পিতা বললেন, আমি আপনাকে একদিন বলেছি কারুর মনে দুঃখ দেবেন না। দুঃখ টেনিস বলের মতো বাউন্স করে ফিরে আসে।
তুমি আমার গুরু হরিশঙ্কর। তোমার কথা ভুলতে পারি? আমি দুঃখ দেবার জন্যে বলিনি। ছোট্ট একটা ব্যাপার আছে।
কী ব্যাপার?
সে আমি বলতে পারব না। আমার একটু লজ্জা লজ্জা করছে।
পিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, লজ্জা! কীসের লজ্জা!
মাতামহ হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন। কান্নার প্রথম আবেগ কোনওক্রমে সামলে নিলেন। বুকটা বিশাল হয়ে উঠল। জোরে নিশ্বাস নিয়ে, বাতাস দিয়ে আবেগের উৎসস্থল চেপে ধরলেন। ছোট ছোট বাক্যে বলতে লাগলেন, আমার মেয়ে তুলসী। তোমার স্ত্রী। আমি তাকে বড় অবহেলা করে এসেছি। সে একটা যুগ ছিল, সংসারে মেয়ের চেয়ে ছেলের আদর হত বেশি। মাছের মুড়ো ছেলের পাতে, দুধের সর ছেলের ভাগে, ভাল জুতো, ভাল জামা। মা-মরা মেয়ে, ডুরে শাড়ি পরে ধুলো পায়ে একা একা ঘুরছে। আমি এখনও সে দৃশ্য দেখতে পাই হরিশঙ্কর। কাকিমাদের মুখঝামটা খাচ্ছে থেকে থেকে। আর আমি? আমি এক শয়তান। আমাকে তখন ধর্মে পেয়েছে। ভণ্ডের ধর্ম। ধর্মের নামে মাংস চলছে, মাছ চলছে, অল্পস্বল্প কারণবারি চলছে। ছেলেকে চপচপে গাওয়া ঘিয়ের মোহনভোগ খাইয়ে কাঁধে করে ওস্তাদের কাছে নিয়ে চলেছি ওস্তাদ বানাতে। তুলসী আমার একা। একদিন হঠাৎ বায়না শুরু করলে, কলকাতায় বিলিতি সার্কাস দেখাতে নিয়ে যেতে হবে। কোনওদিন বায়না করে না, সেদিন যে কী হল! মাথায় যেন ভূত চাপল। বুঝলে হরিশঙ্কর, মারলুম ঠেসে এক চড়। ঘুরে পড়ে গেল চৌকাঠের ওপর। সামনের একটা দাঁতের কোণ ভেঙে গেল। ওই যে ছবি দেখছ হরিশঙ্কর, ওই যে দেয়ালে ঝুলছে, ওই ছবির তুলসী যদি এখন ফিক করে হাসে, তুমি দেখতে পাবে, একটা দাঁত একটু কোনা-ভাঙা। এই বুড়ো সে জন্যে দায়ী। যার কোনও বিচার হল না। যার কোনও বিচার হবে না। তোমার ভাষায় যে হল, অলমাইটি ফাদার। তুলসীকে আমি কিছুই দিতে পারিনি হরিশঙ্কর, অবহেলা ছাড়া। যখন ভাবলুম, এবার দিতে হবে, তখন সে চলে গেল অভিমানে, পাছে কিছু নিতে হয় বলে। তুমি জানো বিয়ের পর ওকে আমি একটা সাপ-বালা দিয়েছিলুম। জোড়া সাপ। সাপের চারটে চোখে চারটে লাল রুবি বসানো ছিল। খুব বড় কারিগরের তৈরি।
পিতা বললেন, জানি।
তুমি জানো, একদিন সে ওটা ফেরত দিয়ে এল।
জানি। আমিই বলেছিলুম দিয়ে আসতে।
তুমি? কেন বলেছিলে হরিশঙ্কর?
আপনাকে দুঃখ দেবার জন্যে। আমি তখন খুব নীচ ছিলুম। অহংকারে ফেটে পড়তুম। ক্রুড ছিলুম, ভালগার ছিলুম। আপনাকে বলেইছি, দুঃখ টেনিস বলের মতো। কারুর দিকে ছুঁড়ে দিলেই ফিরে আসে। আমি প্রায়শ্চিত্ত করছি। কোনও মানুষই পারফেক্ট নয়। যত জ্বলবেন যত পুড়বেন তত বিশুদ্ধ হবেন। আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিতে চাই না। দুঃখে আপনার ভেতরটা গুমরে গুমরে উঠুক। প্রতি স্পন্দনে একটি করে দেবদূত মুক্তি পাক। মনে পড়ে বায়রন তার কন্যার দুঃখজনক অকাল মৃত্যুতে সমাধি ফলকে কী লিখেছিলেন?
