এখন কি দুর্নাম হচ্ছে?
হলেই হল।
শ্রীনাথদার কাঁচি চলছে ‘হলেই হল’ ছন্দে। মনটা ভীষণ দমে গেল। মানুষ দেখি সব পারে! আমার আদর্শবাদী একরোখা পিতৃদেবের অনেক শত্ৰু, সুযোগ পেলেই বোলতার হুল চালাবে। ছাড়বে না। বিবর্তনের ধারায় জীবচক্রে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের আগমন। বাঘের রক্তলোভী স্বভাব মানুষে এসে কুৎসালোভী হয়েছে।
শ্রীনাথদাকে তাড়া লাগালুম, আর বসা যাচ্ছে না, অত মেলামিলি, দশআনা-ছ’আনার প্রয়োজন নেই। একেবারে মুড়িয়ে কদমছাট করে দিন।
দাঁড়া রে বাবা। চুল কাটতে বসে অধৈর্য হলে হয়! বেশি ছোট করলে কামড়ি নষ্ট হয়ে যাবে। সবকিছুর একটা শো আছে। যে-মুখে যেমন মানায়।
আমি যা বলছি তাই করুন। একেবারে কদমছাঁট।
হ্যাঁ, কদমছাঁট! তুমি বললেই আমি করছি! আরে লোকের কথায় রাগ করতে আছে! চোরের ওপর রাগ করে ভাই ভুয়ে ভাত খেয়ো না। যে যা করার তা করবেই। তুমি চুল বড় রাখলেও করবে, তুমি চুল ছোট রাখলেও করবে। এই যে গজেনবাবু, ছেলের জন্যে পাত্রী দেখতে গিয়ে নিজে বুড়ো বয়েসে বিয়ে করে চলে এলেন। বেশ তো আছেন বাবা! লজ্জা নেই, নিন্দের ভয় নেই। বুক ফুলিয়ে আসা-যাওয়া করেন। ছেলেটা বিবাগী হয়ে সরে পড়ল। বোকামি, বোকামি! তুই গৃহত্যাগ করলি কোন দুঃখে! তোর বাপের চোখের সামনে থেকে বাপকে আরও বেশি শাস্তি দিতে পারতিস। তোকে চোখের সামনে দেখত, আর বুড়োর বিবেকে খোঁচা লাগত। যাকে বউমা বলার কথা, তাকে বউ বলছে! পৃথিবীটা মানুষেই নষ্ট করে দিলে। হরিদাকে আমি চিনি। কোনও ছোট কাজ তার দ্বারা সম্ভব নয়। যারা অপবাদ রটাচ্ছে, তারা সব ঘেয়ো কুত্তা।
শ্রীনাথদা ক্ষুর দিয়ে ঝুলপি সমান করছেন। কুত্তা বলার সময় উত্তেজনায় হাত কেঁপে গেল। লাগল, ভাগ্য ভাল কাটেনি। আর একবার চারপাশে পাউডার মেরে যখন খরখরে বুরুশ দিয়ে চুল ঝাড়তে লাগলেন, তখন প্রায় কেঁদে ফেলার জোগাড়। মনে হচ্ছে ছালচামড়া গুটিয়ে যাবে। মার্কিনের টুকরোটা খুলতে খুলতে বললেন, এ পাড়াটা হল ছোটলোকের পাড়া। একসময় ভাল। ছিল। যত দিন যাচ্ছে…।
কাপড়ের টুকরোটা এত জোরে ঝাড়লেন, বন্দুক ছোঁড়ার মতো শব্দ হল। ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে এলুম। শ্রীনাথদা মোটামুটি লেখাপড়া জানা মানুষ। শুনেছি ম্যাট্রিক পাশ। নানারকম বই। পড়েন। একমাত্র ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। ভদ্রলোক আবার কবিতা লেখেন। একবার দুবার পড়ে শুনিয়েছেন। নেহাত ফেলে দেবার মতো নয়। পাতে দেওয়া চলে। ছেলের পর, পরপর দুটি মেয়ে হয়ে ভদ্রলোককে বড় বেকায়দা করে দিয়েছে। সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চুল দাড়ি, দাড়ি চুল, এই কেবল চলছে।
