স্বামীজি, এই ‘আমি’টা আবার কে? তৃতীয় কোনও ‘আমি’?
ভাল প্রশ্ন। আচ্ছা, তুমি আগুনের শিখা ভাল করে দেখেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, রোজই দেখি। লেবরেটরির টেবিলে সারি সারি বুনসেন বার্নার জ্বলে।
তিনটে অংশ দেখতে পাও? একটা নীল অংশ, তাকে ঘিরে লাল একটা অংশ, তার বাইরে সাদাটে একটা অংশ। বাইরের অংশ, যেটাকে বলে পেরিফারি, সেই অংশটি সদা চঞ্চল, বাতাসে হেলছে দুলছে, ফড়ফড় করছে। তারপরের অংশটি স্থির, শিখার সবচেয়ে উত্তপ্ত অংশ, দাহিকা শক্তি সবচেয়ে বেশি। নীল অংশটি শিখার আত্মপুরুষ। স্থির, শীতল। তোমার আঙুল ঢোকালেও পুড়বে না। এই নীল, শীতল অংশটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিশিখা। মানুষও তো শিখা। নিথর নিষ্কম্প। নীলাভ আত্মপুরুষ, পরেরটি জ্ঞানপুরুষ যার অহরহ প্রার্থনা, হিরন্ময়েন পাত্রেন সত্যাপি হিতং মুখং, তৎ ত্বং পূষণ অপাৰ্বণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে। প্রশ্ন উঠছে সেই জ্ঞানময় কোষ থেকে। সংশয়ী, প্রশ্নকারী। তার ওপর বসে আছে বালকবৎ চঞ্চল প্রাণময় আমি। সে কখনও অভিমানী, কখনও ক্রোধী, লোভী, কখনও উদার, কখনও সহিংস, কখনও অহিংস। কিন্তু তোমার কী হয়েছে। জানো?
আজ্ঞে না।
তোমার শিখাঁটি বড় কেঁপে কেঁপে জ্বলছে। ভেতরটা বড় কুঁকড়ে আছে। জ্ঞানময় আবরণীটি পূর্ণ তেজে বিকশিত হতে পারছে না। প্রশ্ন করো, কেন? লণ্ঠনের কাঁচটিকে ভাল করে পরিষ্কার করো। সাধুর কমণ্ডলুও রোজ মাজতে হয়, তবেই ঝকঝকে থাকে। ভেতরটাকে টেনে বাইরে আনো। ছোট, উদ্যান নয়, চাই তেপান্তরের মাঠ। দিগন্তকে যত পেছোতে পারবে, মন তত ভাল দৌড়োবে। সব জানলা দরজা খুলে দাও, একটু আলো বাতাস আসুক।
কী করে খুলব?
কেটে বেরিয়ে পড়ো। সংসারে তোমার কীসের আকর্ষণ? ভগবান তো পথ পরিষ্কার করেই। রেখেছেন। তোমার সবচেয়ে ভালবাসার মানুষ মাতামহ চলে গেলেন। তোমার পিতা বড় চাকরি। করেন। তিনি অথর্ব নন, যে সেবা করতে হবে। স্বভাবে স্বাবলম্বী। তুমি তার সেবা করো না, তিনিই মা-মরা ছেলেটির সেবা করেন। তুমি কেবল পাকা পাকা কথা বলো আর গুমরে গুমরে মরো। তোমার হল ব্রুডিং নেচার। এইবেলা তোমার হাল না ধরলে, তুমি নিউরোটিক হয়ে যাবে। কিছু। পেতে হলে বলিষ্ঠ হতে হবে। ঠাকুর বলতেন ডঙ্কামারা হৃদয় চাই। ঘায়ের মাছির মতো ভ্যানভ্যানে হলে, সংসার তোমাকে গিলে চেনেবাঁধা ক্রীতদাস করে ফেলে রাখবে। এইসব শোনার পর এখন তোমার কেমন লাগছে?
আজ্ঞে, খুব খারাপ। মনে হচ্ছে পাংচার্ড।
ম্যানেনজাইটিস বলে একটা অসুখ আছে, শুনেছ নিশ্চয়?
