তাই তো হলেন।
চাটুজ্যেমশাইয়ের সারাটা জীবনে একের পর এক কেবল উটকো ঝামেলা। এক যায় তো আর এক আসে। তুই তখন ছোট, বাড়িতে কাজ করতে এল সুধীর। খুব ভাল, খুব ভাল। সুধীরের প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। কী ব্যাপার! সুধীর এক ফেরারি ডাকাত। পোঁটলার ভেতর থেকে রিভলভার বেরোল, আরও সব চোরাই মাল। সে এক। হইহই ব্যাপার। কিছুদিন পরে এক বিধবা ভদ্রমহিলা এলেন রাঁধুনি হয়। বছর না ঘুরতেই তিনি। অন্তঃসত্ত্বা হলেন। সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড। বাবা এসে চেপে ধরলেন। জেরায় জেরায় অপরাধীর সন্ধান বেরোল। ওই তোদের পাড়ার মিষ্টির দোকানের বছর কুড়ি বয়সের এক ছেলে। মার মার কাট কাট ব্যাপার। শেষে দু’জনেই পাড়া-ছাড়া হল। কিছু বলার নেই। সবই হল গ্রহের কারসাজি। দেখ এ যাত্রা আবার কী হয়! আমিও চলে গেলুম বহুদূরে। তুই ওই ভদ্রমহিলাকে বুঝিয়ে বল না, কেন এই সৎ ভালমানুষটিকে বিপদে ফেলছেন? পয়সাঅলা… ও লোকটা কে হয় রে? ওই যে মর্কটমুনি?
মামাশ্বশুর। তার মানে প্রফুল্লদার মামা! তুই বল আপনি ওইখানে গিয়ে সুখে থাকুন। উনি যাবেন না। লোকটা ডিবচ।
সে আমি জানি। খুব ঘোড়েল লোক। তা হলে, আমিই বরং আমার ওখানে নিয়ে যাই। তোর মামির ছেলেপুলে হবে। আর একজন মহিলা থাকলে সুবিধে হবে।
চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
তোরা বল, তা না হলে ভদ্রমহিলা অন্যরকম ভাববেন। মানসম্ভ্রমে লাগবে।
দেখি আজ রাতে বাবাকে বলব।
কথায় কথায় গাড়ি নিউমার্কেটে এসে গেল। সায়েবি ব্যাপারস্যাপার। মাতুল আনন্দে ছটফট করছেন। কখনও বলছেন বোনলেস ভেটকি কিনবেন। কখনও বলছেন, ম্যাওয়া কিনবেন। কখনও বলছেন, একঝাক মুনিয়া পাখি কিনবেন। একবার এদিকে ছুটছেন, একবার ওদিকে ছুটছেন। পেছন পেছন গোটা তিনেক মুটে ছুটছে সাহাব সাহাব করে। মাতুলের হাত চেপে ধরে বললুম, আগে ঠিক করুন কী কিনবেন? মনে মনে একটা ফর্দ তৈরি করুন।
তা হলে মাছ দিয়ে শুরু হোক, বোনলেস ভেটকি।
মাছের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে মাতুল ওজন বললেন। কাটাছেঁড়া চলছে। হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন। করলেন, হ্যাঁরে প্রফুল্লদার স্ত্রী, মানে বউদি তো বিধবা হয়েছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা হলে মাছ মাংস ডিম তো চলবে না! তা হলে থাক। আমরা খাব আর উনি দেখবেন তা তো হয় না। চল তা হলে ভেজিটেবলের দিকেই যাওয়া যাক।
১.৬৩ I could give all to time
তম্বুরাটি বেশ মনের মতো বাঁধা হয়েছে। মাতামহ ঠিক যেমনটি চান। মাতুল হারমোনিয়মে ছোট ছোট তান ছাড়ছেন, ঠুংরির মুখ মোচড় মেরে মেরে উঠছে। আমার কাঁধে তানপুরা। সামনে পাশাপাশি বসেছেন মাতামহ আর পিতৃদেব। সন্ধে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। এইমাত্র চা হল। এইবার আসর বসবে। কারুর মনেই তেমন সুখ নেই। সকলেরই মন বলছে, কিছু একটা ঘটবে। কী ঘটতে পারে জানা নেই। আজ অক্ষয় কাকাবাবু এলে গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান দেখে বলতে পারতেন, কার ভাগ্যে কী নাচছে! মাতুলের একটু রেওয়াজের প্রয়োজন। আগামীকাল তিন তিনটে সিটিং এ আই আর-এ। সকালে খেয়াল। গাইবেন দেশি টোড়ি। সন্ধেবেলা গাইবেন ইমন। রাতে ঠুংরি!
