বেড়ার পাশ দিয়ে অন্ধকার ছায়াঘেরা পথ। আঁস্তাকুড়ে সাদামতো একটা বেড়াল বসে ছিল। পায়ের শব্দে থমকে থমকে পালাল। মন্দিরের দরজা বন্ধ। রাতের মতো দেবী শয্যা নিয়েছেন। ধূপ আর ধুনোর গন্ধ এখনও বাতাসে ভাসছে। মায়ার পিসিমা দাওয়ায় বসে দুলে দুলে মহাভারত। পড়ছেন। অনেকটা গোঙানির মতো শোনাচ্ছে। মাটির উঠোনে তার ছায়া দুলছে।
মায়া দেয়ালে পিঠ দিয়ে সামনে পা ছড়িয়ে বসে ছিল। আমি দাওয়ার পাশে দাঁড়াতেই সে হাই তুলল। গোটাকতক তুড়ি বাজিয়ে জিজ্ঞেস করল, কে ওখানে? অন্ধকারে আমি তেমন স্পষ্ট নই। উত্তর দিলুম, আমি পিন্টু।
তুমি? তা কী মনে করে? পথ ভুলে গেছ নাকি?
মায়া উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর দু’হাত তুলে আড়ামোড়া ভাঙল। এত দুঃখেও আমি দেখলুম, মায়ার শরীরে জোয়ার এসেছে।
১.৬৪ ফলপাকা বেলী ততী
মায়া আমার সামনে দাওয়ায় এসে বাঁশের বাতা ধরে সামনে ঝুঁকে দোলখাওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়াল। আমি এক ধাপ নীচে মেটে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখের সামনে মায়ার বুক শরীরের আন্দোলনে থরথর করছে। বিকেলে চুলে তেল দিয়ে বড় খোঁপা বেঁধেছে। কপালে কাঁচপোকার টিপ। পাশ থেকে লণ্ঠনের আলো ছিটকে এসে মুখের একপাশে পড়ে চিকচিক করছে।
মায়ার পিসিমা বললেন, এসো বাবা এসো। এতদিনে আমাদের মনে পড়ল? ঘর থেকে একটা আসন এনে দে মায়া।
আমি এখন বসতে পারব না। দুটো বেলপাতা নিতে এসেছি।
মায়া হিহি করে হেসে মাথার চুল খামচে দিয়ে বললে, পার্বতীর কাছে যাও, মহাদেবের মাথায় রাত বারোটার সময় একমাত্র তিনিই বেলপাতা ফেলতে পারেন, আর নয়তো দস্যু রত্নাকর।
এরা কেউই জানে না আমি আজ কী মন নিয়ে এখানে এসেছি। মায়ার দেহতত্ত্ব, পিসিমার ধর্মতত্ত্ব, সবকিছুই আজ স্বাদহীন। আমি খুব মৃদুস্বরে বলতে বাধ্য হলুম, মায়া, এইমাত্র আমার দাদু মারা গেলেন।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে গুছিয়ে দাঁড়াল। আর সামান্যতমও চপলতা নেই। পিসিমা মহাভারত মুড়ে রেখে বললেন, অ্যাঁ, সেকী! অমন স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ মানুষ! এই তো কালও দেখলুম বেশ সুস্থ মানুষ!
ঘণ্টাখানেক আগেও সুস্থ ছিলেন। গান গাইতে গাইতে সমাধি।
সমাধি?
হ্যাঁ বসে বসেই মৃত্যু। ব্রহ্মতালু খুলে গেছে।
বলো কী, সাধকের মৃত্যু? শুনেছি, খুব সাধন-ভজন করতেন।
মায়া বললে, বেলপাতা যে গাছে। রাতে বেলগাছে হাত দিতে আছে গো পিসি!
ঘরে চৌকির তলায় দেখ না। চুবড়িতে আছে কি না!
মায়া লণ্ঠন নিয়ে ঘরে ঢুকল। পিসি বললেন, হ্যাঁ বাবা, আমি একবার দেখতে যেতে পারি?
