সেকী?
তা হলে তুমি আসো না কেন? কেন আসো না?
কথা বলতে বলতে মায়া কোমরে আঁচল জড়াচ্ছে। মায়ার ঠোঁটদুটো ভারী পাতলা। মুখটা পানের মতো। চোখদুটো অদ্ভুত সজীব। আমি কিছু বোঝার আগে খপ করে দু’হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে মাটি থেকে অনেকটা উঁচুতে তুলে ফেলল, নাও এবার ব্রহ্মদত্যি হয়ে পাতা ঘেঁড়ো। ধেড়ে ধেড়ে কাটা আছে, খোঁচা খেয়ে মোয়রা না যেন।
সেই কোন কালে শিশু ভোলানাথ মায়ের কোলে উঠত। আজ মায়ার কোলে। টাটকা কচি কচি পাতা এখন আমার হাতের নাগালে। শরীরের নিম্নাংশ এদিকে বড়ই অসহায়। ভাঙা বেদির ঢকঢকে ইটে মায়া তেমন অবলম্বন পাচ্ছে না। অল্প অল্প টলছে। দুজনে একসঙ্গে হুড়মুড় করে পড়ে না যাই!
মায়া বললে, হয়েছে? আর তোমাকে রাখতে পারছি না। আগের চেয়ে একটু মুটিয়েছ।
আমি বললুম, হয়েছে, এইবার নামাও।
ধীরে ধীরে পা দুটো মাটিতে নেমে এল। মায়া তখনও জড়িয়ে ধরে আছে।
কী হল ছাড়ো!
যদি না ছাড়ি?
মায়া, প্লিজ, আমার দাদু মারা গেছেন। তুমি জানো না, এর চেয়ে শোকের আমার কাছে আর কিছুই নেই।
মায়া অনায়াসে বললে, দাদুরা মরবেই। এ আবার এমন শোকের কী? বুড়ো হলেই মানুষকে মরতে হয়।
তুমি ছাড়ো মায়া, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ছাড়তে পারি, যদি কথা দাও আজকালের মধ্যে তুমি অবশ্যই আসবে।
হ্যাঁ আসব।
মনে থাকে যেন হাতে বেলপাতা।
মনে থাকবে।
আচ্ছা তুমি না বলছিলে, জাত মানো না!
না মানি না, ওসব সেকেলে বিচার।
তুমি আমার ঠোঁটে চুমু খেতে পারবে?
মায়ার প্রস্তাবে স্তম্ভিত হয়ে গেলুম। এ আবার কী অদ্ভুত আবদার! হঠাৎ মনে হল স্বামীজি যদি জাত যায় কি না দেখার জন্যে ব্রাহ্মণেতর জাতির হুঁকো খেয়ে থাকতে পারেন, আমি পারব না কেন, তার মন্ত্রশিষ্য হয়ে?
মায়া চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে বললে, কী? পারবে?
হ্যাঁ, পারব।
তবে দাঁড়াও, ঠোঁটদুটো জিভ দিয়ে বেশ করে ভিজিয়ে নিই। নাও এসো।
মায়া দু’হাত দু’পাশে মেলে এমনভাবে এসো বললে, সারাশরীর কেমন যেন করে উঠল। ঈশ্বর আমার চলার পথেই কি যত গর্ত খুঁড়ে রেখেছেন! এক কদম এগোই কী একটা করে গর্তে গিয়ে পড়ি। এই অন্ধকারে বেলতলায় এ কী কাণ্ড! পিসি অবিলম্বে মায়ার কেন বিয়ে দিচ্ছেন না! মায়ার সময় হয়েছে।
রক্ত দিয়ে মানুষ ঋণ শোধ করে। আমি আমার ঠোঁট ক্ষতবিক্ষত করে বেলপাতা নিয়ে নিজেকে ধিক্কার জানাতে জানাতে রাস্তা হাঁটছি। নিজেও এক শয়তান। অছিলার অভাব নেই। পাপের পথে যেতে চাস তো যা, আধ্যাত্মিক নজির খাড়া করিস কেন! ক্ষুদ্র কীট পর্বতের সঙ্গে তুলনা!
বিষ্টুদা সামনের কল থেকে জল নিয়ে দোকানে ঢুকছিলেন। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কী ব্যাপার পিন্টু, তুমি এত রাতে ডালপালা নিয়ে বাজারের দিকে চললে কোথায়?
