ভদ্রলোক থমকে গেলেন, কী, কী খরগোশ?
যেন কিছুই জানেন না। বললুম, সেই যে হাতিবাগানে? সঙ্গে একজন সুন্দরী মহিলা! মহিলা আপনার হাত ধরে টানলেন। আপনার বয়েস হয়েছে তো। হ্যাঁচকা টানে উলটে পড়ে যাচ্ছিলেন। মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, গায়ে কিস্যু জোর নেই। আপনি তখন মাথার চারপাশে হাত ঘুরিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, মহিলার মাথার নাট বলটু সব ঢিলে। মহিলা মনে হয় আপনার স্ত্রী ছিলেন।
আমি ইচ্ছে করে বয়েস আর স্ত্রী এই দুটো শব্দের ওপর জোর দিলুম।
ধূর্তের চোখে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি? তুমি আমাকে হাতিবাগানে দেখেছ? সঙ্গে সুন্দরী মহিলা? হাসালে বাবা! আমার কি আর সে বয়েস আছে? কাকে দেখতে কাকে দেখেছ? হাতিবাগানে অনেক দাদু-নাতনি দেখা যায়!
মাতামহ শব্দ করে হাসলেন। ছোট্ট একটি কথা বললেন, স্বভাব না যায় মলে, বুঝলে, ইল্লত না। যায় ধুলে!
পিতৃদেব বললেন, নোংরা জল যত ঘোলাবেন ততই ঘুলিয়ে যাবে। আমরা যা জানি, যতটুকু জানি, তার অতিরিক্ত জানার প্রয়োজন নেই।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কাকিমাকে ডাকো।
কাকিমা বললেন, এই তিন কাপ চা বাইরের ঘরে নিয়ে যাও। খাওয়া হয়ে গেলে ভাগিয়ে দাও। ভাগনে যখন নেই, ভাগনেবউও তখন নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ঘাড়ধাক্কা। ওসব মানুষের আমি পরোয়া করি না। যখন ও বেঁচে ছিল তখন অনেক মিথ্যে বলেছি, অশান্তির ভয়ে। বুড়োর ভাগ্য ভাল যে ভাগনের হাতে খুন হয়নি।
কাকিমা হঠাৎ কীরকম বদলে গেছেন! সেই মৃদু ভীরু স্বভাব আর নেই। তিন কাপ চা ট্রে-র ওপর তুলে লগবগ লগবগ করতে করতে বাইরের ঘরে এলুম। পিতা স্বহস্তে কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, নিন, চা খান।
আমি বললুম, কাকিমা দেখা করতে রাজি হচ্ছেন না।
মাতামহ বললেন? হরিশঙ্কর, আমি কিছু বলতে পারি? তোমার অনুমতি ছাড়া কিছু বলব না।
কী আর বলবেন, ব্যাপার খুব জটিল।
এর মানে কী জানো, সেই পুরনো প্রবাদ, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস…
ব্যস, ব্যস, আর না, আর এগোবেন না।
মাতামহ অন্য পথে ঘুরে গেলেন। ভদ্রলোককে প্রশ্ন করলেন, তুমি কীরকম মামাশ্বশুর হে, ভাগনেবউ দেখাই করতে চাইছে না!
আপনারা ওর মাথাটা খেয়ে দিয়েছেন। স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্ন। জানে না, রক্ষিতার বেশি সম্মান ও এখানে পাবে না।
কী বললে?
মাতামহ আসন ছেড়ে ছিটকে উঠলেন। চোখমুখ জবাফুলের মতো লাল। ছ’ফুট লম্বা মানুষ খাড়া দাঁড়িয়ে আছেন চাবুকের মতো। যতই শরীর অসুস্থ হোক, যৌবনের ব্যায়াম আর কুস্তির চিহ্ন শরীরে এখনও লেগে আছে। হুংকার ছাড়লেন আর একবার, কী বললে তুমি?
