আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠলুম, মামা! মামা এসেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে মামা আত্মপ্রকাশ করলেন। দু’হাত বাউলের মতো উর্ধ্বে তুলে গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকলেন, আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।
ঘরের বিশ্রী মারমুখী থমথমে আবহাওয়া হঠাৎ তরল হয়ে গেল। কাকিমা আরও সাংঘাতিক কিছু বলার জন্যে হাত তুলেছিলেন, সে হাত বাতাসে স্থির। মাতামহের বুকে লাগোয়া আমার মাথায় তার স্নেহের হাত। পিতা কোমরের পেছন দিকে দু’হাত রেখে পায়চারির ভঙ্গিতে স্থাণু। কাকিমার মামাশ্বশুর দু’হাঁটুতে দু’হাত রেখে গাট হয়ে আছেন। ঠোঁটের পাইপ-লম্বা সিগারেট নিবে গেছে।
দৃশ্য দেখে মাতুলের সংগীত এক লাইনের বেশি এগোল না। তিনি বললেন, কী ব্যাপার, নাটক হচ্ছে নাকি?
পিতা উলটে প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার জয়, তুমি?
মাতুল উত্তর দেবার আগেই কাকিমা আবার আগের কথার খেই ধরে শাসিয়ে উঠলেন, কী? যাবেন থানায়? যেতে চান? এখুনি চলুন। আজই তা হলে হাতে দড়ি পড়ুক।
মাতুল বললেন, কী ব্যাপার, চুরিটুরি হয়েছে নাকি? আরে এ ভদ্রলোক তো আমার চেনা। সিনেমাপাড়ায় মেয়েছেলে নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। ভ্যাম্প গার্ল জুলির সঙ্গে আপনার তো খুব মাখামাখি! আরে মশাই চেষ্টা করলেই কি আর নায়িকা বানানো যায়! দুটি জিনিস চাই, শরীর আর এলেম। পয়সা আছে, ঢেলে যান।
মামাশ্বশুর উঠে দাঁড়ালেন। সামনে কুঁজো হয়ে পড়েছেন। কাকিমার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালেন। দু’ঠোঁটের মাঝে সিগারেটের পাইপ। ওপরের ঠোঁটের চাপে নাকের দিকে উঁচিয়ে উঠেছে। চাপা উত্তেজনায় দেহে একটু যেন যুবক-যুবক ভাব এসেছে। ঠোঁট থেকে পাইপ খুলে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, আচ্ছা!
ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সিঁড়ি বেয়ে জুতোর শব্দ নেমে গেল ধাপে ধাপে নীচে। আশ্চর্য মানুষ! কী যে করতে চান বোঝা শক্ত। অসহায় একজন মহিলার উপকার? এ যেন সম্পত্তি দখলের লড়াই চলেছে। কাকিমা তো চলেই এসেছিলেন। স্বামী বেঁচে থাকলে কী হত? স্বামীর সঙ্গেই জীবন বেঁধে পেছন পেছন ঘুরতে হত। আজ অরক্ষিতা দেখে তেড়ে এসেছেন! ব্যবহারের বস্তু করতে চান। মূর্খ! দেহ তো কিনতেও পাওয়া যায়!
মাতুল বললেন, কী ব্যাপার? বাতাসে বারুদের গন্ধ?
পিতা বললেন, তুমি বোসো। আমার চিঠি পেয়েছ?
মাতুল বসতে বসতে বললেন, কই না, চিঠি তো পাইনি! কাল আমার রেডিয়ো প্রোগ্রাম আছে, তাই আজ চলে এলুম। আপনি কি অসুস্থ! কী একটা হয়েছে। ঠিক ধরতে পারছি না।
পিতা বললেন, একটা নয়, একসঙ্গে অনেক কিছু হয়েছে!
মাতামহ শব্দ করে হাসলেন। যার অর্থ, সাধ করে ধরা দিতে এলে কেন বাপু! বেশ তো ছিলে মনের আনন্দে।
মাতুল বললেন, আপনি চাদর গায়ে দিয়েছেন? চাদর তো আপনাকে কখনও গায়ে দিতে দেখিনি!
