ভেতরে দুটি চিতা তখনও জ্বলছে। বাঁধা বটতলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আপনজনেরা বসে আছেন। ভালবাসার, ভালবাসবার নশ্বর দেহখাঁচা চোখের সামনে চড়চড় করে পুড়ে যাচ্ছে। হাড়ফাটার অট্টহাসি মানুষের সমস্ত অহংকারের ওপর ফোয়ারার মতো ঝরে পড়ছে। জীবনের সব চিৎকার মৃত্যুর মুঠোয়। খাঁটিয়ার বাঁশ খুলে নিয়ে সাহসী একজন চিতার সামনে, আর একজন বলছেন, দাও দাও এইবার মাথাটা ভেঙে দাও। ফটাস করে একটা শব্দ হল। কিছু আগুনের ফুলকি পড়পড় করে আকাশের দিকে
লাফিয়ে উঠল। আমার ভেতরটা যেন ছিটকে উঠল। মৃতের আসরে জীবিতেরা বড় অসহায়।
মাতামহ ধীরে ধীরে সাজানো কাঠের তলায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে চিতায় অগ্নি প্রজ্বলিত হল। শিখা উঠছে, ক্রমশই ওপরে উঠছে। শোক নয়, কেমন যেন স্তম্ভিত অবস্থা আমার। দিগ্বিদিক আলোকিত করে ফসফরাসের মতো রুপোলি একটা দ্যুতি মাতামহের অবয়ব নিয়ে সোনালি আগুনের মধ্যে দুলতে লাগল। অলৌকিক দৃশ্য। সকলে একসঙ্গে গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলেন হরি ওম্। হরি ওম্।
» ১.৬৫ সামনে যখন যাবি ওরে
দেহ যে মন্দির একথা কোনওদিন অনুভব করেছ?
স্বামী নির্মলানন্দ প্রশ্ন করে চেয়ারের পেছনে হাসিহাসি মুখে পিঠ রাখলেন। সামনের টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্র। খান তিনেক মোটা মোটা বই। একটি দামি কলম। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পার্কার। স্বামীজি আজ গেরুয়া টুপি পরেছেন। সাধারণত সন্ন্যাসীরা যে ধরনের টুপি পরেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ, কখনও ক্ষণিকের তরে ওইরকম একটা অনুভূতি হয়, তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
কেন হয় না?
একগাদা চামচিকি ঢুকে কিচিরমিচির শুরু করে দেয়। সময় সময় দেহ বলে যে একটা বস্তু আছে সেই কথাটাই ভুল হয়ে যায়।
কে ভোলায় কখনও লক্ষ করেছ?
হ্যাঁ, করেছি। যেমন ধরুন কোনও একটা জায়গায় যেতে হবে, তখন দেহ নয়, হাঁটাটাই বড় হয়ে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে, তখন দেহের কথা মনে পড়ে! আক্ষেপ আসে, কেন আমি অফুরন্ত পথ অক্লেশে হেঁটে যাবার শক্তি রাখি না! কেন আমি আরও সক্ষম দেহের অধিকারী হতে পারিনি! সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা আসে, কোনও ধনীর পরিবারে জন্মালে আমি ছেলেবেলায় আরও ভালমন্দ খেতে পেতুম! ব্যস দেহ ভুলে গেলুম, চোখের সামনে ভাসতে লাগল প্রাচুর্যের স্বপ্ন। কী করলে ধনী হওয়া যায়! হাঁটছি, হেঁটেই চলেছি, তবে আমি নয়, হাঁটছে ধনীর স্বপ্ন, হাঁটছে। পরিকল্পনা। আই এ এস পরীক্ষাটা দিতে পারলে, ডি এম ডি এম মানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। বিরাট একটা জেলার রাজা। ফাঁইল, ডাকবাংলো, গাড়ি, প্রচুর ক্ষমতা। পরমুহূর্তেই আক্ষেপ, কেন আমি সেই ধরনের ভাল ছেলে হতে পারলুম না, যার কাছে যে-কোনও কমপিটিটিভ পরীক্ষা জলভাত। এই করতে করতে পথ ফুরোল। যে কাজে যাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলুম, তখন সেই কাজটাই বড় হয়ে উঠল। এইভাবে অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন চলেছেই চলেছে। কার দেহ, দেহেই বা কে কদাচিৎ মনে পড়ে। কখনও লোভ, কখনও অহংকার, কখনও ক্রোধ, কখনও হিংসা, এক এক ধরনের প্রবৃত্তি এক এক সময় জেগে ওঠে। এ যেন জুড়ি গাড়ি যে চড়ে সেই তখন মালিক। সাঁই সাঁই চাবুক ঘুরছে গাড়ি চলছে কদম কদম।
বাঃ বলেছ ভাল। আচ্ছা, এই মুহূর্তে তোমার কি দেহবোধ হচ্ছে?