এমন একজন মানুষকে সব কথাই বলা যায়। বললুম, বিষ্টুদা, একটু আগে দাদু মারা গেলেন। গান গাইতে গাইতে সমাধি।
সেকী?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বাজারে যাচ্ছি ফুল কিনতে। এই যে বেলপাতা জোগাড় করেছি অতি কষ্টে।
একটু দাঁড়াও, আমি তোমার সঙ্গে যাই। একা পারবে না। আরও তো অনেক কিছু কিনতে হবে। এত রাতে দোকানপাট কি ভোলা পাবে!
ফুলের দোকান কি খোলা থাকবে না?
না থাকলেও জগন্নাথের বাড়ি আমার চেনা। সেখান থেকে তুলে নোব। রাত বারোটার আগে বিষ্টুদার দোকান বন্ধ হয় না। আজ আমাদের জন্যে সাড়ে ন’টার মধ্যেই ঝাঁপ ফেলে দিলেন। বিষ্টুদা হনহন করে হাঁটেন। আজ হাঁটার বেগ আরও বেশি। হাঁটতে হাঁটতে বারেবারে বলছেন, আহা, বড় পুণ্যাত্মা মানুষ, আহা, বড় পুণ্যাত্মা মানুষ। আমরা কি আর এভাবে যেতে পারব! ভুগে, ভুগিয়ে তবে যাব।
ফুলের দোকান খোলাই ছিল। এরকম সাধারণত হয় না। সবে ফুলের চালান এসেছে। এক ঝাঁকা টাটকা ফুল, আর মালা। গোলাপ আছে, পদ্ম আছে, রজনীগন্ধা আছে। বিষ্টুদা বললেন, বাঃ, অনেক ফুল।
জগন্নাথ বললে, ফুল যে সব বিক্রি হয়ে গেছে।
বিক্রি হয়ে গেছে মানে?
রাজাবাবু সব নিয়ে নিয়েছেন। বলে গেলেন, আমার নাতি এসে দাম দিয়ে নিয়ে যাবে।
রাজাবাবু কে?
ওই যে রাজনারায়ণবাবু, যাঁর ছেলে জয়নারায়ণবাবু, বিরাট বড় গাইয়ে।
আমি অবাক হয়ে বললুম, সেকী? আমিই তো তার নাতি। তিনি কখন এসেছিলেন?
তা হবে। দেড়ঘণ্টা কি দু’ঘণ্টা হয়ে গেল। ওঁর যত ফুল তো ব আমার দোকান থেকেই যায়। আমার বাবা সাপ্লাই করতেন, এখন আমি করি। পুজোপার্বণের তো শেষ ছিল না! ছেলের বিয়েতে হাজার টাকার ফুল কিনেছিলেন।
আমি বলতে যাচ্ছিলুম, সেকী, দু’ঘণ্টা আগে তো তিনি জগৎ ছেড়ে চলে গেছেন।
বিষ্টুদা একটা খোঁচা মারলেন। মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। বিষ্টুদা জগন্নাথকে বললেন, কত দাম?
ওঁর জিনিস বেশি আর কী নোব! শ’খানেক দিয়ে দিন।
বিষ্টুদা আমাকে বললেন, টাকা আছে? না, আমি দোব!
না না, আমার কাছে অনেক আছে।
জগন্নাথ বললে, টাকার চিন্তা করছেন কেন? না থাকে পরে দিয়ে যাবেন।
না, টাকা আছে। কিন্তু এত ফুল বইবে কে?
জগন্নাথ হাসতে হাসতে বললে, সব ব্যবস্থা আছে।
দোকান ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসে হাঁকতে লাগলে, দুখিয়া দুখিয়া!
গায়ে গোলাপি রঙের সিল্কের গেঞ্জি। গলায় সোনার হার। চওড়া পাড় দিশি ধুতি। বড় বড় চুল। কেষ্টঠাকুরের মতো মুখ। ফুল বেচার মতোই চেহারা। একেবারে ফুলবাবু। জগন্নাথ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছে, রাজাবাবু এখন কেমন আছেন?মাঝে বলেছিলেন, শরীরটা তেমন ভাল যাচ্ছে না। আজ দেখলুম একেবারে ফিট। বয়েস যেন পঞ্চাশ বছর কমে গেছে। একেবারে রাজবেশ। তাকালে চোখ আর ফেরাতে ইচ্ছে করে না। সাধমানুষের ধরনই আলাদা।
