কনকের সোনার কলমে কালি ভরা হল। এমন কলম আমি জীবনে দেখিনি। নাম লেখা আছে। পার্কার। এঁরা বেশ বড়লোক। চালচলন, সঙ্গের জিনিসপত্র, চেহারা, দেখলেই বোঝা যায় মেসোমশাই লক্ষ্মী এবং সরস্বতী দুই দেবীরই কৃপা লাভ করেছেন।
মাটির যে-গামলাটায় বেদানার খোলা আর হরীতকী পচছিল সেটা হঠাৎ নড়ে উঠল। কনক বললে, ওই দেখো জ্যান্ত কালি। ভুড়ভুড় করছে।
ও অমন হয়, ফার্মেন্টেশন হচ্ছে তো। নিজের জ্ঞান জাহির করতে পেরে বেশ গর্ব হল। গামলা থেকে কী একটা লাফিয়ে উঠে আবার গবাত করে গামলাতেই পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। কনক বললে, ওই দেখো কালির ন্যাজ বেরিয়েছে।
দু’জনেই গামলার দিকে ঝুঁকে পড়লুম। কালির আবার ন্যাজ কী রে বাবা! পিতা চেয়েছিলেন বিলিতি কোয়ালিটি। তিনি তো ন্যাজ চাননি। ফিল্টার করলে লাল বাদ যাবে কি! বাঁদরকে ফিল্টার করলে মানুষ হবে? ডারউইন সায়েব বেঁচে থাকলে একটা বেয়ারিং চিঠি লিখতুম।
আমিও তো আর এক পণ্ডিত। অনেক ভেবেচিন্তে বললুম, এটা হল সেই ব্যাপার বুঝলে কনক, জলে বিচিলি ভিজিয়ে রাখলে দিনকতক পরে ছোট ছোট সাদা সাদা ন্যালবেলে পোকা হয়, মাছের খাদ্য। কেমন হয় তো?
কী জানি, হয়তো হয়।
কী জানি মানে? আমি নিজে করে দেখেছি। আমার একটা গোল্ডফিশ ছিল। বেড়ালে খেয়ে না ফেললে আজ কত বড় হত। বেদানা কাবুলে জন্মায়, হরীতকী সাধুদের আহার। কাবুলিদের চেহারা দেখেছ? সাত ফুট বাই পাঁচ ফুট। সেই বেদানার খোলা পচে যে পোকা হবে তার আকার আকৃতি একটু বড়সড়ই হবে। এ তো কমন সেন।
আমার থিসিসও শেষ হল আর সেই কাবুলিপোকা তিড়িং করে এক লাফ মেরে, পড়বি তো পড় কনকের কোলে।
ওরে বাব্বা, খেজুর, বলে কনক উলটে পড়ল। সেই পা! পা থেকেই পাপ। পরিপূর্ণ তিনটি বোতল সুন্দরীর পদাঘাতে তিন গুন্ডার মতো তিন দিকে ছিটকে গেল। একেই বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। পিতৃদেবকে রাতে কী কৈফিয়ত দোব?
