আশ্রমের দরজার সামনে কালো রঙের একটা মোটর পঁড়িয়ে। বাড়িটার ওপরদিকে পশ্চিমের রোদ লেগেছে। বড় হবার এই মজা। অনেকক্ষণ আলোয় থাকা যায়। অফিসঘরে সুন্দর চেহারার এক সন্ন্যাসী বসে আছেন। স্বাস্থ্য দেখলে তাক লেগে যায়। মুখে অপূর্ব এক জ্যোতি। অন্তরে সবসময় যেন। হাসছেন। সেই হাসির ঝিলিক লেগে আছে চোখে। সন্ন্যাসীর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল, গান-ফুরোনো জলসাঘর। গান থামলেও ঝংকার ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। এঁর সামনে আমার এই ভিটামিনের কার্টুন যেন এক উপহাস!
সন্ন্যাসী চোখ তুলে তাকালেন। সামনে পড়ে আছে হিসেবের জাবদা খাতা। প্রশ্ন করলেন না, তবু প্রশ্ন রয়েছে। ভাবের ভাণ্ডারীর ভাষায় প্রয়োজন খুব কম। আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললুম, মহারাজ, স্বামী নির্মলানন্দের সঙ্গে দেখা করব। এই যে তার চিঠি, আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন।
একনজরে চিঠিটা পড়ে ফেলে মহারাজ বললেন, আপনি বসুন।
কালো রঙের পালিশ করা চার-পাঁচখানা চেয়ার। একটায় ধীরে ধীরে সংযত হয়ে বসে পড়লুম। ভেতরে বেশ এক ধরনের গাম্ভীর্য আসছে। শান্তি নামছে। তেমন আর ভয় করছে না। চতুর্দিকে রাশি রাশি বই। স্বামীজির ওপর, রামকৃষ্ণের ওপর। ধর্ম আছে, দর্শন আছে। সম্পূর্ণ অন্য এক জগৎ। দেয়ালে ঝুলছে স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন ভঙ্গিমার ছবি। সমাধিস্থ রামকৃষ্ণ, ধ্যানস্থ রামকৃষ্ণ। আমার একেবারে চোখের সামনে থাউজান্ড আইল্যান্ড পার্কে ভোলা স্বামীজির সেই ছবিটি। বড় বড় চুল। মুখে স্মিত হাসি। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। তেজের সঙ্গে প্রেম মিশে অদ্ভুত এক মুখচ্ছবি। জলে যেন আগুন লেগেছে। সারাঘরে ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। মহারাজের শরীরেও সুন্দর একটা গন্ধ। সারাশরীরে যেন হোমের গন্ধ। গোস্বামীজি কুলদানন্দ ব্রহ্মচারীজিকে বলেছিলেন, গায়ে হোমের ধোঁয়া মাখবে, শরীর পবিত্র হবে। মন ঘুরে যাবে। নির্দেশ পালন করে মাসখানেকের মধ্যে ব্রহ্মচারীজির তাই হয়েছিল। আমার কী হল? মন বলছে, আজ যেখানে এসেছ তোমাকে তোমার। ভবিতব্য সেখানে টেনে এনেছে। জীবনের গতি এবার ঘুরে যাবে। গোলকধাঁধা থেকে বেরোবার পথ। পেয়ে যাবে। আজকের দিনটা খেয়াল করে রাখিস।
মহারাজ ইন্টারন্যাল ফোনে স্বামী নির্মলানন্দের সঙ্গে কথা বলে রিসিভার নামাতে নামাতে বললেন, বসুন, আসছেন।
চিঠিটা ফেরত দিতে দিতে একনজরে আমাকে আর একবার দেখে নিলেন। মনে হচ্ছে কত কালের চেনা। মানুষ যেমন নিজের হাতের কি পায়ের দিকে ভাল করে তাকায় না, কোনওদিন ভাল করে তাকালে অবাক হয়ে ভাবতে থাকে, এই আমার হাত, হাতের আঙুল! কী আশ্চর্য! আমারও সেইরকম মনে হতে লাগল, এ সবই আমার চেনা, ভীষণ চেনা। কোনওদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিলুম, আজ আবার ফিরে এসেছি। তাই হইহই অভ্যর্থনা নেই। ঘরের লোক ঘরে ফিরে এসেছে। এই কিছুদিন আগে চিৎপুরে বড় মসজিদের সামনে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, আমার ভীষণ চেনা জায়গা। খুব অস্বস্তি হয়েছিল। চুলকোচ্ছে অথচ শত চেষ্টাতেও ঠিক জায়গাটা খুঁজে পাচ্ছি না।
