দুখিয়া এসে গেছে। জগন্নাথ নিচু হয়ে আঁকার দু’পাশ ধরে বললে, নে তোল। বাবুরা এসে গেছেন। যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছি, জগন্নাথ বললে, আপনার বিয়ে কবে লাগছে?
আমার বিয়ে?
হ্যাঁ, রাজাবাবু এর আগে যেদিন এসেছিলেন, আমাকে বললেন, জগন্নাথ, আমার শেষ কাজ নাতির বিয়ে। ছেলের বিয়েতে কী দেখেছ! ধুমঘটা করব। বেনারস থেকে সানাই আনাব, বাজি পুড়বে। দু’হাজার টাকার ফুল দিয়ে বাড়ি সাজাব। আমি বললুম, বাবু শীতে করুন। ফুল দিয়ে কীভাবে সাজাতে হয় আমিও দেখে নোব। কৃষ্ণনগর থেকে মালাকার আনাব। আচ্ছা নমস্কার!
দু’পা এগোতেনা-এগোতেই জগন্নাথ আবার জিজ্ঞেস করলে, কাল কী আছে? এত ফুল যাচ্ছে! আশীর্বাদ।
আর তো চেপে রাখা যায় না। এবার তো সত্যি কথা বলতেই হয়। বিষ্টুদার দিকে তাকালুম। জবাব তিনিই দিলেন, রাজাবাবু মারা গেছেন।
অ্যাঁ, সেকী? কখন মারা গেলেন?
ঠিক যে সময়ে তোমার দোকানে এসে ফুলের অর্ডার দিলেন ঠিক সেই সময়ে।
জগন্নাথ অবাক হয়ে বললে, তা হলে কি…
হ্যাঁ, তুমি ধরেছ ঠিক, যাবার পথেই বলে গেছেন।
অসম্ভব, অসম্ভব বলে জগন্নাথ কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল। হাতের মুঠোয় আমার দেওয়া একশো টাকার নোটটি ধরা ছিল। নোটটা আমার দিকে এগিয়ে ধরে বললে, এই নিন, এ ফুলের দাম আমি নিতে পারব না।
ফুলের দাম নেবেন না কেন? এত টাকার ফুল!
যাবার আগে আমাকে শেষ দর্শন দিয়ে গেলেন। আমাকে কী ভীষণ ভালবাসতেন আপনারা জানেন না। আমার একমাত্র ছেলেটা গতবছর ন্যায় মরেই যেত। কতরকম ওষুধ জানতেন! কী এক দাগ খাইয়ে দিলেন, ছেলেটা ভাল হয়ে গেল। বললেন, যাঃ ব্যাটা, এবারের মতো বেটি ছেড়ে দিলে। জীবনে পাপ কাজ করিসনি, তা হলে কোনওদিন আর দুঃখ পেতে হবে না।
কথা বলতে বলতে বাঁ হাতে কেঁচার খুঁট তুলে জগন্নাথ চোখ মুছল। গলা ধরে এসেছে। ধরাধরা গলায় বললে, বউটাকে ধরে রোজ খুব পিটতুম। রাজাবাবু ছিলেন অন্তর্যামী। আমাকে বললেন, যে-বাড়িতে মেয়েছেলে কাঁদে সে বাড়ি পাপের বাড়ি। কাঁদতে হয় তুই কাদ ব্যাটা, তাড়াতাড়ি উদ্ধার পেয়ে যাবি। আমি তাকে গুরুর মতো মানতুম। সেই দিন থেকে আমি আর গায়ে হাত তুলিনি। আর সেই দিন থেকে আমার ভাগ্য ফিরে গেছে। আমি আজ অনাথ হয়ে গেলুম। ব্যাটা ফুলঅলা বলে কে আর আমাকে ভালবাসবে!