কী উত্তর দেব ভেবে পেলুম না। পিতৃদেব নিষেধ করেছিলেন, মৃত্যুর কথা রাষ্ট্র কোরো না। কেন তা জানি না। বেলপাতা নোব অথচ কিছু বলব না, তা কী করে হয়? আমতা আমতা করে বললুম, হা হ্যাঁ, কেন আসতে পারবেন না! নিশ্চয় পারবেন।
অনেকে এসেছেন?
না না। আপনাকেই আমি প্রথম বললুম। মৃত্যুর কিছুক্ষণ পরেই আশ্চর্যজনক ভাবে হরিদ্বার থেকে এক সন্ন্যাসী এলেন। দাদুর গুরুদেব।
সাধকের মৃত্যুসংবাদ এইভাবে বাতাসে ছড়ায়।
মায়া গোটাকতক শুকনো বেলপাতা হাতে সামনে এসে দাঁড়াল। মায়াটাকে আমি আর কিছুতেই মানুষ করতে পারলুম না। এত কাছাকাছি গায়ে গা লাগিয়ে এসে দাঁড়ায়, নিজেরই লজ্জা করে। এইভাবে কোনদিন আমার একটা দাবি জন্মে যাবে, তখন আমার জায়গায় অন্য কাউকে দেখলে হয়তো খুনই করে ফেলব!
মায়া বললে, দেখো, এতে হবে?
একেবারে শুকিয়ে গেছে!
জানি এতে হবে না। পিসি, গাছে হাত দোব?
তুই হাত দিসনি। ব্রাহ্মণ মানুষকেই বল। বেলগাছে ব্ৰহ্মদৈত্য থাকে। আর একটা লণ্ঠন জ্বেলে নে।
অন্ধকার ঝুপসি বাগান। অসংখ্য ঝিঁঝি ডাকছে। মজা পুকুরে একটা ব্যাং কটর কটর করে অন্ধকার চিবোচ্ছে। ঝোঁপের মধ্যে খসখস করে কী সব চলে বেড়াচ্ছে। মনে হয় সাপ। গরমকাল, সাপেদের এই তো নিশাভ্রমণের সময়। আঙুলে একটু ঠুকরে দিয়ে গেলেই হল। মৃত্যুশোকে এত কাতর হলে কী হবে, নিজের জীবনের চিন্তা কত প্রবল!
মায়া আমার পাশে। মাঝে মাঝে আমার পায়ে তার শাড়ির তলার অংশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কাঁধে কাঁধে ঠোকাঠুকি হচ্ছে। সরু পথ। লম্বা লম্বা ঘাস। পুকুরে হাঁচি পানা। জোলো গন্ধ ছাড়ছে। পুরনো পাঁচিলের গা ঘেঁষে বেলগাছ। বেশ ডালপালা মেলেছে। কোনও এক সময় তলায় একটা বেদি ছিল। ভেঙে উলটেপালটে পড়ে আছে। বেলগাছের কম তেজ!
মায়া লণ্ঠনটা নীচে রাখল। ঝোপে আলো পড়েছে। রাতের বেলা ঝোঁপঝাঁপ কেমন যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে। অসংখ্য চোখ সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে যেন বলাবলি করছে- এরা কারা! বেলগাছের সবকটা ডালই আমার হাতের নাগালের বাইরে। ডিঙি মেরে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করা গেলেও টেনে নামানো সম্ভব নয়। মায়া বললে, দাঁড়াও, ওভাবে হবে না। হয় তুমি আমাকে কোলে তুলে ধরো, না হয় আমি তোমাকে তুলে ধরি।
লণ্ঠনের আলোয় মায়ার দিকে একবার তাকালুম। ভরাট স্বাস্থ্য। নিটোল নিতম্ব। আমি জড়িয়ে ধরতে পারি। তুলতে পারব না। মায়া আমার মুখ দেখে বললে, বুঝেছি। তুমি ব্রাহ্মণ, আমার ছোঁয়া পাতা তুমি নেবে না।
কী বলছ তুমি? আমাদের পরিবারে জাতের বিচার নেই।
খুব আছে। ব্রাহ্মণ শূদ্র না থাক বড়লোক গরিবলোক আছে।