১.০৫ মাগুর মাছের ঝোল, যুবতী নারীর কোল
পণ্ডিতের ঘরেই মূর্খ জন্মায়। আবার মূর্খরাই পণ্ডিত হয়। সেই তিন পণ্ডিতের গবেষণার গল্প। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে চাষার কোদালে একটি তালের আঁটি উঠেছে। জটাজুটধারী। কী বস্তু কে জানে? কোনও দেবতাটেবতা নয় তো! তিন পণ্ডিত এলেন। টিকি নেড়ে, নস্যি নিয়ে, একজন বললেন, এ বস্তুটি হল শকুনের বাত্সা। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত দু’জন পণ্ডিত কখনও একমত হতে পারেননি। দ্বিতীয় পণ্ডিত বললেন, তুমি কসু জানো, এটা বাদুড়ের বাস। তৃতীয় পণ্ডিত বললেন, প্রণাম করো, ইনি হলেন ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির মাথা। চাষা ব্যাটা কোদালের কোপে ধড় থেকে নামিয়ে এনেছে। কুম্মাণ্ডকে নিয়ে চলো কোতোয়ালের কাছে, বিচার হবে। কারুর সর্বনাশের রাস্তা খোলা হলে। পণ্ডিতরা সঙ্গে সঙ্গে একমত। আহা ব্যাটা শূলে চড়বে। হাকিম শূলে প্রায় চড়িয়েই ফেলেছিলেন। হাকিমের স্ত্রী বললেন, আরে ওটা তো তালের আঁটি। আমাকে দাও, ভেঙে ফোঁপলটা খেয়ে ফেলি।
গামলার প্রাণীটি যে একটি নেংটি ইঁদুর দুই পণ্ডিতে বুঝে উঠতে পারিনি। কনকের কোল থেকে মেঝের ওপর তার পলায়নের রেখা টেনে জলচৌকির নীচে গিয়ে ঢুকেছে। আর তাকে পায় কে? এদিকে তিন বোতল কালির স্রোত মেঝের ঢাল বেয়ে নর্দমার দিকে গড়িয়ে চলে গেছে। নীল, কালো, নীলকালো, সব মিলেমিশে সর্বধর্ম সমন্বয়ের মতো একাকার। মাঝখানে আমি এক শ্রীরামকৃষ্ণ হাত ঊর্ধ্বাকাশে তুলে সমাধিস্থ। কনক এক মহামায়া, ভূমিশয্যায় আড়কাত হয়ে হেসে কুটোপুটি। দরজায় উঁকি মারছে আর এক মহাশক্তি মুকু। কে যেন বলেছিলেন, নারী নরকের দ্বার। আমার মাতামহ। মাতামহী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন হয়তো বলেছেন, স্বর্গদ্বার। শৃগাল অনেক লম্ফঝম্ফর পর নাগাল না পেয়ে বলেছিল, দ্রাক্ষাফল টক। মাতামহী বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে সরে পড়ার পর সেই স্বর্গদ্বার হয়ে গেল নরকের দ্বার। আমার তেমন কোনও বন্ধন নেই, প্রায় নাঙ্গাবাবা, আমি ভেবেচিন্তেই বলছি, বাক্যটির মধ্যে কিঞ্চিৎ সত্য আছে। আমি যদি সরাইকেল্লার মহারাজা হতুম, তা হলে মায়ার কাছে যেতুম গজমোতির হার নিয়ে ঘোড়ায় চেপে। এক শিশি কালি তো সেই গজমোতির হার। কনট্রোলের শাড়ি পরা রাজকুমারীর মনে সামান্য আঁচড় কাটার চেষ্টা। মানুষের অভাব বেড়েছে, স্বভাব কিছুই পালটায়নি। তপস্যা করলেও বেড়াল বেড়ালই থেকে যাবে। উপনিষদ কত আগেই বলে রেখেছেন, নান্যঃপন্থা। আদি রিপুকে মালসায় ফেলে গন্ধকের আগুনে পোড়ালেও কিছু হবে না।
ছেঁড়া কাপড় দিয়ে নিংড়ে নিংড়ে ওই কালিকে যতটা সম্ভব বোতলে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা হলে রাতে এই সুন্দরীদের সামনে আমার নাজেহাল অবস্থা হবে। বারেবারে শুনতে হবে তিন চরণ কবিতা,
Sons dangle their fathers with a rope, creation kills the creator,
even the Almighty Lord.
কার লেখা কে জানে, বারেবারে শুনে শুনে কান পচে গেছে। ঘরের নর্দমার ছোট্ট মুখে একটি গোল কাঠ গোঁজা। সেখানে তৈরি হয়েছে কালির আরব সাগর। এমন এক পাপ ছড়িয়েছে যাকে আর সহজে চাপা দেওয়া যাবে না। নর্দমা চুঁইয়ে ওপাশে সিঁড়ির দেয়াল দাগরাজি করবেই। এতক্ষণে করেও ফেলেছে। কতরকমের রসিকতা আছে! মুকু বললে, আহা আমার বড় ইচ্ছে করছে ওই কালি পুকুরে একটা কাগজের নৌকা ভাসাই। কনক বললে, থাক, বুড়ি বয়েসে আর ছেলেখেলার দরকার নেই। বাবা কোথায় রে?
