মুকুর চিঠি ক্রমশই রহস্যময় হয়ে উঠছে। মেসোমশাই ইদানীং কী করছেন! মাসিমা তো শ্যামদেশ থেকে হাঁটাপথে আসার সময় আরাকানের জঙ্গলে দেহ রেখেছেন। পথের ক্লেশ সহ্য করতে পারেননি। বিপত্নীক মেসোমশাই কি তা হলে ইন্দ্রিয়ের কাছে হার মেনেছেন? প্রৌঢ় মানুষটির কি তা হলে পদস্খলন হয়েছে! কী জানি! সেসব বৃত্তান্ত ছিল মুকুর রেখে যাওয়া লেফাফায়। কনক কী এমন ভাল কাজ করলে! হোমচৌধুরিটি কে? কনকের কোনও পূর্ব পরিচিত। গড নোজ। এসব ব্যাপারে আমার আর কোনও আকর্ষণ নেই। বাতাস ঘুরে গেছে। হাওয়া-মুরগির। মুখ এখন অন্য দিকে। সব ধর্মগুরুই আমাকে নেতিবাচক কথা শুনিয়েছেন। এখন না, পরে। সতীমা ভয় দেখিয়েছেন। ঘুরঘুরে বাবা ভূত দেখিয়েছেন। জয়ামাতা বলে গেছেন বছর চারেক পরে। একমাত্র স্বামী নির্মলানন্দের কাছে কিছু পজেটিভ কথা শুনেছি। ঈশ্বর নয়, ভক্তিরস নয়, জ্ঞানমার্গ। নিজেকে ধরো। হাত জোড় করে বলো–দুর্বল আমি, সবল হও। ক্ষুদ্র হৃদয় দৌর্বল্যং তক্তোতিষ্ঠ পরন্তপঃ। নিজের ওপর নিজে উঠে পড়ে লাগাম ধরে বোসো। সেই আমির বশে এই আমিকে সঁপে দাও। সেখানে মুকুর ভালবাসা নেই, কনকের আকর্ষণ নেই, অপর্ণার আগমন-প্রত্যাশা নেই, কাকিমার কী জানি কী নেই। প্রফুল্লকাকার মৃত্যুর খবর অফিশিয়ালি জানাজানি হয়ে যাবার পর আমি কাকিমাকে হিন্দুর ঘরের বিধবার মতোই দেখতে চাই। শুদ্ধ, সাত্ত্বিক, আচারনিষ্ঠ। তবু কেন জানি না,নারীর মন জয় করার আনন্দে ভেতরটা থেকে থেকে গুনগুন করে উঠছে। কী একটা হচ্ছে। যা বলে বোঝানো যায় না। কোয়েলিয়া গান থামা এবার বললেও গান থামছে না। তাই চিঠির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। সারি সারি মুক্তো দিয়ে সাজানো জ্বলজ্বলে যৌবনের আবেগ।
‘তোমার চিঠি আমি আশা করিনি। তুমি জানো না, আমি জানি, তোমার মধ্যে চাপা একটা অহংকার আছে। অহংকার তোমাদের রক্তে। তোমার দোষ নেই। তোমার চেয়ে বয়েসে আমি অনেক ছোট, রাগ কোরো না, তোমাকে একটা কথা বলি, নিজেকে বেশিদিন ভোলা ফেলে রেখো না। আমার শ্রদ্ধেয় পিতাকে দেখে এই শিক্ষাই হল, মানুষ বড় জটিল প্রাণী। কখন কীভাবে কোন আবেগে কেঁপে উঠবে নিজেই জানে না। লক্ষ প্রলোভনের তরঙ্গ খেলছে। কখন কোন বাতাস পালে ধরবে কেউ জানে না। আদর্শের শৌখিন পেয়ালা খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙে পড়বে। তুমি কি জানো মেয়েরাও ভালবাসতে পারে। ছেলেরা ভালবাসার কিছুই জানে না। পেট্রলও জ্বলে, কয়লাও জ্বলে, পাটও জ্বলে। একটা দপ করে জ্বলেই নেবে। আর একটা ধীরে জ্বলে, নেবেও ধীরে। জ্বলতেই থাকে, জ্বলতেই থাকে, নিঃশেষে ছাই হয়। শেষবারের মতো আজ আমি তোমাকে একটা কথা নির্লজ্জের মতো বলে যাই, আমি তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে কাছে পেতে চাই। তোমার কল্পনাবিলাস, তোমার ছেলেমানুষি, তোমার পবিত্রতা, তোমার চাপা অহংকার, বেদনা, নিঃসঙ্গতা, সবকিছু আমি ভালবেসে পেতে চাই। কেন চাই, তা জানি না। তোমাকে ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারি না। এ আমার কী হল!’
