মাতুল বললেন, আপনার প্রতিপালনের মতো সংগতি আছে, একটা জীবন যদি আশ্রয় চায় আশ্রয় দেওয়া উচিত।
জয়, মানুষের তুমি কতটুকু জানো? এই সামান্য ব্যাপার কত অসামান্য হয়ে ওঠে একবার দেখো। আমিও প্রস্তুত। এতকাল অকারণে লড়েছি, এইবার একটা কারণে লড়ব। ছোবল খেতে খেতে নীলকণ্ঠ হয়ে যাব।
মাতামহ বললেন, তোমার পাশে আমি না থাকলে তুমি লড়বে কী করে! যত লড়াই তো আমরা দু’জনে করে এসেছি। এই যেমন একটু একপক্কড় হয়ে গেল। ব্যাটাকে আমি মেরেই দিতুম। নেহাত তোমার অবাধ্য হতে পারি না তাই!
মাতুল বললেন, লড়াইয়ের জন্যে সুস্থ শরীর চাই। ওখানে এক নম্বর হাসপাতাল, এক নম্বর ডাক্তার, ভাল জল, ভাল হাওয়া। দিনকয়েক থেকেই চলে আসবেন।
মাতামহ মুখ কাচুমাচু করে বললেন, যদি রাগ না করে একটা কথা বলব?
পিতা বললেন, নিশ্চয় বলবেন।
আমার ভাল লাগে না। ওদের স্বভাবটা একটু ম্লেচ্ছ ধরনের। মুরগি, মুরগির ডিম, পেঁয়াজ, রসুন, এঁটোকাটার বিচার নেই। সন্ধ্যা-আহ্নিক নেই। ধূপধুনো নেই। আমার ভাল লাগে না হরিশঙ্কর। ওস্তাদের বাড়ির হালচাল ওস্তাদের মতো।
মাতুল বললেন, আপনি যেভাবে থাকতে চান, সেইভাবেই থাকার ব্যবস্থা করে দোব। মাছমাংস, ডিম বাড়িতে ঢুকবে না। আলাদা ঠাকুরঘরের ব্যবস্থাও আছে।
কিন্তু! মাতামহ মুখ নিচু করে রইলেন। যখন মুখ তুললেন, চোখদুটো ছলছল করছে। আবেগে। বুক আবার প্রশস্ত হয়েছে। কোনওরকমে সেঁক গিলে বললেন, কিন্তু এখানে যে তুলসী আছে। তোমরা কেউ দেখতে পাও না হরিশঙ্কর, আমি দেখতে পাই, তুলসী এখনও এখানে আছে। আমার নাতিটার মুখের দিকে তাকাও। সেই চোখ, সেই নাক, মুখ, হাসির ধরন, ভাবভঙ্গি, সব তুলসীর মতো। তার আত্মাও এখানে আছে। আমি যখনই আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকি, সে এসে আমার কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, বাবা, বড় কষ্ট? এই তো আমি তোমার মাথার কাছে রয়েছি।
মাতুল বললেন, ও আপনার মনের ভুল। দিদির খুব পুণ্য ছিল। দিদি কখনও ভূত হয়ে ঘুরতে পারে না।
পিতা বললেন, জয়, ব্যাপারটা ভূতপ্রেতের ব্যাপার নয়। এসব বোঝার ক্ষমতা তোমার হবে না। এ বুঝতে হলে তোমাকে আর এক প্লেনে চলে যেতে হবে। আমি জানি, উনি যে কথা বলছেন তা সেন্টপারসেন্ট সত্য। এখানে যা শূন্য ওখানে তা পূর্ণ। তোমার চোখে যা নেই, আমার চোখে তা। আছে, তোমার ভাবে নেই আমার ভাবে আছে। তুমি তো শিল্পী! তোমার তো এসব বোঝা উচিত। সুরের পথে তুমি তো বিভিন্ন লোকে চলে যেতে পারো! পারো না?
