান আছে, যেমন চন্দ্রবিজ্ঞান, বায়ুবিজ্ঞান, নক্ষত্রবিজ্ঞান, শব্দবিজ্ঞান, ক্ষণবিজ্ঞান। এসব জ্ঞান তিনি পেয়েছিলেন তিব্বতে থাকার সময়। তিনি প্রয়োজন বোধে তার শরীরের যে-কোনও অঙ্গকে আকারে বিশাল ও বিপুল করে ফেলতে পারতেন। যেমন আদেশ করার সময় তাঁর তর্জনীকে তিনি এমন স্ফীত করতে পারতেন আদিষ্ট বিস্ময়ে হতবাক হতেন। আমাদের চোখের, কানের, মনের অনেক পরিমিতি আছে। আমরা সব শব্দ শুনতে পাই না, সব আলো দেখতে পাই না। আমাদের মগজের তিনের চার অংশ ঘুমিয়ে আছে। তাকে জাগাবার কৌশল সাধারণ মানুষের নেই। একের চারেই এত সব হচ্ছে। সাধকরা বলেন, ধ্যান করো। বিক্ষিপ্ত মনকে অন্তর্মুখী করো। সহস্রদলকে বিকশিত করো। তখন দেখবে, তুমিই বিশ্ব, বিশ্বই তুমি। যেখানে লয় নেই, ক্ষয় নেই, রূপান্তর আছে। সূর্যের সহস্রধারায় বস্তুপুঞ্জ অণুতে পরমাণুতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন গঠিত পুনর্গঠিত হচ্ছে। একই বহু, বহুই এক। বিশুদ্ধানন্দজি বলছেন, সমস্ত বস্তুর ভেতরেই সমস্ত বস্তু অল্পবিস্তর আছে। পরমাণুর গ্রহণ আর বর্জনই বস্তুর এক এক রূপে আবির্ভাব ও বিলয়। জড় বিজ্ঞানীর কাছে বিজ্ঞানের কী-ই বা শেখার আছে! কিছু দেখা, আর সেই দেখার ওপর ভিত্তি করে কিছু সূত্র নির্মাণ। কিছু শিখতে হলে যেতে হবে যোগীর কাছে, যাঁরা বলছেন: সূর্যই হল সব বিজ্ঞানের মূল স্তম্ভ। সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার এককথায় জাগতিক আর ব্যবহারিক সবকিছুই সূর্যাধীন। ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞানশক্তি, ক্রিয়াশক্তির উৎস সূর্যমণ্ডল। শুধু তাই নয়, সূর্যের পথ ধরে দেবান সম্ভব। সূর্যই মুক্তির দ্বার। যোগে আর বিজ্ঞানে কোনও তফাত নেই, তফাত শুধু প্রণালীতে। যোগের পথে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের পথে যোগ দুই-ই সম্ভব।
