আমার মনের ধাঁচটা বেশ বুঝে গেছি। জুয়া খেলার চাকার মতো। হাত ঠেকাবারও প্রয়োজন হয় না। সামান্য ফুঁ দিলেই ঘুরতে থাকে। মুকু খুব খাঁটি কথা বলেছে, নিজেকে বেশি দিন খোলা ফেলে রেখো না। তোমার কথাই ঠিক। সব ফঁকফোকর এইবার ভরাট করব, তবে তোমাকে দিয়ে নয়। এমন কিছু দিয়ে যা বঞ্চনা করে না, শিশিরের মতো যা ভোরের প্রথম সূর্যেই উবে যায় না।
তবু চিঠিটা আমি ছিঁড়ে কুচিকুচি করতে পারলুম না। সাবধানে ড্রয়ারে ভরে রাখলুম মূল্যবান ট্রফির মতো।
শ্রীনাথদার সেলুনের দোল-খাওয়া দরজায় নতুন কাঁচ বসেছে। কাঁচে আবার নকশা খেলছে। গাছের ডাল ধরে শকুন্তলা দাঁড়িয়ে। ভেতরের দেয়ালে নতুন রং পড়েছে। বেশ একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। তেমন ভিড় নেই। একজন মাত্র খদ্দেরের দাড়ি চাচা হচ্ছে। খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। থুতনির তলায় হাতের উলটো পিঠ ঘষে বলছেন, এই জায়গাটায় আর একবার মারো কবিরাজ, খড়খড় করছে।
চামড়ার ফিতেতে ক্ষুর ঘষতে ঘষতে শ্রীনাথ বলছেন, দাড়ি উলটোপালটা টানলেই পেকে যায়। এই বয়েসে এত শক্ত দাড়ি করে ফেলেছেন! এরপর তো তরোয়াল দিয়ে কামাতে হবে।
ভদ্রলোক বললেন, আমাদের বংশ একটু কড়াধাতের। মেজাজ কড়া, পায়ে কড়া, দাড়ি কড়া, সব কড়া। তুমি শ্রীনাথদা বকবক না করে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দাও তো।
শ্রীনাথদা চোখের ইশারায় আমাকে দ্বিতীয় চেয়ারে বসতে বলে, খুনির মতো ক্ষুর হাতে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন। দাড়ি কামাবার সময় শ্রীনাথদার ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে যায়। যেমন অন্যের মুখে খাবার ভরে দিতে গিয়ে অনেকের নিজের মুখ হাঁ হয়ে যায়।
দাড়ি কামানো শেষ হল। ভদ্রলোক ঠ্যাং করে পয়সা ফেলে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আমার গায়ে আধময়লা মার্কিনের টুকরো জড়াতে জড়াতে শ্রীনাথদা বললেন, দাড়ি কখনও উলটো টানবে না। টেনেছ কি মরেছ। তারের বুরুশ হয়ে যাবে। জামার কলারটা উলটে ভেতর দিকে খুঁজতে খুঁজতে বললেন, চুল ভীষণ বড় হয়েছে যে গো! তোমার ভীষণ চুলে মাথা। বেশ কবি কালিদাস কবি কালিদাস চেহারা হয়েছে।
মার্কিনের গাঁট বাঁধতে বাঁধতে বললেন, দাঁড়াও, একটু বিড়ি ফোঁকা করে নিই। একটা দাড়ি নামাতে জীবন বেরিয়ে গেল।
বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শ্রীনাথদা ঘাড়ের কাছে এসে সামনে ঝুঁকে পাউডারের কৌটো তুলে। নিলেন। এতদিনে পাফটা নতুন হয়েছে। পাউডারে ফুলের গন্ধ লেগেছে। দাড়ির চেয়ে চুলে আর পাউডারে দাদার হাত খুব দ্রুত চলে। ঘাড়ের কাছে ঝপাঝপ পাউডারের থুপপি চালাতে চালাতে বললেন, মেয়েছেলেটি তা হলে তোমাদের বাড়িতেই রয়ে গেল?