হ্যাঁ, তা পারি।
পিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, জগতে কেউ দেখতে না পায়/লুকানো তাঁর বাতি/আঁচল দিয়ে আড়াল করে জ্বালান সারা রাতি/ঘুমের মধ্যে স্বপন কতই/আনাগোনা করে/অন্ধকারে হাসেন তিনি/আমাদের এই ঘরে।
মাতামহ ছেলেমানুষের মতো বললেন, আমি তোমার সঙ্গে যাব না। যেতেই যদি হয় আমি হরিদ্বারে যাব।
কাকিমা দরজার আড়াল থেকে বললেন, কী, তুমি বাজার করবে না? বেলা যে বেড়ে গেল।
মাতুল বললেন, চল, আমার সঙ্গে গাড়ি আছে, দুজনে একসঙ্গে যাই। চল আজ বড়বাজারে যাই। কতদিন পরে এ বাড়িতে আমি পাত পাড়ব! বেশ গুছিয়ে বাজার করি দুজনে মিলে।
পিতা বললেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে, জয়। কখন রান্না হবে?
আপনি সময়ের কথা বলছেন? আপনি না বলেছিলেন, আমি সময়ের দাস নই। সময় আমার দাস। চালাও পানসি বেলঘরিয়া।
কয়েক মাস আগে হলে পিতৃদেব এর উত্তরে কী বলতেন জানা নেই, আজ শুধু মৃদু হাসলেন। এ যেন বোমাবর্ষণের দিনে, নহবতে সানাই বসিয়ে বিবাহের আয়োজন। মাতুল আমার এক এমন চরিত্র যার উৎসাহ দমিয়ে দিতে সকলেরই খারাপ লাগে। প্রজাপতি ফুলের আনন্দে ডানা মেলে উড়বে। সেইটাই স্বাভাবিক। অ্যালবামে পেস্ট করে রাখবেন তারা যারা হৃদয়হীন।
ঝকঝকে নতুন গাড়ি। সামনে লেখা অস্টিন অফ ইংল্যান্ড। উর্দি-পরা ড্রাইভার ফেদার ডাস্টার দিয়ে আদুরে গাড়ির ধুলো ঝাড়ছিলেন। মাতুল বললেন, গাড়িটা কীরকম ম্যানেজ করেছি বল?
কিনলেন?
ধ্যার, আমি তো এখন ফকির। জানিস তো, রাজার উলটো পিঠ ফকির, ফকিরের উলটো পিঠ রাজা। ওখানে আমার খুব খাতির, বুঝলি। একেবারে ডনজুয়ান। চাটুজ্যেমশাইকে যেন বলিসনি! ডন জুয়ান কথাটা তেমন ভাল নয়।
ড্রাইভারকে বললেন, নিউমার্কেটে যাব। কলকাতার কিছু চেনো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি তো কলকাতারই ছেলে।
আমাকে বললেন, কতক্ষণ লাগবে বল তো?
আধঘণ্টা।
বুঝলি, বেশ জমে গেছে। কিছু একটা জানলে কিছু-না-কিছু করা যায়, একেবারে বেকার বসে থাকতে হয় না। তোকে আমি কিছুতেই আর্টের লাইনে আনতে পারলুম না। কী যে এক চাকরি ধরেছিস!
আপনাকেও তো শেষপর্যন্ত সেই চাকরিতেই যেতে হল।
এটাকে তুই ঠিক চাকরি বলতে পারিস না। অধ্যাপনা। না, এও চাকরিই রে। হল না, জীবনে যেসব স্বপ্ন ছিল, কিছুই তো বাস্তবে পরিণত করা গেল না। চতুর্দিকে ব্যর্থতা। তোদের বাড়িতেও। তো এলোমেলো হাওয়া হইছে! প্রফুল্লদার স্ত্রীকে নিয়ে ব্যাপারটা বেশ ঘোলাটে হয়েছে!
বেশ ঘোলাটে। চারপাশে যা-তা কথা চালু হয়ে গেছে।
তোরা কিছু বললি না, আমিও সাহস করে তখন জিজ্ঞেস করলুম না। প্রফুল্লদা কি সুইসাইড করেছেন?
আজ্ঞে না! সন্দেহজনক মৃত্যু। ভদ্রলোক খুন হয়েছেন।
বাবা! সেকী রে? ভদ্রলোক খুন হয়?
