স্বামীজি বললেন, ভেবেছিলুম ষাট বছরের কোনও বৃদ্ধকে দেখব। তুমি তো যুবক হে! চলো ওপরে আমার ঘরে চলো।
স্বামী নির্মলানন্দ সিঁড়ি বেয়ে আগে আগে উঠছেন, আমি পেছনে পেছনে। উঠতে উঠতে ভাবছি, আমার এই আরোহণ যেন অবরোহণ না হয়। ক্রমশই উঠে যাব, ওপরে আরও ওপরে। দোতলায় ঠাকুরঘর। বেদির ওপর সারদামায়ের ছবি। মাৰ্বল পাথরের সাদা মেঝে। স্বামীজি বললেন, যাও আগে প্রণাম করে এসো।
মায়ের দিকে তাকিয়ে একপাশে একজন অল্পবয়সি মহিলা বসে আছেন। দৃষ্টি স্থির। দু’গাল বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। মহিলার দিকে তাকিয়ে বুকটা হুঁত করে উঠল। কনক নাকি! অনেকটা, সেইরকম দেখতে!
মহিলার দিক থেকে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে মাটিতে মাথা ঠেকালুম। মনে মনে বললুম, মা, ক্ষমা করো। পুরো মনটা তোমাকে দিতে পারলুম না। সামান্য একটু টলে গেছে। চোখ বুজিয়ে মাকে দেখার চেষ্টাও সফল হল। তরুণীর অশ্রুসজল দুটি চোখ, বেদনা-মাখা মুখচ্ছবি বারেবারে, ফিরে ফিরে এল। এ কি কোনও কিছু হারানোর বেদনা, না না-পাওয়ার বেদনা!
দশ হাত পেছনে স্বামী নির্মলানন্দ আমার জন্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আরও ওপরে উঠতে হবে। বাঁ পাশে আর একটি সিঁড়ি তিন তলায় উঠে গেছে। তিন তলায় একটি মাত্র ঘর, সেই ঘরটিই স্বামী নির্মলানন্দের। একটি টেবিল, একটি চেয়ার, অসংখ্য বই। ঘরে শোওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। সন্ন্যাসীর ভূমিশয্যাই শাস্ত্রের বিধান।
একটা মোড়া দেখিয়ে স্বামীজি বললেন, বোসো।
আদেশ পালন করলুম। স্বামীজি চেয়ারে বসে আমাকে দেখতে লাগলেন। তার সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টির সামনে বসে বড় অস্বস্তি শুরু হল। শোকেসে দাঁড় করানো ম্যানিকুইন হঠাৎ প্রাণ পেয়ে গেলে কাঁচের ওধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে দেখলে আমার মতোই মনের অবস্থা হত। ছুটে পালাবারও উপায় নেই। নিজেকে মনে হচ্ছে স্বচ্ছ মানুষ। ধরা না পড়ে যাই। লোভ, লালসা, কুচোকুচো কামনা, বাসনা, অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছের মতো কিলবিল করছে।
মহারাজ বললেন, দেখি, আমার হাতে তোমার ডান হাত রাখো।
নিক্তিতে ওজন করার মতো করে তিনি আমার হাতের ওজন নিলেন। জানি, এ এক আধ্যাত্মিক পরীক্ষা। ঠাকুর স্বামী বিবেকানন্দকে করেছিলেন। হালকা হাতের মালিকের মনও হালকা। হৃদয় অগভীর, সংকীর্ণ। পরীক্ষায় পাশ না ফেল? প্রশ্নও করতে পারছি না।
স্বামীজি বললেন, যাও বোসো।
মোড়ায় বসে পড়লুম। স্মিত হেসে স্বামীজি প্রশ্ন করলেন, কী করো?
আজ্ঞে চাকরি। কেমিস্ট।
বিজ্ঞানের ছাত্র? খুব ভাল। এরকম একটা দার্শনিক প্রবন্ধ লিখলে কী করে? ডেকার্ট পড়েছ? কান্ট, হিউম, হেগেল, স্পিনোজা, হবস্?
