বাথরুমে?
কনক বললে, এসো, দু’জনে মিলে যতটা পারি তুলি।
তুমি আবার হাতে কালি মুখে কালি করবে কেন?
আমার অপকর্ম আমাকেই সামলাতে হবে।
এতক্ষণ আমরা কেউই লক্ষ করিনি, কেমন সহজে তুমি-তে নেমে এসেছি! পাশাপাশি বসে কালি ভোলা হচ্ছে। বোতলের পাপ বোতলেই ফিরে যাচ্ছে একাকার হয়ে। ঘরে একটি মাত্র ছোট জানলা। তেমন আলো বাতাস আসে না। বেশ গরম হচ্ছে। এই প্রথম টের পেলুম, বেদান্তেও যা লেখা নেই, নারীদের শরীর থেকে অদ্ভুত একটা গরম হলকা বেরোয়। দীর্ঘ রৌদ্রদগ্ধ মাটিতে প্রথম বৃষ্টি পড়লে যেমন একটা সুবাস ছড়ায়, তেমনি একটা গন্ধও আছে। ওদিকে আমার মন যাবার কথা নয় তবু যাচ্ছে। এমনও মনে হচ্ছে, হে প্রভু, রোজই যেন একবার করে বোতল ওলটায় এইভাবে। আমার মনটা যেন কেমন কেমন করছে। গলায় চিকচিক করছে ছিলে কাটা সোনার হার। হাতের চুড়িতে রিনিঝিনি শব্দ। নাকছাবির পাথর এক একবার চমকে উঠছে। খেকুরে মনের পোড়া শ্মশানে। বসে, বিসমিল্লা খাঁ সানাইয়ে ধরেছেন পুরিয়া ধানেশ্রী। বৈশাখী সন্ধ্যায় ফুলওয়ালি হেঁকে চলেছে। বেলফুল। তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে। সুখেন ঠিকই বলে গেল, পৃথিবী বিশাল। বেরিয়ে পড়, বেরিয়ে পড়। পুরানা কাগজ বলে থলে কাঁধে হেঁকে বেড়ালে সের সের কাগজ মিলবে, লোহালক্কড়, শিশিবোতল, ভাঙা কাঁচ মিলবে। মন মিলবে না, স্নেহ ভালবাসা মিলবে না। যে পায়, সে পায়। এসব ভেসে ভেসে কোথায় চলে যাবে! ঘর থাকবে, বৈশাখ থাকবে, সন্ধ্যার নম্র অন্ধকার থাকবে, মানুষ থাকবে না। মেয়াদ এক মাস। তারে ঝোলা শাড়ি সরে যাবে, ফিতে, কাটা, চিরুনি, সাবান, তেলের সুবাস, চুড়ির শব্দ, সব, সব মিলিয়ে যাবে। আবার সেই শূন্য বাড়ি, শেষ বেলার ছায়া, দূরে বহু দূরে কোনও মায়ের চিৎকার– পিন্টু ঘরে আয়।
এই ঠোঁট-ফোলানো ন্যাকামির জন্যেই ছেলেটার কিছু হবে না। কাব্য করেই কেবল মোলো। কেউ বলেনি, নিজেকেই নিজের তিরস্কার। একটা দিনও পার হল না, মনেই মথুরা তৈরি করে নটঘট অবস্থা। একে কয়লার গোলায় চাকরি করে দাও। বোঝা মাথায় বাড়ি বাড়ি ঘুরলেই রস মরে পুরুষ হবে। আর্মিতে পাঠাও। প্যারেড করে জীবন যন্ত্রণা জুড়োবে। কালি বোতলে তোলো, মেঝে থেকে তুলে মেঝেতে নিংড়োচ্ছ কেন? স্বপ্ন দেখছ নাকি?
তাই তো! কনকের কথায় চমক ভাঙল। কোন কল্পনাজগতে ভাসছিল মন!