পিতৃদেব উঠে দাঁড়িয়েছেন। মাতামহকে আগলাতে চান। ভদ্রলোক মিনমিনে গলায় বললেন, মারবেন নাকি?
মাতামহ বললেন, তোমার মতো ছুঁচোর গায়ে আমার হাত দিতে ঘেন্না করছে। স্রেফ দু’আঙুলে ঘাড়টি ধরব, আর বেড়ালছানার মতো তুলে বাইরের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসব।
মাতামহ সত্যিই এগোচ্ছিলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বুকের কাছে দাঁড়ালুম। জানি আমাকে ঠেলে এগোতে পারবেন না। শক্তি দিয়ে আটকাতে পারব না। আমার সে ক্ষমতা নেই। স্নেহের দাবিতে এই সাধক মানুষটিকে হয়তো ঠেকানো যাবে। বিশ্রী একটা পরিণতিকে কোনওক্রমে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
ইন্দ্রিয়সেবী মদ্যপ মানুষটি ভয় পেলেও অর্থের অহংকারে যুঝে যাচ্ছেন। কাঁপাকাঁপা হাতে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমাকে তা হলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে!
মাতামহ বললেন, তোমার আইনের মুখে আমি প্রস্রাব করি।
পেচ্ছাপই বলতেন। এত ক্রোধেও পিতার কথা ভোলেননি, শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করলেন। চাবির থোলোর শব্দে দরজার দিকে তাকালাম। কাকিমা ঘরে এলেন। এমন দৃপ্ত ভঙ্গি আগে কখনও দেখিনি। ঘরে ঢুকেই বললেন, আপনার আইন আমাদের কাঁচকলা করবে। আপনার স্বভাবচরিত্রের কথা একবার বলব এঁদের সামনে? আশ্রয় দিয়ে, টাকার লোভ দেখিয়ে কী করেছিলেন? বলব সব কথা এক এক করে! চলুন থানায়, এখুনি চলুন, আমি জানি, নিজের সুবিধের জন্যে আপনিই ভাগনেকে খুন করিয়েছেন। টাকার জোরে মানুষ সব করতে পারে। চলুন থানায়।
কাকিমা কোমরে আঁচল জড়িয়ে রণরঙ্গিণী মূর্তিতে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। ভদ্রলোক সিগারেট টানতে ভুলে গেছেন। মিউ মিউ করছেন, এ তুমি কী বলছ? ভাত ছড়ালে কাকের অভাব? এ তুমি কী বলছ?
সদরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। দরজা বন্ধ করার বোদা শব্দ। সামনের সিঁড়িতে জুতোর আওয়াজ।
১.৬২ I shall go to her
আমি শার্লক হোমস নই, তবু সিঁড়িতে জুতোর চলন দেখে অনুমান করতে পারছি, যিনি উঠে আসছেন তার শরীর হালকা। মেজাজ বেশ খুশিখুশি। বেতালা নন, তাল লয় ছন্দের জ্ঞান আছে। অবশ্যই শৌখিন। কারণ পায়ের জুতো পঞ্চমে বাঁধা তবলার মতো আধধায় বাজছে। কে আসছেন? এমন মানুষ একজনই আছেন, তিনি গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন ভাগ্যান্বেষণে।
দরজার আড়াল থেকে একটি মুখ উঁকি মারল। গোন্ড-ফ্রেমের রিমলেস চশমা। কপালের দু’পাশে চুলের স্তবকের বিদ্রোহ। তসরের পাঞ্জাবি নেমে গেছে হাঁটু ছেড়ে। একটা কোণ, হাতার সামান্য অংশ দৃশ্যমান। ফুলপাড় কোঁচার একটু শাসন-ছাড়া অংশ চৌকাঠ ডিঙিয়ে থমকে গেছে। পাতলা ঠোঁটের ওপর তুলি দিয়ে আঁকা সূক্ষ্ম গোঁফ। টানাটানা দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে। চোখে শিশুর কৌতূহল, প্রচ্ছন্ন দুষ্টুমি খেলা করছে।
