সুরকে কী কী ভাবে কত ভাবে যে মোচড়ানো যায়! কত বিচিত্র যে তার গতিপথ! প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গেল একই ইমন চলছে, তবু একঘেয়ে ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে না। লয় চলেছে ঘড়ির মতো। সুরে আর সময়ে টানাপোড়েন চলেছে। সুরের একটা আবরণী তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সময় আর শ্রোতা স্তব্ধ।
শেষ চরণটি গেয়ে মাতুল গান ছাড়লেন। চোখ আধ-বোজা, ফরসা মুখে চাপা আলো খেলছে। ফিসফিস করে আমাকে বললেন, গান শেখ গান শেখ। বড় আনন্দ পাবি! কোথায় যে চলে যাবি!
ম্যাজিশিয়ানের দড়ির খেলার মতো সুর ওপরে উঠতে উঠতে তোকে অনন্তে নিয়ে যাবে। লেগে যা। ব্যাটা।
মাতামহ তৃপ্ত মুখে মৃদু মৃদু হাসছেন আর হাঁটুতে ধীরে ধীরে চাপড় মারছেন। পিতা বললেন, নিজের মেজাজের জন্যে তুমি একঘরে হয়ে রইলে। বাইরের জগতের সঙ্গে একটু যদি মানিয়ে চলতে শিখতে?
মাতুল হারমোনিয়মে সুর টিপে বললেন, গান আমি ফেরি করতে পারব না। এ আমার অহংকার নয়, আমার আদর্শ। এর জন্যে না খেয়ে মরতে হলেও আমি প্রস্তুত।
তুমি যে সংসার করে ফেলেছ জয়।
বাউলেরও তো সংসার থাকে। সেইভাবেই নেচে নেচে আকাশবৃত্তি করে বেড়াব।
মাতুল হঠাৎ প্রচণ্ড আবেগে গান ধরলেন। দেশ রাগে ঠুংরি। ধরামাত্রই বাতাসে একটা ব্যাপার ঘটে গেল। নির্বাপিত হোমকুণ্ডে আঘাত করলে চারপাশে যেমন স্ফুলিঙ্গ উড়তে থাকে, সেইরকম, কণা কণা সুর সারাঘরে লম্বা লম্বা আলপিনের মতো ছুটতে লাগল। মাতুল গাইছেন, সেঁইয়া করো তোরে শ্যাম। দেশ, একেবারে কান্নার রাগিণী। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দেয়। প্রথম লাইনটাই মাতুল কতভাবে গাইছেন!
সেঁইয়া করো তোরে শ্যাম
করত জিয়া বিমতি রাতি ।।
মানত নেহি মেরি বাতিয়া।
ক্যায়সে কাটডি দিন রাতিয়া ॥
এক একটি শব্দ যেন সুরের ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। কোনওটা জানলা গলে উড়ে যাচ্ছে দূর তারাভরা আকাশের দিকে। কোনওটা লাট খেয়ে ফিরে আসছে। কী যে হচ্ছে, বলে বোঝানো যাবে না। ফিনফিনে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি পরে মাতুল বসেছেন। অনামিকায় হিরের আংটি চিকমিক করছে। সিনেমা সব নিয়েছে, আংটিটা নিতে পারেনি। ঘাড়ের কাছে চুল নেমে কুঁকড়ে আছে।
সেদিন চিৎপুরে বড় মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্বজন্মের হঠাৎ যে অনুভূতি হয়েছিল, আজও যেন তাই হচ্ছে। ছায়াছায়া নির্জন রাস্তা ধরে জুড়িগাড়ি চেপে চলেছি। মধ্যরাতের নির্জন পাতাকাঁপানো বাতাস। ঘোড়ার গলার রুপোর ঘণ্টা বাজছে শৌখিন সুরে। দূর থেকে ভেসে আসছে বাইজির গলা। কাফি সিন্ধুতে দাদরা ধরেছে। তবলার লগগি চলেছে। কতকাল আগের সেই নেশার রাত আজ আবার ফিরে এসেছে। গোলাপি বেনারসির আবরণে সুঠাম শরীর। এক হাতে কান চেপে আর এক হাত শূন্যে ভাসিয়ে তেহাই মেরে সমে আসছে। নাকছাবির হিরের চোখ মাঝে মাঝে আলোর ছোবল মেরে যাচ্ছে। তবক লাগানো পানের খিলি, মোহরের থলি। আমি যে তখন। কী ছিলুম! কী থেকে কী হলুম! একই সংগীত আমরা তিনজনে শুনছি। পিতার চোখ মুদ্রিত। মাতামহের অশ্রুসজল। আর আমার? বড় সংসার করতে ইচ্ছে করছে। একে একে তারা আসছে। কনক, অপর্ণা, মুকু, এমনকী আমার প্রথম প্রেম মায়া। রাতের উতলা বাতাসে সুরের পথ বেয়ে তারা সব একে একে আসছে। এ যেন আমার ফুলশয্যার রাত।
