স্বামী নির্মলানন্দ মহারাজ আমার দিকে আর তাকাচ্ছেন না। একটি পাণ্ডুলিপিতে মন দিয়েছেন। ধীরে ধীরে দুটোকেই শেষ করে ফেললুম। মহারাজ মুখ না তুলেই বললেন, বাইরে ছাদের ওপাশে কল আছে, যাও হাত ধুয়ে এসো।
হাত ধুয়ে এসে বসতেই মহারাজ পাণ্ডুলিপি থেকে মুখ তুলে বললেন, দেখি, হ্যাঁ, এবার তোমার মুখের চেহারা পালটে গেছে। বেশ একটা স্নিগ্ধ ভাব এসেছে। বুদ্ধদেবের ধম্মপদ পড়েছ?
আজ্ঞে মাঝেমধ্যে উলটে দেখি।
তুমি করেছ কী? সব পড়ে বসে আছ? ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
শঙ্করের বিবেকচূড়ামণি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাঃ জমিতে ভালই সার পড়েছে। এবার তা হলে ফুল ফুটবে!
ধীরে ধীরে আমার সাহস বাড়ছে। মহারাজের চোখের জ্যোতি লাইট হাউসের মতো ঝড়ের রাতের নাবিককে স্থলের সংকেত জানাচ্ছে। সাহস করে বলেই ফেললুম, স্বামীজি, বুদ্ধ কিন্তু বলেছেন, মূর্খ সারাজীবন জ্ঞানীর সঙ্গ করলেও জ্ঞানের পথের সন্ধান পায় না, যেমন চামচে কোনওদিন পায় না সুপের স্বাদ। বাংলা ঠিক হল কি না জানি না, ইংরেজি অনুবাদ আরও সুন্দর, If during the whole of his life a fool lives with a wise man, he never knows the path of wis dom as the spoon never knows the taste of the soup.
পলাশ, তুমি তো মূর্খ নও। তোমার জন্যে বুদ্ধের সেই উপদেশ, যে-মানুষ জাগ্রত সে যদি জ্ঞানী মানুষের সঙ্গে মুহূর্তকাল কাটায় সে কিছুদিনের মধ্যেই জ্ঞানের পথ চিনতে পারে, যেমন জিভ চুমুকের সঙ্গে সঙ্গেই সুপের স্বাদ পায়। বুদ্ধের ওই উপদেশটিও মনে রেখো, অনাবৃত শরীর, জটাধারণ, পরিচ্ছন্নতায় উদাসীনতা, উপবাস, ভূমিশয্যা, ভস্মলেপন, আসন, কিছুতেই কিছু হবার নয়। বিশুদ্ধ হবার একমাত্র পথ সংশয় আর কামনা থেকে মুক্তি। এইবার তোমার বিবেকচূড়ামণি কী বলছেন–
অর্থস্য নিশ্চয়ো দুষ্টো বিচারেণ হিতোক্তিতঃ।
ন স্নানেন ন দানেন প্রাণায়ামশতেন বা ॥
বিচার, সৎ আর অসতের পার্থক্য বুঝে অসৎকে ত্যাগ করতে হবে। সাহায্য করবেন কে? গুরু। স্থান দান, শত শত প্রাণায়াম, যাই করো না কেন, বিচার আর গুরুর উপদেশ ছাড়া পথ খুলবে না।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আকাশে তালচটকা পাখির ঝক দিন-শেষের ওড়া উড়ছে। মহারাজ বললেন, আর না, একটু পরেই আরতি শুরু হবে, আমাকে প্রেয়ারে বসতে হবে। তোমার বাড়ির খবর বলল, কে কে আছেন?
থাকার মধ্যে আছেন আমার বাবা, আর আমার দাদু। এ ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
মহারাজ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর আমার নিতান্ত আপনজনের মতো মৃদু হেসে বললেন, ভাগ্যবান, ভাগ্যবান। এই সুযোগ কাজে লাগাও। তোমার পথ ঈশ্বরই পরিষ্কার করে রেখেছেন। মায়ের স্নেহ যখন পাওনি, তখন অন্য আর কারুর স্নেহ-ভালবাসার আশা কোরো না। বিবাহ করার ইচ্ছে আছে নাকি?
একেবারেই না।
চাপাবার চেষ্টা চলছে?