সন্ধে হয়ে আসছে। মায়াকে কালির শিশিটা দিয়ে আসতেই হবে। প্রায় সাত দিন হয়ে গেল, দেখা সাক্ষাৎ নেই। সুখেন যাই বলুক বিন্দুবালার গাধা হয়েও সুখ আছে। যে-সংসারে পুরুষ নেই সে সংসারে মেয়েদের স্বাধীনতার চেহারাই আলাদা। ভাল সারযুক্ত মাটিতে উপযুক্ত আবহাওয়ার ফুল যদি ফুটতে পায় সে ফুলের চেহারাই আলাদা। চেনাকেও অচেনা মনে হয়। মনে আছে। কালিম্পঙে গিয়ে গন্ধরাজ দেখে অবাক। কী ফুল? কী ফুল? মহা বিরক্ত হয়ে একজন বললেন, গর্দভ গন্ধরাজ চেনো না। এদিকে গন্ধরাজ পুরোটা ফোটেই না।
যেন কন্বমুনির আশ্রম। হরিণ ছাড়া সবই আছে। ছিটে বেড়া। গাব ভ্যারেন্ডার ঝোঁপ। সারি সারি কলকে, টগর, করবী। উঠোনের মাঝখানে তেলচুকচুকে পাতা, কাঁঠাল গাছ। তলায় বাঁধা হাবলা-গোবলা একটি ছাগশিশু, লোটা লোটা কান। পেছন দিকে একটা ডোবামতো আছে। বর্ষায় ভেসে উঠোন পর্যন্ত চলে আসে। মাটির উঠোনে একটা চৌকি পাতা আছে। মেঘশূন্য চাঁদিনি রাতে ব্যাপারটা ভীষণ জমে ওঠে। কাঁঠাল গাছের মাথার ওপর চাঁদ ওঠে। তারাদের জলসা। দক্ষিণের হৃদয় বিদারক বাতাস। ধূপধুনোর গন্ধ। ঘণ্টাধ্বনি। রাতচরা পাখির কটাস কটাস বন্ধন খোলা ডাক। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত মায়ার পোড়-খাওয়া মুখ। বিন্দুবালার সাধনজগতের কথাবার্তা। ভিজে কাপড়ে ছায়ার চলে যাওয়া। কেমন করে বৈরাগ্য আসে প্রভু! জলে জাল ফেলে জেলে বসে আছে জলে।
সারাদিন রোদে পড়ে থেকে ডোবার জল এখন বাষ্প ছাড়ছে। গাছপালার পেছনটা নীল-নীল ধোঁয়া-ধোঁয়া। মায়াবিনীর আঁচল উড়ছে। ছাগলটা চোখ বুজিয়ে কাঁঠাল পাতা চিবোচ্ছে। বেতার গায়ে একটি নীল শাড়ি শুকোচ্ছে। মায়া ঘরের সামনের দাওয়ায় বসে, উরুতে ফেলে প্রদীপের সলতে পাকাচ্ছে। গোটা কুড়ি হয়ে গেছে। আর ক’টা হবে কে জানে! দৃশ্যটি দর্শনীয় হলেও উটকো পুরুষের দেখা উচিত হবে কি না বুঝতে পারা যাচ্ছে না। শাস্ত্র এ সম্পর্কে নীরব। অথচ প্রদীপের জন্যেই সলতে। সলতের জন্মস্থান মহিলাদেরই কলিকাণ্ড সদৃশ জঙ্ঘার তৈলাক্ত মসৃণ দেহভাগে। প্রদীপ না জ্বললে ধর্ম হয় না। সলতে না হলে প্রদীপ জ্বলে না। যুবতীর উরু না হলে সলতে হয় না। আমাদের মেনিদা যদি ঠ্যাং বের করে সলতে পাকাতে বসেন, তা হলে এক পাকেই তো চিৎকার উঠবে। কঁচি আন, ব্লেড আন। লোম রোল হয়ে সলতে সেঁটে আছে জেঁকের মতো। পরিণত পরিণতি লোমফোঁড়া।
তা হলেও, মায়া একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। অতটা অনাবৃত করার প্রয়োজন ছিল না। বাড়িতে কোনও পুরুষ না থাকলে মেয়েদের সাহস বড় বেড়ে যায়! এ যেন মশা মারতে কামান দাগা। দলমাদল সামনে পড়ে আছে। কোথাও এতটুকু মরচে নেই। যাহা অন্তঃপুরে থাকে তাহা কি এত বিস্ময়কর ভাবে শুভ্র হইয়া থাকে! বালক, প্রশ্নের উত্তর তোমার চক্ষুর সম্মুখেই প্রসারিত। লুকাইয়া, লম্পট জমিদারপুত্রের ন্যায় দেখিয়ো না। মহাবীরের মতো হুপ করিয়া লাফাইয়া সামনে গিয়া পড়ো। পাপ পুণ্য হইয়া যাইবে। শৃগাল সিংহের বলপ্রাপ্ত হইবে। বলদা, মোক্ষদা, মায়া, অষ্টপাশ ছিন্ন করিয়া দেবকার্য করিতেছে। তুমি বহুবার পাঠ করিয়াছ, দেবকার্য লজ্জা, ঘৃণা, ভয় তিন থাকিতে নয়।
