এইবার বুকের মাঝখানটা কেমন করে উঠল। এখন নির্জনে বসে একটু কাঁদতে পারলে বেশ হত! ফোঁটা ফোঁটা জল জীবনের চিড়-খাওয়া জমিতে পড়ে প্রথম বর্ষার গন্ধের মতো আকুল করে তুলত। সে অবসর এখন আমার নেই। জগন্নাথ কঁদতে পারে, বিষ্টুদা পারেন, মায়ার পিসিমা আঁচলে চোখ মুছতে পারেন। তুলসীর মালা ঘুরিয়ে জপ করতে পারেন। আমার এখন সে সময় নেই।
সন্ন্যাসী স্তোত্র শেষ করে চোখ মেললেন। সারাঘর দেখে নিলেন। তারপর মায়ার পিসির দিকে তাকিয়ে বললেন, মাইজি ইধার আইয়ে।
একপাশে ফুলের ঝুড়ি। গোলাপ, রজনীগন্ধা, পদ্ম সব মিলিয়ে লিলি অফ দি ভ্যালির মতো অদ্ভুত এক গন্ধ তৈরি করে বাতাসে ছুড়ছে। মায়ার পিসিমা ধীর নম্রতায় সামনে এসে প্রণাম করে বসলেন।
মাতামহের অঙ্গরাগ শুরু হল। পিসিমা ভাগ্যবতী মহিলা। সন্ন্যাসীকে সাহায্যের তিনিই অধিকারী হলেন। চোখের সামনে কত কী যে ঘটতে লাগল! কর্পূরের আগুনে সোনার তবক পুড়িয়ে মস্তকের মধ্যদেশে স্থাপন করা হল। তার ওপর চন্দন চর্চিত বিল্বপত্র স্থাপিত হল। মন্ত্রোচ্চারণের গুনগুন শব্দে ঘর মুখরিত। সর্বঅঙ্গে চন্দনের তিলক। প্রশান্ত কপালে সুবৃহৎ একটি রক্তচন্দনের ফোঁটা। মুদিত নয়নে রাখা হল চন্দন-লেপিত তুলসীপত্র। গলায় গোড়ের মালা। রেশমের উত্তরীয় দুই স্কন্ধের ওপর দিয়ে নেমে এল বুকের কাছে। রাজযোগীর রাজবেশ। চলেছেন রাজাধিরাজের দরবারে। অন্তহীন কালপ্রবাহে মহাকালের সিংহদুয়ার খোলা। মহারাজের সিংহাসন ঘিরে অনন্ত দরবার চলেছে। যার যখন আমন্ত্রণ আসে, সেজেগুঁজে চলে যায়।
সব আয়োজন শেষ হল। এইবার মনে হয় যাত্রা শুরু হবে। মাতুল কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। আর একটু পরেই রাত ভোর হবে। রেডিয়োর ঘোষক বলতে থাকবেন, নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে গ্রামাফোন রেকর্ডে গান বাজিয়ে শোনানো হচ্ছে। চিন্তা ছিঁড়ে গেল। পিতা বললেন, মহারাজ, আমার খুব ইচ্ছে, এই বাড়ির বাগানে এঁকে সমাহিত করি। এখানে আপনার একটা আসন হোক।
নেহি বেটা।
পিতা বললেন, তা হলে চন্দন কাঠে দাহ করার ব্যবস্থা হোক। আহা এইসময় আমার অক্ষয়টা যদি থাকত!
ঘরের দূর কোণ থেকে কে যেন বললেন, থাকত কী, আমি তো রয়েইছি।
সেকী তুমি কখন এলে? লক্ষ করিনি তো!
অনেকক্ষণ এসেছি হরিদা। আজ হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরছিলুম, হঠাৎ কে যেন বললে, একবার ঘুরে যা। চন্দন কাঠ তো! তা একবার হীরালালের কাছে চলে যাই?
তাকে ভোরের আগে পাচ্ছ কোথায়?