মুকু রসিকতা করছে, না সত্যি কথা বলছে? মেয়েরা এমন প্রাণখুলে লিখতে পারে? কোনও মেয়ে আমার মতো ছেলেকে ভালবাসতে পারে? বিশ্বাস হয় না। কোনও মেয়ে কখনও আমাকে প্রেমপত্র লেখেনি। কো-এডুকেশন কলেজে মেয়েরা আমার পাশ দিয়ে চলে যেত, ফিরেও তাকাত না। সুন্দরী মেয়েদের বেশ অহংকার থাকে। মুকু তো সুন্দরীই। ভরাট গোল চাঁদের মতো মুখ। ছোট চুল-ঢাকা কপাল। উচ্চতায় আমার মাথায় মাথায়। মেয়েরা যাকে গড়ন বলে, সেই গড়নও বেশ সুন্দর। পাশ দিয়ে চলে গেলে ভোগী মানুষকে ফিরে তাকাতেই হবে। সে কেন আমার মতো এক শুকনো ঘেঁকুরে বাবাজিকে প্রেমপত্র লিখবে? পৃথিবীতে কি এখন প্রেমের জোয়ার বইছে, যে নালা নর্দমা সব ভেসে যাবে!
‘প্রথম প্রথম তোমাকে আমি আর পাঁচটা ছেলের মতোই ভাবতুম। একটু চালিয়াত, বড় বড় কথা বলে। একটু বেশি বকে। পরে আমার সে ধারণা একেবারে পালটে গেল। মনে হল, তোমার। ভেতরের শিশুটি আজীবন শিশুই থেকে যাবে। যত ঝড়ঝাঁপটাই আসুক তুমি সহজে ভেঙে পড়বে না। তোমার ঈশ্বর-বিশ্বাস লোকদেখানো নয়, অন্তরের জিনিস। জন্মসূত্রে পাওয়া। তোমার এ বিশ্বাস এসেছে মাতামহের দিক থেকে। জীবন সম্পর্কে আমার নিজের একটা পরিকল্পনা আছে। অনেক মানুষকে আমি ভয় পাই। যারা দেহের ভেতর মানুষের আত্মাটাকে দেখতে পায় না তারা জন্তু। তুমি। আমার পাশে এসে দাঁড়ালে আমরা দুজনে একটা কিছু করতে পারি। চলার পথে মনের মতো। একজন সঙ্গী পেলে পথ যত দুর্গম আর দীর্ঘ হোক না কেন, জানার আগেই ফুরিয়ে যায়। তুমি অবশ্যই আমার এ চিঠির উত্তর দেবে। ঈশ্বরকে যেমন জ্ঞানের পথে ত্যাগের পথে পাওয়া যায়, ভালবাসার পথেও পাওয়া যায়। তা যদি না হবে ঈশ্বর নারী সৃষ্টি করলেন কেন? তোমাকে আমার কিছুই দেবার নেই। তুমি আমার সব নিয়ে বসে আছ। ইতি, মুকু।’
মুকুর চিঠিতে অদ্ভুত এক মাদকতা রয়েছে। সারা শরীর কেমন যেন করে উঠেছে। ভালবাসা খুব। সহজেই মানসিক স্তর থেকে দেহের স্তরে নেমে যেতে চায়। সামান্য একটা চিঠিতেই আমার এই অবস্থা। মুকু কলকাতায় আসবে। শুধু আসবে না। কয়েক বছর থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তখন আমার কী হবে!