বিষ্টুদা বললেন, নাও, টাকাটা ফিরিয়ে নাও।
টাকাটা নিতেই হল। জগন্নাথ বললে, আপনারা এগিয়ে যান। আমিও আসছি। কিছু ভাল ধূপ নিয়ে যাই। বিষ্টুদা যেতে যেতে বললেন, একজন মানুষ কী ছিলেন বোঝা যায় মৃত্যুর পর। বেঁচে থেকে অনেকেই লম্বাচওড়া মারতে পারে, মরলে কেউ আর ফিরেও তাকায় না। কত ছোট মানুষে বড় মানুষ থাকে দেখেছ? সামান্য ফুলঅলা জগন্নাথ আগে নেশাভাঙ করত, বউকে ধরে পেটাত, একজন মানুষের কথায় কীরকম পালটে গেছে! স্বভাবচরিত্র, স্বাস্থ্য। ভাবতে পারো। ব্যাবসাদাররা একটা পয়সার জন্যে মরে বাঁচে, সেই ব্যাবসাদার একশো টাকার ফুল ভালবেসে দিয়ে দিলে! ঠাকুর বলতেন না! হাজার বছরের অন্ধকার ঘর যেই একদিন একটা দেশলাই কাঠি জ্বালালে সব অন্ধকার অমনি নিমেষে চলে গেল।
যত আমাদের বাড়ির কাছাকাছি আসছি ততই একটা সুর ভেসে আসছে। অনেকটা স্তোত্রপাঠের মতো।
মায়ার পিসিমা সিঁড়ির একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ওপরে ওঠার সাহস নেই। আমাদের দেখে ভয়ে ভয়ে বললেন, আমি যেতে পারি?
অনুমতি নিয়ে আমাদের পেছন পেছন উঠতে লাগলেন। মহিলা কবে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন জানি না। যবে থেকে দেখছি, গেরুয়াই পরেন। মাথায় জটা ধরেছে। হলঘরের সবকটা আলো জ্বলছে। বাড়ির মিয়োনো ভাবটা হঠাৎ কেমন কেটে গেছে! মৃত্যুর মতো মৃত্যু যেন জন্মের সমান! এই কি সেই সত্য, তোমার জন্মও নেই মৃত্যুও নেই। তুমি মনে করলেই তুমি আছ। তুমি নেই মনে করলে তুমি নেই। বুদ্ধের বাণী স্মরণে আসছে, যে জানে এ জীবন তরঙ্গশীর্ষে ভাসমান ফেনার মতো, মরীচিৎকার ছায়ার মতো, সে কামনার শতদলে লুক্কায়িত মৃত্যুর তীক্ষ্ণ শরসন্ধান ব্যর্থ করেছে। যমরাজের অলক্ষ্যে তার চলার পথ সামনে, আরও সামনে।
হরিদ্বারের সেই জ্যোতির্ময় সন্ন্যাসী মুদিত নেত্রে স্তোত্রপাঠ করে চলেছেন। শুধুমাত্র তানপুরাটি বেজে চলেছে। নাদগম্ভীর কণ্ঠ। গোবিন্দং গোকুলানন্দং গোপালং গোপীবল্লভম। গোবর্দ্ধনং ধরং ধীরং তং বন্দে গোমতীপ্রিয়ম ॥ নারায়ণং নিরাকারং নবীরং নরোত্তম। নৃসিংহং নাগনাথঞ্চ তং বন্দে নরকান্তম্ ॥
ঘামতেল মাখা দেবীদুর্গার মুখ যেমন সন্ধিপুজোর সময় চকচক করে মাতামহের মুখ সেইরকম চকচক করছে। কেমন করে এইভাবে মৃত একটি শরীর বসে আছে। জীবন যে কত বড় তামাশা, মাতামহের প্রাণহীন দেহের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মৃত্যুর পথরেখায় মাতামহের প্রায় আশি বছরের ভোগ করা খোলসটি পড়ে আছে। আমি কি প্রকৃতই শোকার্ত! শোক নয়, কেমন যেন একটা শূন্যতার বোধে মন আচ্ছন্ন। আমাকে যিনি সবচেয়ে ভালবাসতেন তিনি আর সেই আদরের নাম, পাতুরানি বলে ডাকবেন না। ঠোঙা থেকে একটি গরম আলুর চপ বের করে ফিসফিস করে বলবেন না, খেয়ে নে চট করে। দুর্বাসা মুনি দেখলে আর রক্ষে থাকবে না। সাধুসন্ত কোথায় কে এলেন, আর সে খবর এনে বলবেন না, চল জীবনটা সার্থক করে আসি। সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শক, সবচেয়ে বড় বন্ধু, থাক তুই পড়ে, বলে আপন মনে চলে গেলেন। নিষ্ঠুর আপনি, স্বার্থপর আপনি।
