আচ্ছা, তুমি তা হলে এবার একটা ট্যাক্সি ডেকে আনো। আমি রেডি।
ট্যাক্সিতে উঠে ঘড়ি দেখলুম, বেলা দুটো বেজে পনেরো মিনিট। আজ আর মাতামহের আহার জুটল না।
সব দিক কি সামলানো যায়! পেছনের আসনে দু’জনে পাশাপাশি বসে আছেন। আমি সামনের আসনে। আমাদের জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, বাইরের জগতে কোথাও কোনও পরিবর্তন নেই। পৃথিবীর সাংঘাতিক হজমশক্তি। মাতামহের জন্যে ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে। মাঝে মাঝে চিন্তাও হচ্ছে, পিতৃদেব এই সমস্যার কী সমাধান করবেন।
বাড়ি ফিরে একটি অসহায় ছবি দেখা গেল। বাহাদুর রকে বসে আছে গালে হাত দিয়ে। খিদেতে মুখ শুকিয়ে গেছে। মাতামহ মা-হারা শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়েছেন। পাশবালিশটা খাট থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে।
ঘরে পা দিয়েই পিতৃদেব বললেন, তোমাদের কারুরই নিশ্চয়ই খাওয়া হয়নি। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। আমার নার্ভ ভীষণ শক্ত, তোমার নার্ভ বউঠান আরও শক্ত। টেম্পার্ড স্টিল। এতটুকু জানতে দিলে না!
পিতার গলা পেয়ে মাতামহ ধড়মড় করে উঠে বসলেন। মুখের অবস্থা দেখে মনে হল, যেন স্বপ্ন দেখছেন! ভাবাবেগে মুখে কথা আটকে যাচ্ছে, তুমি এলে হরিশঙ্কর! তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে আবার বিছানাতেই বসে পড়লেন। শিশু যেমন অনেকদিন পরে প্রবাসী পিতাকে দেখে আনন্দ পায়, বৃদ্ধের চোখমুখে সেইরকম আনন্দ খেলছে। পিতৃদেব এগিয়ে গিয়ে হেঁট হয়ে পায়ের ধুলো নিলেন।
মাতামহ বললেন, শুনেছ নিশ্চয়, আর একজন চলে গেল! বুঝলে, এরা সব মজা পেয়ে গেছে, শাসনের বাইরে চলে গেছে। আসছে যাচ্ছে। সবই যেন নিজেদের খেয়ালখুশি! পৃথিবী একটা কুৎসিত জায়গা। তুমি আছ বলেই থাকতে ইচ্ছে করে, তা না হলে কবে পগারপার হয়ে যেতুম। বড় ভয় হয় হরিশঙ্কর! যেই যাব আবার সঙ্গে সঙ্গে পোটলা বেঁধে ফেরত পাঠিয়ে দেবে।
আপনি কিছুই জানেন না, এটা আপনার শেষ জন্ম। আর আপনাকে আসতে হবে না।
ধুত, তোমার হিসেবে ভুল হচ্ছে। আমাকে এখনও বার তিনেক আসতে হবে। আবার সেই নব ধারাপাত, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, স্কুল, নিলডাউন, বেত্রাঘাত। আবার সেই টোপর মাথায় পিড়েতে বসা, আবার সেই এক এক করে চলে যাওয়া। পরের বার তোমাকে যেন একটু আগেভাগে পাই বাপু! এবার তুমি বড় দেরি করে ফেলেছ। সামনের বার আমি গৌরীদান করব। তখন তুমি যেন আবার না না করে বেঁকে বোসো না। আর আমিও মেয়েটাকে প্রথম থেকেই খুব যত্ন করব। স্বাস্থ্যই সম্পদ। অসুখ করলে হাতুড়ে আর ডাকব না। প্রথম থেকেই ভাল ডাক্তার। পয়সা একটু বেশি লাগে লাগুক, একেবারে বিধান রায়। ওই হেরম্ব কবিরাজ আর নয়। হ্যাঁগো, তোমার এটা শেষ জন্ম নয় তো! আমার কিন্তু কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে?
আমাকে এখনও লাখখাবার জন্মাতে হবে। কয়লা ধুয়ে ধুয়ে হিরে। আপনার এখনও খাওয়াদাওয়া হয়নি, এই অবেলায় না খাওয়াই ভাল।
মাতামহ অবাক হয়ে বললেন, কেন, আমার আজ খাওয়া হয়নি? কে বললে খাইনি?