হ্যাঁ শুনেছি। রুগি সাধারণত বাঁচে না।
ট্রিটমেন্ট জানো? লাম্বার পাংচার করতে হয়। মেরুদণ্ড থেকে খানিকটা ফ্লুইড বেরিয়ে যায়, রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তোমার অহং খানিকটা বেরিয়ে গেল। মানুষ বাড়ি রং করে, বছর বছর। জানলায় দরজায় রং চাপায়, নিজের ভেতরেও যে রং ধরাতে হয়, সেই সত্যটিই ভুল হয়ে যায়। পুরনো সংস্কার সব ফেলে দাও, বেদিটি মুছে পরিষ্কার করে আলপনা লাগাও, নীরবে অপেক্ষা। করো, গুহাশায়িত সেই পরমপুরুষ হঠাৎ একদিন আবির্ভূত হবেন, তোমার ক্ষীণ পাণ্ডুর আমি বলিষ্ঠ আমি হয়ে উঠবে। উত্তিষ্ঠত জাগ্রত/ প্রাপ্য বরান্ নিবোধত। ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া/ দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি। কী মানে? ওঠো, জাগো। শ্রেষ্ঠ আচার্যের কাছে গিয়ে জ্ঞানলাভ করো। জ্ঞানীরা সেই পথকে দুরতিক্ৰমণীয় তীক্ষ্ণ ক্ষুরধারার ন্যায় দুর্গম বলেন। তা হলে, তুমি আগে মেঝে থেকে ওঠো। সেপাইয়ের লাঠির মতো হেলে থেকো না। এই নাও টাকা।
টাকা?
হ্যাঁ, কিনে নিয়ে এসো।
কী কিনে আনব?
একটু আগে আমার এখানে আসার সময়, তোমার যা খেতে ইচ্ছে করছিল।
অবাক হয়ে বললুম, সে তো ফিশফ্রাই! আপনি! আপনি কী করে জানলেন?
পড়ে, তোমাকে পড়ে। ভাবনা ভাষা হয়ে অক্ষরে ধরা থাকে। মাধ্যম, কাগজ, ছাপার কালি। যে ভাবনা ভাষা পায়নি তা লেখা হয় অন্তরে, এক ধরনের ম্যাগনেটিক কোডে। আমি যদি তুমি হই, তুমি যদি আমি হও, মানুষ মানুষের কাছে খোলা বইয়ের মতো। বলল, তোমার ফিশফ্রাই খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল কি না?
আজ্ঞে হ্যাঁ, হয়েছিল। শ্যামবাজারের মোড়ের সেই বিখ্যাত দোকানের সামনে দিয়ে আসার সময় ইচ্ছেটা একবার উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ফ্রাই কি খাওয়া উচিত! ধর্মের পথে…।
ধর্মের সঙ্গে আহারের কোনও সম্পর্ক নেই।
অনেকে বলেন।
ধর্ম কি অতই সহজ পলাশ, যে মাছ ছেড়ে দিলেই ঈশ্বর এসে ধরা দেবেন! ডিম না খেলে তিন দিনে মোক্ষলাভ! তা হলে গোরুকেই তো গুরু বলে ধরতে হয়। সারাজীবন খড় আর ভুষি খেয়ে মাঠেঘাটে হাম্বা হাম্বা করে বেড়ায়।
১.৬৬ নিত নাহানসে হরি মিলে তো
আপনি টাকা দেবেন কেন? আমার কাছে আছে।
আজ্ঞে না। তোমার টাকা তোমার কাছেই থাক। এই নাও, স্যালাড নিতে ভুলো না। শুধু ওষুধে কিছু হয় না, সঙ্গে অনুপান চাই।
রাস্তায় নেমে আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, সবই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কত রকমের সাধনমার্গ আছে কে জানে! কোনও মতে, কৌপিন সার। কোনও মতে, সিল্কের গেরুয়া। এই সুন্দর বিকেল, মাতামহের কথা মনে পড়ছে। এমনি বিকেলে আমাদের দুজনের কত জায়গায় যাবার ছিল। কোনওদিন নৌকাবিহার, কোনওদিন সাধুসন্দর্শন। মাঝেমধ্যে উলটোপালটা কথা বলে ফেলতেন আর লেগে যেত লোকের সঙ্গে ধুমধাড়াক্কা। একদিন তো মাঝগঙ্গায় নৌকোর ওপরেই হাতাহাতি বেধে যাবার উপক্রম। একদল হালুইকর এপার থেকে ওপারে যাচ্ছিল। খুব ক্যালোর ব্যাপোর করছে নিজেদের মধ্যে। মাতামহ গলুইয়ের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে কেবল বলছেন, ধ্যার ব্যাটা, ধ্যার ব্যাটা। সেই হল সূত্রপাত। মাতামহ এক স্মৃতি ফেলে রেখে গেছেন, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, তিনি কি নদী ছিলেন! জীবনের দু’পাশে অজস্র উপলখণ্ড ছড়িয়ে ছড়িয়ে চলে গেছেন। আজ স্বামীজির কাছে এসে মনটা যেমন হালকা হয়ে গেল, সেইরকম ঘুলিয়েও গেল। মনের তলদেশে অনেক মাটি জমে ছিল। কে জানত! নিজেও জানতুম না। আধ্যাত্মিক মানুষেরা সবই কেমন সহজে টের পেয়ে যান।