ডান পাশে ঘাড় ঘোরালেই আমি একটা সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছি। ধাপে ধাপে উঠে গেছে ওপরে। মহারাজ হাসিহাসি মুখে আবার কাজে মন দিয়েছেন। স্বামীজি সামনের ছবি থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কী যেন বলতে চাইছেন! হয়তো বুঝেছি! বলছেন, উত্তিষ্ঠিত, জাগ্রত, প্রাপ্যবরান নিবোধত। মাঝে মাঝে সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছি। স্বামী নির্মলানন্দ ওই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসবেন। আর তখনই আমার জীবনের গতি পালটে যাবে। গলিঘুজির পথিক হঠাৎ বেরিয়ে পড়ব দিগন্ত ঘেরা মহাপ্রান্তরে। বিশাল এক ঈগল ইঁদুরের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে একেবারে পাহাড় চুড়ায়।
তরতর করে নেমে আসছেন স্বামী নির্মলানন্দ। জলের ছন্দে নেমে-আসা দুটি পা, গৈরিক বসনের নেচে-ওঠা প্রান্ত দেখতে পাচ্ছি। সাধকের শরীর যোগ-প্রভাবে এইরকমই লঘু গতিময় হয়। আমি পড়েছি। নামার এই ধরনও একপ্রকার প্রাণায়াম। ব্রহ্মচারীজির ডায়েরিতেই আছে। সাধকদের ক্ষিপ্ত হাত-পা ছোঁড়া অকারণ নয়। গুহ্যকারণে ভরা।
সিঁড়ির শেষ ধাপ লাফিয়ে নেমে স্বামীজি ঝড়ের গতিতে অফিসঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, কোথায় সেই ভদ্রলোক?
যে-ঘরে আমি একাই বসে আছি, সেখানে ভদ্রলোক কোথায় জিজ্ঞেস করার মানেটা কী? তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলুম, আজ্ঞে, আমি।
স্বামী নির্মলানন্দের ক্ষুরধার চেহারা। শরীরে মেদ নেই। মাঝারি উচ্চতার মানুষ। গায়ে ঢোলা হাতা পাঞ্জাবি, গেরুয়া রঙে ছোপানো। তার ওপর একটি উত্তরীয়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। চোখে গোল্ড ফ্রেমের চশমা। উজ্জ্বল দুটি অনুসন্ধানী চোখ আমার দিকে স্থির হয়ে আছে।
মহারাজ হঠাৎ হোহো করে হেসে উঠলেন। বলশালী ভোগী মানুষের লোলুপ হাসি নয়। সাধকের স্ফটিক-স্বচ্ছ, জল কল্লোলের হাসি। যেমন হঠাৎ শুরু, তেমনই হঠাৎ থেমে যাওয়া। ঠোঁটে শেষ সূর্যের আভার মতো সামান্য একটু লেগে রইল।
তুমি পলাশ চট্টোপাধ্যায়?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
দু’হাতে আমার দুটো কাধ ধরে শরীরটাকে কঁকিয়ে দিলেন। পড়েছিলুম শার্লক হোমস কৃশকায় ছিলেন। কিন্তু শরীরে অসাধারণ শক্তি ছিল। স্বামী নির্মলানন্দের ঝকানিতে সবকিছু যেন ঝরে পড়ে গেল। বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সংস্কার, মলিনতা, নীচ চিন্তা। সব ঝরঝর করে ঝরে পড়ে গেল। পায়ের নীচে। যেন সহস্র ধারার উষ্ণ জলে স্নান করে উঠলুম। ধ্বংসস্তূপে জেগে উঠল স্বর্গীয় পাখি, ফিনিক।
