মাতামহের কোনও ভাবান্তর নেই। নিশ্চল, ভাষাহীন। সারাঘরে অপূর্ব এক সুগন্ধ। একই সঙ্গে গোলাপ আর চন্দনের সুবাস। পিতা বললেন, কোথা থেকে ধূপের গন্ধ আসছে!
মাতুল বললেন, মৃগনাভি।
মাতামহ স্থির নিশ্চল। পদ্মাসনে বসে আছেন। সারা মুখমণ্ডলে অদ্ভুত এক দ্যুতি। মুদ্রিত চোখে কাকে যেন দেখেছেন, যিনি সচরাচর সাধারণ মানুষকে দেখা দেন না।
পিতা বললেন, এবার আপনি একটু বিশ্রাম করুন।
কোনও উত্তর নেই।
মাতুল হারমোনিয়ম ছেড়ে পাশে সরে এসে বললেন, আপনাকে প্রণাম করি। আপনার গান শুনে সময় সময় কত ব্যঙ্গ করেছি, আজ যা শোনালেন, তার কোনও তুলনা হয় না।
মাতুল পায়ের আঙুল স্পর্শ করে চমকে উঠলেন, একী, বরফের কুচি! চাটুজ্যেমশাই একবার দেখুন তো!
পিতা সামনে ঝুঁকে মাতামহের মুখের দিকে তাকালেন, হামাগুড়ি দিয়ে বুকে কান রাখলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন, হরি ওঁ, হরি ওঁ।
মাতুল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, কী হল?
উঠে দাঁড়াও।
আমরা দুজনেই উঠে দাঁড়ালুম।
এদিকে এসো। এই দেখো ব্ৰহ্মতালু খুলে গেছে। সাধক দেহত্যাগ করেছেন।
মাতুল হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লেন। দু’হাতে মুখ ঢেকে শুধু একবার বললেন, বাবা। সকলের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলেন ধরতে পারলুম না!
পিতৃদেব প্রহরীর মতো পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। দু’চোখে জল নেমেছে। মায়ের ছবির দিকে তাকালুম। চোখের ভুলও হতে পারে। মনে হচ্ছে মা যেন কিছু একটা বলে ঠোঁট বোজাচ্ছেন। কী বললেন তাও যেন শুনতে পাচ্ছি–বাবা চলে এসো। অনেকদিন হয়ে গেছে, আর না। এবার ঘরে ফিরে এসো।
কাকিমা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন। আমি আর সইতে পারলুম না। মৃত্যু যতই মহান হোক, সব থেকেও মানুষের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে যেতে পারে, সেই প্রথম অনুভব করলুম। শূন্য একটা খোলসের মতো মাতামহের পায়ের কাছে পড়ে গেলুম। সতীমা গঙ্গার ঘাটে যেদিন আমাকে স্পর্শ করেছিলেন সেদিন আমার ঠিক এইরকমই হয়েছিল। সেই ভয়াবহ প্রান্তর আবার ফিরে এসেছে। প্রদোষের অন্ধকার। ছাইছাই রঙের মাঠ, গাছপালা, কাটাঝোঁপ। ছোট ছোট টিলা। মাতামহ আগে আগে চলেছেন। সোনালি গেরুয়া বসন। মনে হচ্ছে পা যেন ফেলছেন না, অথচ আমি তাকে কিছুতেই ধরতে পারছি না। সব সময়েই একটা নির্দিষ্ট ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। দূর থেকে ঝক ঝক বাদুড় উড়ে আসছে। ডানার সামান্যতম আস্ফালন নেই। তারা যেন ঘন অন্ধকারের চাদর টেনে আনছে। বহুবার ডাকার চেষ্টা করছি, বলার চেষ্টা করছি দাদু, আপনি কোথায় চলেছেন? গুঁড়ো গুঁড়ো মাটি দিয়ে সাজানো, অদ্ভুত চেহারার একটা-দুটো বাড়ি। মনে হচ্ছে ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। পত্রহীন একটি গাছের তলায় মাথায় হাত রেখে দুটি মানুষ পাশাপাশি উবু হয়ে বসে আছে। যেন উইয়ের ঢিবি। ফুটো ফুটো, বিধ বিধ হয়ে গেছে। মাতামহ সোজা চলেছেন। হঠাৎ আমার চোখ ঝলসে