বাজার একেবারে জমজমাট। সাইকেল, মোটর, ভ্যান, যাচ্ছে আসছে। মিষ্টির দোকানে জিলিপির পাহাড়। গরম শিঙাড়া ভাজার গন্ধ বেরোচ্ছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রবীণে প্রবীণে কথা হচ্ছে। পাকার খড় নিয়ে ঠ্যালা চলেছে। ওপর দেখে বোঝার উপায় নেই, সমাজের কোথায় পচন ধরেছে।
সারাবাড়িতে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা নেমে এসেছে। মাতামহের মুখের দিকে তাকালেই মনে হয়, প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে। এইবার বুকোটা দপ করে জ্বলে উঠবে। কথা বললে মনে হয়, কোন সুদূর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর। যেন কোনও পর্বতের ওপার থেকে উঠে আসছে মেঘের মতো, জলভারে সিক্ত। হাসি! আর সে প্রাণ নেই। চোখমুখ সবসময় থমথমে। আমাদের অনেক অব্যবহৃত ঘরের কোনও একটায় মৃত্যু যেন অদৃশ্য অতিথির মতো এসে বসে আছে তার ফোল্ডিং স্ট্রেচার নিয়ে। গভীর রাতে সে আমাদের উত্তরের বারান্দায় ধীর পায়ে চলে বেড়ায়। তালা-আঁটা ঘরের দিকে আমি দিনের বেলায় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। তুমি এসেছ, আমি জানি। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তোমার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে।
পিতৃদেব সেরে উঠছেন। তবে সে মানুষ আর নেই। বিশাল একটা বোঝা নিয়ে চৈত্রের দুপুরে কোনও মানুষ মাইলের পর মাইল হেঁটে এলে মুখচোখের অবস্থা যেরকম হয়, তার মুখের অবস্থাও সেইরকম। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বীতশ্রদ্ধ। বই নিয়ে বসে থাকেন, চোখ চলে যায় সুদূরে। যেন কাউকে খুঁজছেন। এমন কেউ, যে পাশে এসে দাঁড়ালে জীবন আবার সহনীয় হয়ে উঠবে।
মাতামহ আমার চুলের দিকে তাকিয়ে পুরনো দিনের মতো রসিকতা করার চেষ্টা করলেন। এ কী করে এলে, তিরুপতি গিয়েছিলে নাকি? একেবারে কচুকাটা করে এলে। ঘাসহঁটা করে দিয়েছে।
পিতৃদেব একবার মুখ তুলে তাকালেন। কোলের ওপর খবরের কাগজ এলোমেলো। তিনি কোনও মন্তব্যই করলেন না। দু’জন খেয়ালি করিতকর্মা মানুষ আজ কর্মময় জগতের একপাশে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছেন। ইচ্ছে থাকলেও কিছু করার সামর্থ্য নেই। মাতামহ তীর্থে যাবার জন্য ছটফট করছেন। পিতৃদেবের ইচ্ছে ছিল পুত্রবধূকে আনার আগে, এই জরাজীর্ণ বাড়িটাকে ভেঙেচুরে নতুন করবেন। ভেবেছিলেন চারপাশে খুশির ফোয়ারা ছুটবে। সবই বোধহয় ভেস্তে গেল।
কাকিমা চা তৈরি করছেন রান্নাঘরে। শাড়ির রং বদলে সাদা হয়ে গেছে। সাজগোজের আর সে ঘটা নেই। আঁচলে এক থোলো চাবি। পিতৃদেব সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিষণ্ণ মন আরও বিষ হয়ে গেছে। যে-ভদ্রলোকের অসাবধানতায় বুকে অ্যাসিড ছিটকে লেগেছে, সেই ভদ্রলোককে ট্রান্সফার করা হয়েছে গাজিপুরে।
