কাকিমা মুখ তুলে তাকালেন, চা খাবে?
এক চুমুক।
আজ কিন্তু বাজার করতে হবে।
করব।
দু’জনেই চমকে উঠলুম, নীচে কাশির শব্দ হচ্ছে। দমকা, একটানা। ব্রঙ্কাইটিস বেশ চেপে ধরেছে। এক ফাঁকে শোনা গেল, কই গো কোথায় গেলে?
গলা শুনে দু’জনেরই মুখ শুকিয়ে গেল। সেই আলগা চরিত্রের মামাশ্বশুর। চুলে পমেড, মুখে পাউডার, গায়ে আতর। সর্বনাশ, আবার এসেছেন। কাকিমার হাত থেকে চামচে পড়ে গেল। বাঘের সামনে শিকার যেমন কাঁপতে থাকে, কাকিমা সেইরকম কাঁপছেন। আমাকে বললেন, তাড়াও তাড়াও, যেমন করে পারো তাড়াও।
আমি তাড়াবার কে? ভদ্রলোক বড় চটচটে। ধরলে সহজে ছাড়ানো যায় না।
ভদ্রলোক উত্তর না পেয়ে বললেন, ওপরে বুঝি!
জুতোর মুচমুচ শব্দ উঠোন পেরিয়ে এগিয়ে আসছে। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন। উঠে বাঁয়ে বাঁক নিলেই রান্নাঘর। কাকিমা আতঙ্কের গলায় বললেন, বটঠাকুরকে খবর দাও। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠছে।
আসুন না, ভয় করার কী আছে? জোর করে নিয়ে যেতে পারবেন?
না না, ওকে দেখলেই আমার গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। আমাকে টেনে নরকে নামাতে চায়। পিতৃদেব চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে উত্তরের বারান্দায় দাঁড়ালেন। সিঁড়ি ভেঙে ভদ্রলোক উঠে আসছেন ধাপে ধাপে। চেহারা দেখলেই মনে হয় অন্য জীবনের মানুষ। ফোকরে চামচিকি থাকে। এ বাড়ির কোনও ফোকরেও এঁর স্থান হতে পারে না। হাতের আঙুলে আঙুলে লাল, নীল, সবুজ। আংটি। ঠোঁটে এতখানি একটা পাইপে লাগানো সিগারেট। মাথার চারপাশ দিয়ে ফিনফিন করে ধোঁয়া ছুটছে। সাদা পাঞ্জাবির বুকের কাছে ধোঁয়ার পুঁয়ে সাপ লিকলিক করছে।
পিতৃদেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আসুন। সামনেও একটা সিঁড়ি ছিল।
একছিটে কাশি মিশিয়ে বাবু বললেন, যে-কোনও এক দিক দিয়ে এলেই হল। তা আছ কেমন?
ভালই।
ভাল তো থাকবেই। সেবাযত্ন পাচ্ছ!
পিতৃদেবের চোখদুটো জ্বলে উঠল। হাত মুঠো হল। অসীম সংযমে নিজেকে ধরে থাকলেন। হাওয়ার মুখে পেপার ওয়েট চাপা কাগজের মতো। ধীর গলায় বললেন, তা হবে।
আঙুর গেল কোথায়? ঝি-গিরি করছে!
আপনার কি তাই মনে হয়?
মনে হবে কেন, তাই হয়। সুখে থাকতে মানুষকে ভূতে কিলোয়। এখানে ওর পড়ে থাকার রাইটটা কী? কী অধিকারে পড়ে আছে?
প্রশ্ন আমাকে না করে তাকেই করুন।
সে এখন নেশার ঘোরে আছে।
কীসের নেশা?
যৌবনের নেশা।
তার মানে?