গেল। সামনে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সোনার পাতে মোড়া দিগন্তে রুপোর চাঁদ উঠেছে। আমার সামনে বিশাল এক জলাশয়, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সোনালি আর রুপোলি তরঙ্গ খেলছে। মাতামহ ধীরে ধীরে সেই জলের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তার সোনালি ছায়া ক্রমশই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। সেই জলের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমি সেই অভাবনীয় দৃশ্য দেখছি। রুপোলি সমুদ্রে স্বর্ণপ্রতিমার ধীর নিমজ্জন। স্বচ্ছ জলে একটি স্বর্ণমুদ্রা। ফেলে দিলে যেমন হয়, মাতামহ ধীরে ধীরে গভীর থেকে গভীরে নেমে গেলেন, স্বর্ণদ্যুতি নিক্ষেপ করতে করতে। আর তাকে দেখা গেল না। অসীম শূন্যতায় নির্জন দিগন্ত। হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝক নীল পাখি এসে জলের ওপর নিঃশব্দে উড়তে লাগল। মনে হল আমি এক তরল হোমকুণ্ডের তটভাগে এসে দাঁড়িয়েছি।
অচৈতন্য হয়েছিলুম কি না জানি না, হঠাৎ পরিবেশে ফিরে এলুম একটি শব্দতরঙ্গ ধরে– জয় রাম, জয় রাম। এ যেন আর এক স্বপ্ন। ঘরে প্রবেশ করছেন হরিদ্বারের সেই সন্ন্যাসী। মাতামহের গুরুদেব। বেটা হাম আ গিয়া। ঠারো ঠারো।
মাতামহকে উপবিষ্ট অবস্থা থেকে শায়িত করার চেষ্টা চলেছে। কাকিমা দরজার কাছ থেকে ঘরের আর একটু ভেতরে এসেছেন। পিতৃদেব আর মাতুল দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সন্ন্যাসীকে দেখে দু’জনেই অবাক হলেন, গুরুজি, আপ?
হাঁ বেটা, হাম আ গিয়া।
সন্ন্যাসী পরপর কয়েকটি কাজ করতে বললেন। বেলপাতা চাই, তুলসীপাতা চাই, চন্দনবাটা চাই। গঙ্গাজলের প্রয়োজন। ফুল, ফুলের মালা, একটি সোনার তবক। মৃত্যুর পর মানুষের শরীর শিথিল হয়ে এলিয়ে পড়া উচিত। মাতামহ কিন্তু প্রস্তর মূর্তির মতো একই ভাবে মৃত্যুস্থ। ধ্যানস্থ বলি কী করে!
আমার আচ্ছন্নভাব কেটে এসেছে। এখন অনেক কাজ। তুলসীপাতা বাড়িতেই আছে। বেলপাতা চাই। সোনার তবক, সে কোথায় পাব? পিতা কাকিমাকে বললেন, বউঠান, একটু চন্দন ঘষে ফেলো। অন্তত এক বাটি। আমাকে বললেন, বেলপাতা, ফুল, ফুলের মালা নিয়ে এসো। যত তাড়াতাড়ি পারো। কোনও কৃপণতা কোরো না। সন্ন্যাসী মাতামহের পাশটিতে আসন করে বসেছেন। মৃদুস্বরে একইভাবে বলে চলেছেন, জয় রাম, জয় রাম। বেরোবার সময় পিতৃদেব বললেন, বাইরে তুমি এই মৃত্যুর কথা বলবে না।
রাস্তায় নেমে গোটাকতক কথা ভাবার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। রাত নেহাত কম হয়নি। ফুল পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে। সমস্যা বেলপাতার। আজ বৃহস্পতিবার হলে কথা ছিল না। মায়াদের পেছনের বাগানে বেলগাছ আছে। পুকুরধারে। টাটকা বেলপাতা। কিন্তু যাই কোন মুখে? বহুকাল মায়ার খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। ভয়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয়। স্বার্থপর ভাবে ভাবুক আমাকে যেতেই হবে। দু-চারটে কথা শোনাবে বাঁকা বাঁকা। তা শোনাক।