কিছু কিছু।
প্রবন্ধটা ভালই লিখেছ! একটা কাজ কেবল বাকি, আর একটু খাটতে হবে।
বলুন, প্রস্তুত আছি।
এই তো চাই। সবসময় নিজেকে তৈরি রাখবে সৈনিকের মতো। মনে মনে সবসময় বলবে, আমাকে যেতে হবে, আমাকে যেতে হবে। আমি থাকার জন্যে আসিনি, আমি যাবার জন্যে এসেছি।
আপনি মৃত্যুর কথা বলছেন?
মৃত্যু? মৃত্যু তো দুর্বলের কথা, ভীরুর কথা। মৃত্যু বলে কিছু নেই। ট্র্যানজিশন। রূপান্তর। তুমি তো গীতা পড়েছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, রোজই এক অধ্যায় করে পড়ার চেষ্টা করি।
তা হলে সেই শ্লোকটি মনে করার চেষ্টা করো,
অবক্তাদ্ব্যক্তয়ঃ সৰ্ব্বাঃ প্রভব্যহরাগমে।
রাত্রাগমে প্রলীয়ন্তে তত্রৈবাব্যক্তসংজ্ঞকে ॥
ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্ব প্রলীয়তে।
রাত্রাগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে ॥
অব্যক্ত হইতে সব দিনে ব্যক্ত হয়/রাত্রিতে আবার হয় অব্যক্তেই লয়/ এইরূপ ভূতগণ যায় আর আসে/ রাত্রিতে বিলীন হয়, দিবায় প্রকাশে। মৃত্যুর এর চেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা তুমি আর কোথায় পাবে? মৃত্যু নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবে না। ও হল এক ধরনের চিন্তাবিলাস। দুটো কথা মনে রেখো, ডেথ-ইন- লাইফ, আর লাইফ ফিল্ড উইথ লিভিং। জীবনকে বেঁচে থাকায় ভরপুর করে তোলে। কাজে কাজে বেলা বেড়ে গেলে হঠাৎ ঘড়ি দেখে আমরা লাফিয়ে উঠি, আরে এরই মধ্যে বারোটা বেজে গেল! জলের বিম্ব একদিন জলেই মিলিয়ে যাবে। কী? খুব খিদে পেয়েছে?
আজ্ঞে না।
তোমার মুখ বলছে। দাঁড়াও একটা সন্দেশ খাও। শরীর আদ্যং খলু ধর্ম সাধনং।
মহারাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। ঘরের ও প্রান্তে একটি কাঠের আলমারি। চারচৌকো সুদৃশ্য একটা টিনের কৌটো নিয়ে তিনি ফিরে এলেন আসনে।
কী সন্দেশ খাবে বলো? কড়াপাক? না নরমপাক?
আপনি যা দেবেন।
তোমার নিজের কোনও ইচ্ছে নেই?
আজ্ঞে না।
তুমি কি সব ব্যাপারেই নিজেকে এইভাবে সমর্পণ করে দিতে পারো?
নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর, তাঁর ব্যক্তিত্বের ওপর। সকলের হাতে নিজেকে ছাড়তে পারি না।
গুরুকরণের ওপর তোমার বিশ্বাস আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব আছে।
কথামৃত পড়েছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ। রোজই পড়ি।
আর কী পড়ো?
শ্রীশ্রীকুলদানন্দ ব্রহ্মচারীজির শ্রীশ্রীসদগুরুসঙ্গ।
উপনিষদ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা হলে তুমি নরমপাক খাও। নাও হাত পাততা। সন্ন্যাসী মানুষ কোথায় পাব তোমার জন্যে প্লেট?
মহারাজ আমার হাতে বড় বড় দুটো সন্দেশ দিলেন। আকার আকৃতি দেখে খাবার আগেই প্রাণ ভরে গেল। ওপরে কুচো কুচো পেস্তা ছড়ানো। মহাপুরুষের সামনে হাউহাউ করে খেতেও লজ্জা করছে। খাদ্যগ্রহণকারী মানুষের চোখমুখের চেহারা পালটে যায়। লোভের ছায়া নামে। একটু একটু করে ভেঙে ভেঙে মুখে পুরছি। অতি সুস্বাদু। এমন জিনিস কোথায় পাওয়া যায়? দোকানের নাম জানা থাকলে পিতা আর মাতামহের জন্যে নিয়ে যেতুম।