মানে বুঝে নাও।
পিতৃদেবের চোখদুটো আবার জ্বলে উঠল। হাত মুঠো হল। আক্রান্তকে রক্ষা করার জন্যে মাতামহ উঠে এলেন। অসুস্থ হলে কী হবে! সেই ছ’ফুট লম্বা, সাত্ত্বিক চেহারা। গায়ের রং টকটক করছে। জীবিত স্তম্ভের মতো পিতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই মুহূর্তে লোকটিকে মনে হচ্ছে ইন্দ্রিয়সেবী মর্কট। ভোগের দুর্ভোগে চোখের কোলদুটো টেপারির মতো ফুলে আছে। মাতামহের এইসব পরিস্থিতি সামলাবার অসীম ক্ষমতা। জোঁকের মুখে নুন ছিটোতে জানেন। সাধনলব্ধ একটা শক্তিও আছে। এখন আমি অবাক হয়ে ভাবি, কাকিমা এই মামাশ্বশুরকে একদিন বলেছিলেন দেবতুল্য মানুষ। সাত ভরি সোনার গহনা গড়িয়ে দিয়েছিলেন। তখন তো হাত পেতে নিতে পেরেছিলেন। রাতের বেলা নির্জনে মামাশ্বশুরের বাতের সেবা করতেন। প্রফুল্লকাকা সন্দেহ করেছিলেন, যে-সন্তানটি এসে নষ্ট হয়ে গেল সেটি কার? মানুষের মন বড় অপবিত্র! সেই কাকিমা এখন মানুষটিকে দেখে গোসাপের সামনে সাপের মতো জড়োসড়ো। মেয়েদের চেনা বড় শক্ত। হতে পারে, এই পরিবারে থাকতে থাকতে কাকিমার রুচি পালটে গেছে।
মাতামহ মানুষের চেহারা দেখে সঙ্গে সঙ্গে একটা নাম উদ্ভাবন করেন। সেই নামেই কথাবার্তা চলতে থাকে। মাতামহ বললেন, এই যে মর্কটানন্দ, সকালেই সেজেগুঁজে হাজির!
ভদ্রলোক থতমত হয়ে গেলেন। সামলে নিয়ে বললেন, আমার পিতৃদত্ত একটা নাম আছে। সেই নামে ডাকলে সুখী হব।
তোমার সব নাড়িনক্ষত্র আমি যে জানি প্রভু, সে নামে তোমাকে ডাকি কী করে! বাপ যদি আদর করে কানা ছেলের নাম রাখে পদ্মলোচন, তাতে কি লোচন পদ্মের মতো হবে!
ভদ্রভাবে কথা বলুন।
নিজে আগে ভদ্র হও। তুমি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলবে, আর আমরা তোমার প্রজার মতো শুনে। যাব, তা তো হয় না মানিক!
পিতা মাতামহের দিকে তাকিয়ে বললেন, অপমান করার অধিকার আমাদের নেই, অপমানিত হবার মতো উদারতা আমাদের আছে। ওই মহিলার সঙ্গে ইনি সম্পর্কিত। একমাত্র আত্মীয়ও বলা চলে। ব্যাবসা করে পয়সা করেছেন। শিক্ষা আর সংস্কৃতি না থাকলে অর্থ মানুষকে একটু অসভ্য করে। ওঁর এই আচরণ আমাদের মেনে নিতেই হবে।
তুমি বলেছ ঠিক। মুখে মেয়েদের মতো কীরকম পাউডার মেখেছে দেখো। যেন যাত্রার দলের মিনসে মাগি!
পিতৃদেব দু’হাতে মাথার দু’পাশ চেপে ধরে বলে উঠলেন, আরে ছি ছি। আপনি ভীষণ ভালগার হয়ে যাচ্ছেন।
রাখো তোমার ভালগার! সারাজীবন আমি অনেক ভাগাড়ে ঘুরেছি। সংসারের ট্র্যাফলগারে সময় সময় ভালগার না হলে, মানুষ বড় পেয়ে বসে।
পিতৃদেব ভদ্রলোককে বললেন, আপনি ঘরে এসে বসুন।
আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভদ্রলোক বললেন, ছেলে তো বেশ বড় হয়েছে, এইবার একটা মেয়ে জুটিয়ে বিয়ে দিয়ে দাও? সব ল্যাঠা চুকে যাক।
অসভ্যের ভাষা দেখো? মেয়ে জুটিয়ে? স্বভাব যাবে কোথায়! চরকা দেখলেই তেল দিতে ইচ্ছে করে।
গা যেন জ্বলে উঠল। একটু ধাক্কা মারা উচিত! পিতা আজ অন্য নীতি শেখাচ্ছেন। একসময় বলতেন, টিট ফর ট্যাট। হঠাৎ বলে ফেললুম, সোনালি খরগোশ কেনা হল সেদিন?