সাধুজি বললেন, নেহি বেটা, চন্দন কাঠ জরুরৎ নেহি। অ্যায়সাই হো যায়গা।
শেষ ক’টা দিন মাতামহ যে-ঘরটিতে কাটিয়ে গেলেন, দোর ঠেলে সেই অন্ধকার ঘরে একবার গেলুম। নিভাঁজ শয্যা। শেষ চাঁদের আলোর গলিত একটু অংশ বিছানায় শুয়ে ছিল। পাশের টেবিলে কীটদষ্ট সেই সাধনসংগীতের বইটি। নিখুঁত ভাঁজ করা সাদা একটি গামছা। মানুষের প্রয়োজন কত সামান্য! বাদামি রঙের ন্যাকড়ার সেই জুতোটি বাইরে কোথাও আছে। খড়ম পরতে ভালবাসতেন। খাটের পাশে খড়ম জোড়াটি হয়তো অপেক্ষা করে আছে। ভোর হয়ে আসছে, এইবার সেই পা দুটি এসে জাগিয়ে তুলবে। জানে না, হাঁটার ছুটি হয়ে গেছে! আধো আলো আধো অন্ধকার ঘরে সব আছে নেই কেবল একজন। টেবিলে ঝকঝকে বাটি চাপা এক ড্যালা ছানা, গোটা দশ বারো ভেজানো কিসমিস, দুটি খেজুর। কাঁসার গেলাসে চাপা জল। কাকিমা সব আয়োজন সম্পূর্ণ করে রেখে গিয়েছিলেন। আসর ভেঙে গেলেই রাতের সামান্য আহার শেষ করে শয্যা নেবেন। কেউ নেই, তবু মনে হল শূন্য ঘরে সেই লঘু তরল কণ্ঠস্বরটি বেজে উঠল, কী করে বেড়াচ্ছিস? আয় এখানে বোস। তোর মায়ের ছেলেবেলার গল্প শোন। কেন তুলসী নাম রেখেছিলুম জানিস? আমি ঘোর শাক্ত। তোর দিদিমা ছিল ঘোর বৈষ্ণব। শাক্তের ঘরে তুলসী এল। যিনিই শ্যাম তিনিই শ্যামা।
চলে এসো।
পিতৃদেবের গম্ভীর গলা। এইবার আমরা বেরোব। সিলি সেন্টিমেন্টের আর সময় নেই।
যে সময় রাত চলে যায়, সেই সময়ে আমাদের যাত্রা শুরু হল। মাতামহের অসাধারণ এই দেহত্যাগের সংবাদ ঠিকই ছড়িয়েছে। ভোরের সেই স্নানার্থী সন্ন্যাসী, যিনি গঙ্গায় চিত হয়ে ভেসে ভেসে ঘাট থেকে ঘাটে চলে যান, তিনি যে মাতামহকে চিনতেন আমার জানা ছিল না। খাটের পাশে পঁড়িয়ে পড়ে বললেন, চললে রাজা রাজনারায়ণ! দু’পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, আচ্ছা চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। ইচ্ছে যখন হয়েছে। আবার ফিরে এসে হাত দিয়ে খাট স্পর্শ করে দাঁড়ালেন। নাম সংকীর্তনের দল রোজকার মতোই নগর পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন, তারাও স্বেচ্ছায় আমাদের শবযাত্রার অনুগামী হলেন।
হরিদ্বারের সন্ন্যাসীর ঝুলিতে জগন্নাথের ফুল। তিনি মুঠো মুঠো ফুল ছড়াচ্ছেন। সংকীর্তনে প্রভাতী সুর। আমার মাতামহ চললেন চিরযাত্রায়। যে-পথ চলে গেছে আগুনের শিখায় উধ্বমুখে। এরপর আজ যাঁরা গঙ্গার স্নানে যাবেন, তারা দেখবেন সারাপথে ছড়িয়ে আছে পদ্ম আর গোলাপের পাপড়ি, রজনীগন্ধা। তারা ভাববেন কেউ হয়তো অভিসারে গেছে। হ্যাঁ এও তো অভিসার!
মর্গ দেখেছি। শ্মশান এই প্রথম। পাশ দিয়ে বহুবার গেছি, ভেতরে কোনওদিন ঢুকিনি। স্থানটি বড় মনোরম। সামনেই একটি গেট। মাধবীলতা ঝুলছে। বড় বড় হরফে লেখা মহাশ্মশান। সেই শ্মশানই মহাশ্মশান যেখানে অতীতে কোনও মহাপুরুষ অগ্নিশয্যা পেতে গেছেন। শ্মশানের চোখে নিদ্রা নেই। দেখেই মনে হচ্ছে, সারারাত জেগেই ছিল। আলো এখনও জ্বলছে। ভিজে কাপড়ে একটি দল আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেলেন। দু-এক ছিটে জল গায়ে লাগল। এঁদের সারা হয়ে গেল। আমাদের এইবার শুরু হবে। কীর্তন যখনই থামছে কানে আসছে পাখির ডাক।