রাস্তা দিয়ে হেঁকে চলেছে সেই চেনা ফেরিঅলা, ভারী চাপা গলা, মালাই। এ গলা আমি পূর্বজন্মে বহুবার শুনেছি। তখন হাঁকত, বেলফুল। পিতৃদেব বলেছিলেন, কোথাও-না-কোথাও আমাদের একটা অশরীরী ছাচ আছে। দেহগত আত্মার ক্ষণ আবেগে প্রতি মুহূর্তে সেই ছাঁচের আদল পালটাচ্ছে। সেনসিটিভ ফটোগ্রাফিক প্লেটের মতো পরবর্তী ব্যবহারের জন্যে সব ইমোশনের ছাপ ধরা থাকছে। সৃষ্টিকর্তা আলোর দিকে এক্সরে প্লেটের মতো তুলে ধরবেন, পরবর্তী জন্মের সময় মেপে মেপে হৃদয়বৃত্তি, দেহবৃত্তির পাওনা বুঝিয়ে দেবেন। এই নাও তোমার অর্জিত ফল। প্রারব্ধ বুঝে নিয়ে প্রবেশ করো মাতৃজঠরে জ্বণের আকারে। এই মুহূর্তে আমার মন ছেয়ে গেছে অদ্ভুত এক কামমিশ্রিত আধ্যাত্মিক ভাবে। একজন মানবীকে পেতে চাইছি উপাস্য দেবী হিসেবে।
মাতুল গান শেষ করলেন। সুর জলপ্রবাহের মতো ছোট বড় তরঙ্গের আকারে অসীমে ধাবিত হল। বাইরের জগতের প্রাত্যহিক কোলাহলের ছিটেফোঁটা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। গাড়ির শব্দ, লোক চলাচলের শব্দ, পথচারীর বাক্যালাপ।
মাতামহ হঠাৎ গান ধরলেন। সেই এক সুর। দেশ। উগ্রচণ্ডা ভাবে নয়। মৃদু সুললিত। মাতামহের এত সংযত সুর ভঁজা আগে কখনও শুনিনি। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, যার অর্থ তানপুরাটা আমার হাতে দাও। মাতুল হারমোনিয়মে অনুসরণ করছেন। মাতামহ সোজা বসেছেন। কাঁধে তানপুরা। ধীরে সুর ছাড়ছেন। আলাপে সুরের অবয়ব তৈরি হল। গান ধরলেন,
উঠো গো করুণাময়ী খোলো গো কুটির দ্বার।
আঁধারে হেরিতে নারি হৃদি কাঁদে অনিবার ॥
দুটি চরণই বারেবারে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইছেন। সুর থেকে এতটুকু সরে যাচ্ছেন না। আবেগে মাঝে মাঝে গলা বুজে আসছে। ক্রমশই বুক চিতিয়ে উঠছে। মেরুদণ্ড সোজা হচ্ছে, হৃদি কাঁদে অনিবার বলার সময় সত্যিই কেঁদে ফেলছেন। দু’চোখে ধারা নেমেছে। মুখে অদ্ভুত এক ধরনের দ্যুতি খেলছে। বহু আসরে বসে বহু নামজাদা সংগীত গুণীর পরিবেশন শুনেছি, এমন জীবন-মরণ সংগীত আগে কখনও শুনিনি। সুর মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ বর্শার ফলার মতো আমাদের অন্তরাত্মা ভেদ করে যাচ্ছে। মাতুলের সংযত হারমোনিয়ম অনুসরণ করে চলেছে। দরজার চৌকাঠে কাকিমা এসে বসেছেন। সারাঘর ঝিমঝিম করছে। মাতামহ তারা থেকে মুদারায় নেমে এসে করুণ আকুতিতে বললেন, খোলো গো কুটিরদ্বার, তারপর নাভিপদ্ম থেকে একটি শব্দ তুললেন, ওঁ। এমন ওঁকার ধ্বনি শুনিনি কখনও। পর্বতের নির্জন গুহার নিবিড়তা থেকে মেঘ গর্জনের শব্দের মতো উচ্চারিত হল। আমাদের সমস্ত শরীর শব্দতরঙ্গে কেঁপে উঠল। তানপুরাটি মাতামহের শিথিল হাত থেকে ধীরে ধীরে মাটির দিকে নেমে আসছে। হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললুম। পিতৃদেব আর মাতুল দু’জনে। একসঙ্গে বললেন অপূর্ব, স্বর্গীয়!