কাকিমা এইসব কথার ফাঁকে ভেতরে চলে গেলেন। অনেক কাজ। বাড়িতে অতিথি এসেছেন। যে সে অতিথি নন, ভোজনবিলাসী শিল্পী। মনের মতো রান্না না হলে, পাতে বসে ঠুকরে চলে যাবেন।
পিতৃদেব ঘটনার বিবরণ দিতে শুরু করলেন। মাতামহের অসুস্থতা। প্রফুল্লকাকার মৃত্যু। নিজের দুর্ঘটনা। মামাশ্বশুরের আক্রমণ। শুনতে শুনতে মাতুল কেমন যেন হয়ে যাচ্ছেন। এসেছিলেন লঘু প্রজাপতির মতো। ভেবেছিলেন পুষ্পেদ্যানে এসেছেন, যেমন আসতেন। বসন্ত যে বিদায় নিয়েছে। বৈশাখের জ্বলন্ত আগুনে সব শুকিয়ে গেছে। শীর্ণ শাখায় উত্তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। প্রবীণ মানুষ দু’জনের। অদ্ভুত প্রাণশক্তি। যতবার ভেঙেছে ততবার গড়েছেন নতুনভাবে। এখনও সেই একই আশা। আবার। হবে। আবার একদল আসবে শূন্যতা ভরে দিতে! আমার মন বলছে, এই শেষ। এ নাটকের যবনিকা। পতনের সময় আসন্ন।
আমি যা ভাবছি, মাতুলও বোধহয় তাই ভাবছিলেন। সব শুনে উদাস মুখে বললেন, আবার সব ভাঙছে মনে হচ্ছে। ফাটল ধরেছে। বেশ কেমন সব গুছিয়ে উঠছিল!
পিতা বললেন, তুমি দুর্বল মানুষ, তাই তোমার চোখে ফাটল দেখছ, ভাঙন দেখছ। আমার কাছে এসব কিছু নয়। আমি থামতে জানি না, আমি ফিরতে জানি না। সহজে আমার মন ভেঙে পড়ে না। The tree the tempest with a crash of wood/throws down in front of us is not to bar/our passage to our journey’s end for good./But just to ask us who we think we are. Slec ভাঙবে, আবার গড়ব।
মাতামহ বললেন, আমি তোমার দলে। তুমি রাজমিস্ত্রি, আমি তোমার জোগাড়ে। ইট বালি সিমেন্ট এগিয়ে দেব, মশলা মেখে দেব।
মাতুল বললেন, বাবাকে কাল আমি আমার ওখানে নিয়ে যাই। ভাল জল বাতাস, শরীরটা সারবে।
নট এ ব্যাড প্রোপোজাল। এটা তো বেদের টোল। তবু ওখানে একটু যত্নআত্তি পাবেন।
মাতামহ সাধকের মতো আসন করে বসেছিলেন। বুদ্ধদেবের মতো ডান হাতের তালুটি বুকের কাছে ধরে, ডাইনে বামে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, আই ওন্ট গো। আই ওন্ট গো। আমার এক পাশে হরি আর শঙ্কর, আর এক পাশে হর হর গঙ্গে, হরিপাদপদ্ম বিহারিণী গঙ্গে, হিমবিধু মুক্তাধবল তরঙ্গে। আই ওন্ট গো। আমার যত্নআত্তির প্রয়োজন নেই। এঘর থেকে বের করে দাও, আমি রকে গিয়ে বসব। রক থেকে নামিয়ে দাও, সামনের রাস্তায় গিয়ে বসে থাকব।
মাতুল মুখ ভার করে বললেন, আমার ওপর আপনি এখনও রেগে আছেন!
ধ্যার বোকা, রাগ হল যৌবনের অলংকার। তিনকাল গিয়ে যার এককালে ঠেকেছে, তার আবার রাগ কী! অভিমান হয়তো ছিল, তাও ভেসে গেছে। এখন আমি উদাসী রাজনারায়ণ।