কাঁধের ওপর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে পাউডারের কৌটোটা ঠকাস করে সামনের তাকে রাখলেন। ভদ্রলোকের জামায় বিশ্রী একটা সেলুন-সেলুন গন্ধ। এমন একটা কথা বললেন যা এই গন্ধের চেয়ে দুর্গন্ধময়। মেয়েছেলে শব্দটাই কুৎসিত। হাতদুটো কাপড়ের টুকরোয় জড়ানো। উঁচু চেয়ারে আয়নার তলার তাকে পা পুরে বেকায়দায় আছি তাই, তা না হলে ছিটকে রাস্তায় নেমে যেতুম। ঠান্ডা গম্ভীর গলায় বোকার মতো বললুম, নতুন মেয়েছেলে?
ওই যে গো সেই তবলচির বউটা।
কানের পাশে মুখ রেখে কথা বলছেন। বিড়ির গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছে। কত ব্যাপারেই না মানুষের মাথা ঘামে! কে বলেছে, চার দেয়ালে আমাদের সকলের পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা হয়! দেয়ালের অসংখ্য চোখ, অসংখ্য কান। আমরা হাটের মাঝে জীবন মেলে বসে আছি।
শান্ত গলায় বললুম, কোথায় আর যাবেন? মহিলার কেউ কোথাও নেই।
খুব বেশি বয়েস হবে বলে মনে হয় না! কী ভাগ্য বলো তো?
কথা এইবার নিজের রাস্তা ধরেছে। পারিবারিক কথা পেঁয়াজের মতো। যত ছাড়াবে তত কেচ্ছার গন্ধ বেরোতে থাকবে। শ্রীনাথদার কথায় যে সহানুভূতির আভাস, তা অনেকটা মাছধরা। চারের মতো। কেচ্ছার রুইকাতলা গভীর জল থেকে টোপে ভেড়াতে হলে চার ফেলতে হয়। ভালমানুষ সাজতে হয়, ন্যাকামো করতে হয়। সেলুন এমন একটা জায়গা যেখানে এলেই সমাজের নাড়ি ধরা পড়ে। ভাগ্যিস এসেছিলুম, মাত্র এই কয়েক দিনেই তা হলে অর্কেস্ট্রা শুরু হয়ে গেছে।
ঘাড়ের কাছে কাঁচির খেলা শুরু হয়েছে। সেই আবহসংগীতে শ্রীনাথদার গলা ভাসছে, ওই, তবলচি শুনেছি খুব সুবিধের লোক ছিল না। মামাটা তো খুব পয়সাঅলা লোক?
তা হবে।
সে তো আবার বিয়েথা করেনি?
কে জানে!
আরে আমি সব জানি। লোকটার একটা মেয়েমানুষ আছে। এখন ব্যাবসা-ফ্যাবসা সব লাটে তুলে দিয়ে সেইখানেই পড়ে থাকে।
যে যা করে করুক, তাতে আমাদের কী?
তা ঠিক। তবে কী জানেনা, মানী গুণী লোকের কিছু হলে গায়ে বড় লাগে। কষ্ট হয়।
কার কথা বলছেন?
এই তোমার বাবার কথা।
অ্যাসিড-ট্যাসিড নিয়ে কাজ করতে গেলে ওরকম দুর্ঘটনা যে-কোনও মুহূর্তেই হতে পারে। ভয়ের কিছু নেই।
অ, হরিদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বুঝি?
হ্যাঁ, আপনি জানেন না?
শুনছিলুম, কী যেন একটা হয়েছে। পাঁচজনে পাঁচকথা বলছে, কোনটা যে কী বুঝি না বাপু। মাথা-ফাথা খারাপ হয়ে যায়। মেয়েছেলে বড় সাংঘাতিক জিনিস মাইরি! বাঘের মতো। ছুঁলে আঠারো ঘা।
মেয়েছেলে মানে?
ওই যে তবলচির বউ! স্বামীর ঘর তো ভাল করে সাধ মিটিয়ে করতে পারলে না। না পারলে যা হয়, খাইখাই স্বভাব। আর তো সে দিনকাল নেই, ধর্মটর্ম সব আলগা হয়ে গেছে। বিধবাদের আগে কত বাঁধন ছিল! মানুষের মন তো খুব নোংরা! পাঁচজনে পাঁচকথা বললে বড় খারাপ লাগে। তোমাদের পরিবারের একটা সুনাম ছিল।