মাতুল হারমোনিয়মে একটা সাপট তান মেরে সুরে দাঁড়িয়ে বললেন, আহা, আজ যদি প্রফুল্লদা থাকতেন!
পিতা বললেন, আমার শরীরটা ঠিক থাকলে তোমার সঙ্গে সংগতে বসতে পারতুম। বুকটা এখনও ইনফ্লেমড হয়ে আছে।
মাতুল ঘাড় নিচু করে বার দুয়েক সুর ভেঁজেই গান ধরে ফেললেন। নিমেষে ঘরের আবহাওয়া পালটে গেল। শ্রোতারা স্তম্ভিত। এত বেলায় খাওয়া হয়েছে, তবু মাতুলের গলা অসাধারণ বলছে। ডি শার্পে গান ধরেছেন। তারায় গিয়ে যখন সুর টেনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন ঘরের কাঁচের শার্সি চিনচিন করে উঠছে। পাশে-রাখা চায়ের খালি কাপডিশ উল্লাসে গলা মেলাচ্ছে। গানে বসলে মাতুলের চোখমুখ, হাবভাব একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। পুরো ব্যক্তিত্বটাই একেবারে পালটে যায়। মনে। হতে থাকে বহু দূরের মানুষ। পৃথিবীর সব সম্পর্কের বাইরের এক সুরসাধক। মীড়, মূৰ্ছনা, গমক, চক্ৰধা তানে ইমনের রূপকল্পনা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।
মাতামহ যে-জায়গায় বসেছেন সেদিকে আলোর শেড একটা ছায়া ফেলেছে। তপ্তকাঞ্চনের মতো গাত্রবর্ণ, স্থির বসে থাকার ভঙ্গি, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, মহাদেব যেন গান শুনতে এসেছেন। চোখদুটি নিমীলিত। মুখে অসাধারণ এক তৃপ্তির ছোঁয়া লেগেছে। ছেলের মতো ছেলে হলে কোন পিতার না গর্ব হয়! আমিও যদি কিছু একটা হতে পারি, পুত্রগর্বে আমার পিতার বুক ভরে যাবে। আমার দ্বারা আর কী হওয়া সম্ভব? দরকচা মেরে গেছি।
মাতুল আমার হাতে কনুইয়ের খোঁচা মেরে ইশারায় বললেন, ধর, ধরে ফেল।
আমার গলা সি শার্পে, ডি-তে তুলি কী করে? মাতামহ চাপাস্বরে বললেন, ধর, ধর, ধরে ফেল। মাতুল ছোট্ট একটি তানের কাজ করে গানের মুখটি আমায় দিয়ে দিলেন। আর উপায় নেই। সময় সময় মানুষের ভেতরটা জেগে ওঠে। তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়। দুর্বলও লোহার গরাদ বাঁকিয়ে ফেলতে পারে। আমারও তাই হল। সুর আমার পরিচিত। আরোহণ অবরোহণ বাদী সমবাদী জানা। গানের বাণী আমার কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। উচ্চাঙ্গ সংগীতের বাণী অধিকাংশ সময়েই অস্পষ্ট। সুরের তলায় লুকিয়ে থাকে। কীভাবে জানি না মুখটাকে ঘুরিয়ে সমে ফেলে দিলুম। মাতুল বললেন, বহত আচ্ছা!