অল্পস্বল্প।
কেটে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করো, রেশমকীট যেমন গুটি কেটে বেরিয়ে যায়–
কোথা হতে আসিয়াছি, নাহি পড়ে মনে
অগণ্য যাত্রীর সাথে তীর্থদরশনে
এই বসুন্ধরাতলে! লাগিয়াছে তরী
নীলাকাশসমুদ্রের ঘাটের উপরি।
কার লেখা?
রবীন্দ্রনাথ। নৈবেদ্য।
পরের স্তবক?
ভাগ্য ভাল, মনে ছিল। কাল রাতেই মাতামহকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছি। অশ্রুধারায় সিক্ত হয়ে শুনেছেন,
শুনা যায় চারিদিকে দিবসরজনী
বাজিতেছে বিরাট সংসার শঙ্খধ্বনি।
লক্ষ লক্ষ জীবনফুকারে। এত বেলা
যাত্রী নরনারী সাথে করিয়াছি মেলা
পুরীপ্রান্তে পান্থশালা’-পরে। স্নানে পানে
অপরাহ হয়ে এল গল্পে হাসি গানে।
মহারাজ শেষ স্তবকটি আবৃত্তি করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন,
এখন মন্দিরে তব এসেছি হে নাথ
নির্জনে চরণতলে করি প্রণিপাত
এ জন্মের পূজা সমাপিব। তারপর
নবতীর্থে যেতে হবে হে বসুধৈশ্বর।
টেবিলের ডান দিকের ট্রে থেকে আমার লেখাটি তুলে নিলেন। শোনো, সবই ঠিক আছে, একটা কাজ কেবল বাকি, অনেক উদ্ধৃতি আছে, সব ক’টার ফুটনোট দিতে হবে। প্রথমে নম্বর দেবে, এক, দুই, তিন, চার, তারপর তলায় তলায় উল্লেখ করবে সোর্স। পারবে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। যত তাড়াতাড়ি পারো দিয়ে যেয়ো। মনোনীত করে রেখেছি। পারলে সামনের মাসেই ছেপে দোব। হ্যাঁ, তোমাকে একটা বইও দিচ্ছি, রোজ নিয়ম করে দু’চার পাতা পড়বে।
বই আর পাণ্ডুলিপি দুটোই আমার হাতে এসে গেল। বইটির নাম স্বামী-শিষ্য সংবাদ। প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই মহারাজ বললেন, এত বড় বড় চুল রেখেছ কেন?
ভীষণ অপ্রস্তুতে পড়ে গেলুম। শরীরে একমাত্র এই চুলই দর্শনীয়। আর তো দেখাবার মতো কিছু নেই। না বুকের ছাতি, না হাতের গুলো। মিউ মিউ করে বললুম, বড় হয়ে গেছে, এইবার কাটব।
হ্যাঁ কেটে ফেলল। দুর্বলতার সেবা কোরো না। পুরুষ হও, তবেই না পৌরুষ আসবে।
স্বামীজি হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলেন। ধীর পায়ে আমার সঙ্গে ঘরের দরজা পর্যন্ত এলেন। চৌকাঠ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ভেজিয়ে দিলেন। দোতলার ঠাকুরঘর আলোয় আলোকময়। মেঝেতে ঢালাও কার্পেট। ধূপের গন্ধ। একটি হারমোনিয়ম। সারদামায়ের পুজো শুরু হয়েছে। সেই তরুণী এখনও একইভাবে স্থির। আরও অনেক ভক্ত এসেছেন। নীচের অফিসঘর বন্ধ। নির্জন একটি বেঞ্চের তলায় অসংখ্য জুতো। একটি শিশু একা বসে।
১.৬১ One life, one death, one heaven
‘দিদি আত্মহত্যা করেছে বলে মনে হয় না। দিদিকে তোমার চেয়ে আমি ভাল চিনি। দিদি ভয়ংকর একরোখা মেয়ে, তেমনি সাহসী। অভদ্র নয়, বাঁচাল নয় কিন্তু অন্যায় দেখলেই রুখে দাঁড়ায়। শ্রদ্ধেয় গুরুজনকে শ্রদ্ধা করে, গুরুজন শুধু বয়সে কি সম্পর্কের দাবিতে দিদির কাছ থেকে শ্রদ্ধা আদায় করতে পারবে না। বাবা ইদানীং যা যা করেছেন তোমাকে আমি জানিয়ে এসেছি। আমার যা সন্দেহ দিদি যদি তাই করে থাকে আমি বলব ভালই করেছে।’