মাতুল বললেন, I shall go to her, but she shall not return to me.
পিতা বললেন, তার মানে, আমি তার কাছে যেতে পারি, সে কিন্তু আমার কাছে আর ফিরে আসবে না।
মাতামহ বললেন, আমি যে তার কাছে যাব বলেই বেরিয়ে এসেছি। আমি তো জানি সে আর আসবে না। যাহা যায় তাহা যায়। আমার যৌবন আর ফিরবে না। কিশোরী তুলসী আর ফিরে আসবে না। পেছন দিক থেকে গলা জড়িয়ে ধরবে না। জীবনে যত ভুল করে এসেছি সেসব আর শোধরানো যাবে না। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে।
যাক না। আমার একটা ধারণা আছে শুনবেন। আমাদের প্রত্যেকেরই একটা করে অশরীরী ভৌতিক সত্তা আছে। ছাঁচের মতো। আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমার একটা আমি আছে। আপনার একটা আপনি আছেন। কোথাও আছে। কোথায় আছে তা জানি না। প্রতিটি অনুশোচনার তরঙ্গে সেই ছাঁচের হৃদয় পালটাচ্ছে, মন পালটাচ্ছে, আকার আকৃতি পালটাচ্ছে। আবার যখন আমরা ঢালাই হব তখন আমরা আরও সুন্দর হব। নিখুঁত হব। ভয় কী? আপনি প্রাণ খুলে কেঁদে যান। অনুশোচনায় চড়চড় করে পুড়তে থাকুন। আমারও দিন আসছে। সকলেরই দিন আসবে। অতীত হাত ফসকে চলে গেছে যাক। ভবিষ্যৎ তো আছে।
মাতুল বললেন, দিদির তো তেমন দুঃখ করার কথা নয়। আমি তো সবসময় পাশেপাশেই থাকতুম। তারপর বিয়ের পর জামাইবাবু!
পিতা বললেন, জামাইবাবুর কথা আর বোলো না। তখন আমার তিন ভাগ অমানুষ ছিল আর এক ভাগ মানুষ। দোর্দণ্ডপ্রতাপে সংসার করতে গিয়ে ঘাড়মুখ গুঁজড়ে পড়ে গেলুম। তোমার দিদিকে আমি একেবারে চেপে রেখেছিলুম। আমার তখন কী অহংকার! আমি পুরুষ! জুজুর মতো ভয় দেখিয়ে মজা পেতুম। আমার সেই রেপ্লিকা, যেটা কোথাও-না-কোথাও আছে, সেটা দিন দিন আমার সংকীর্ণতায় শুকিয়ে চামচিকির মতো হয়ে গেল। সামলে দেবার মতো কেউ তো ছিল না পাশে। আমাকে ধাক্কা মারার সাহস কারুর ছিল না। ভীরু আর কাপুরুষ নিয়ে সংসার করেছে। অত্যাচারী হরিশঙ্কর। আর তুলসী ছিল ঠিক তুলসীরই মতো। বুক ফাটত, তবু মুখ ফুটত না। রাবিশ। আমি একটা রাবিশ।
মাতামহ বললেন, তুমিও জ্বলছ হরিশঙ্কর?
সর্বক্ষণ আমি জ্বলছি। আই অ্যাম এ বার্নিং মাস! অন্ধকার নক্ষত্রের মতো ধকধক করে জ্বলছি। জীবনের পর জীবন জ্বলতে জ্বলতে একদিন হয়তো পৃথিবীর মতো হরিতাভ একটি গ্রহ হব, তখন সেই মাটিতে জীবন জীবনের মতো খেলবে, প্রেমে ভালবাসায় স্নেহে আনন্দে। নিজেদের চিতা নিজেরাই সাজিয়ে যাই ততদিন। তাই তো আমি প্রফুল্লর স্ত্রীর প্রতি কঠোর হতে পারছি না আর আগের মতো। বলতে পারছি না নিজের পথ নিজে দেখে নাও। সে যে একেবারে অসহায় আশ্রিতা।