আজ্ঞে না, এখন কথার নেশায় আছি। শুরুতে একটু লজ্জা ছিল। লজ্জার ভাব কেটে এল আত্মম্ভরিতা। বেশ কথা দিয়ে কথা গেঁথে গেঁথে এমন কিছু বলতে হবে যাতে আপনার মনে হবে, ছেলেটা খুব ইনটেলেকচুয়াল। মনে হলে কী হবে, আপনি আমার লেখাটা ছাপবেন।
তোমার লেখা তো আমি ছাপবই বলেছি। কিন্তু প্রথম দিনেই যে আমার অহংকার জাগিয়ে দিয়েছেন।
অহংকার কীভাবে জাগালুম?
ওই যে বলেছিলেন, আমি ভেবেছিলুম কোনও রিটায়ার্ড জেন্টলম্যানকে দেখব। আমার অহং যার অর্থ করেছে, আমার বুদ্ধি বয়সের তুলনায় অনেক ম্যাচিয়োর, আমার অনেক বেশি পড়াশোনা। আমি আপনার সমতুল্য কিংবা তার চেয়েও বেশি। আবার এই যে আমি সব বলছি, এর পেছনেও একটা ইচ্ছে ঠ্যালা মারছে, যে আমাকে বলছে, এমন কিছু বলল যা অনেকটা সেলফ-অ্যানালিসিসের মতো হয়। তাতে তোমার এই লাভ হবে, তুমি যাকে বলছ, তিনি তোমাকে সাধারণের চেয়ে অন্য চোখে দেখবেন।
স্বামীজি হাত তুলে আমাকে থামতে বললেন। থামার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে কেমন যেন বোকাবোকা লাগছে। বাতুল, বাঁচাল। দুটি উজ্জ্বল চোখ নির্নিমেষে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার অন্তঃসত্তা ক্রমশই যেন নগ্ন হয়ে পড়ছে। বেলুন যেভাবে চুপসে যেতে থাকে আমি সেইভাবে চুপসে যেতে লাগলুম। ন্যালব্যালে একটা রবারের ল্যাতকানো আবরণের মতো পড়ে রইলুম মেঝেতে। ছি ছি, এ আমি কী করলুম?
স্বামীজি জিজ্ঞেস করলেন, কী ভাবছ এখন?
ভাবছি, ছি ছি, এ আমি কী করলুম!
এ ‘আমি’টা তোমার কোন ‘আমি’?
আজ্ঞে?
এ ‘আমি’ তোমার কোন ‘আমি’? চোখ বুজিয়ে বসে একটু ভাবো। সার্চ উইদিন। আমাদের ক’টা ‘আমি’?
দুটো।
রাইট, একটা তোমার দেহের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অনেকটা মিউকাস মেমব্রেনের মতো। চুলকুনি কাকে বলে জানো? খোস, পাঁচড়া, দাদ, হাজা?
আজ্ঞে হ্যাঁ, জানি।
থেকে থেকে চুলকে ওঠে। অসংখ্য মাইক্রোসকোপিক জার্মস যেই নড়েচড়ে ওঠে অমনি চুলকোতে ইচ্ছে করে। মলম লাগাতে হয়। লাগাতে লাগাতে একদিন সেরে যায়। দ্রষ্টা ‘আমি’র হাতে এই ‘দেহবদ্ধ আমি’টাকে সমর্পণ করে দাও, কমপ্লিট সারেন্ডার, এলোমেলো বিশৃঙ্খল ‘আমি’র নির্দেশ মানব না। তুমি কে? আমি কি তোমার দাস?