কাকিমা ধরাধরা গলায় বললেন, না, খাওয়া হয়নি। আমাদের আসতে দেরি হয়ে গেল।
মাতামহ প্রতিবাদের গলায় বললেন, কে বললে আমার খাওয়া হয়নি। তোমরা বড় তাড়াতাড়ি ভুলে যাও।
পিতৃদেব উৎকণ্ঠিত মুখে মাতামহের দিকে তাকালেন। বুঝতে পেরেছি কীসের আশঙ্কায় তাকাচ্ছেন। মাতামহের স্মৃতি নষ্ট হয়ে আসছে নাকি? যাকে বলে ভীমরতি। মাতামহও বুঝতে পেরেছেন। একগাল হেসে বললেন, একদিন খাওয়া হয়নি তো কী হয়েছে? সারাজীবন তো খেয়েই আসছি। কতজনকে খেলুম বলো তো?
এইসব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলার সময় এ নয়। তবু বলছেন। এলোমেলো কথা বলে সময় নিচ্ছেন। এমন এক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, যার সমাধান খুব সহজ নয়। কাকিমা দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতেই বসে পড়েছেন। কতক্ষণ আর দাঁড়াবেন! স্বামী অপঘাতে মারা যাবার পর কী কী করার আছে, শাস্ত্রের কী বিধান আছে, এঁরা মনে হয় সঠিক জানেন না। এখুনি আমাকে ছুটতে হবে কুলপুরোহিতের কাছে। অশৌচ হবে কি না, শ্রাদ্ধশান্তির প্রয়োজন হবে কি না, জেনে আসতে হবে। হলে কোথায় হবে? কে করবে? বংশধর তো কেউ নেই।
মাতামহ বললেন, তুমি কি খুব পুড়ে গেছ হরিশঙ্কর? ৪৫০
আজ্ঞে হ্যাঁ, তা বেশ ভালই পুড়েছি। শরীরটা মনে হয় দাগরাজি হয়ে গেল। ভেবেছিলুম অক্ষত শরীরে চিতায় শোব, সে আর হল না।
অত ভেবো না হরিশঙ্কর। ক্ষত আর অক্ষত, আগুনের কাছে সবই সমান।
না, সে অনেক পরের কথা। আসুন এখনকার কথা ভাবা যাক। এই মহিলাটির কী হবে?
বউমার? কী হবে বলো তো? বেচারা এত বড় এই পৃথিবীতে একেবারে একা হয়ে গেল। পাশে তো কাউকে দাঁড়াতে হয়।
কে দাঁড়াবে?
কেন, আমরা সবাই মিলে দাঁড়াব। আমরা সব বউ-মারার দল। এইবার আমরা প্রায়শ্চিত্ত করব।
সমাজ?
জুতো পেটা। তুমি জানো, যৌবনে আমার মেজাজ আর শক্তি দুটোই ছিল। মুখের চেয়ে হাত দুটোই চলত বেশি। সমাজের কাছ থেকে আমরা কী পেয়েছি হরিশঙ্কর! উৎসবে, পালপার্বণে, অনেক তো পাতা পেড়ে খাওয়ানো হয়েছে, সেজেগুঁজে গিয়ে অনেক উপহার দিয়ে আসা হয়েছে, লাভ কী হয়েছে? এই তো তুমি হাসপাতালে পড়ে ছিলে, ক’জন পাড়ার লোক তোমাকে দেখতে গিয়েছিল?
তা না যাক, সমাজের কিছু নিয়ম তো মেনে চলতেই হবে! বুঝতে পারছেন কী বোঝাতে চাইছি? খুব পারছি। বদনাম একবার রটে গেলেই হল। তা সে পথ তো আমি মেরে রেখেছি। মাথার ওপর বসে আছি এক পাকা বুড়ো। আমি থাকতে থাকতেই নাতিটার বিয়ে দিয়ে দাও। অনেক মৃত্যু। দেখলুম হরিশঙ্কর, এইবার একটা ভাল কিছু দেখি। মৃত্যু কী মূর্খ! ব্যাটা বেহেড, গবেট। জানে না। বারেবারে এলে মৃত্যুর ধার কমে যায়। যারা যাত্রার পালা লেখে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করলে নিজেরই উপকার হত। মাঝে মাঝে একটু নাচ-গান, বিবাহ-জন্ম, হাসি-তামাশা না ঢোকালে দুঃখের জোর বাড়ে না। এলিয়ে যায়। বিয়েটা লাগিয়ে দাও হরিশঙ্কর। সানাই বাজুক। অনেক দিন লুচি, ছোলার ডাল, কুমড়োর ছক্কা খাইনি। শাঁখের শব্দ, উলুধ্বনি। কোমর বেঁধে লেগে পড়ো। দরজায় দরজায় আলপনা। সিল্কের ঝালর, ছাদে ম্যারাপ। রজনীগন্ধার গন্ধ। আহা নাকে যেন এখনও লেগে আছে। রজনীগন্ধার গন্ধ নাকে এলে তোমার মন কেমন করে না হরিশঙ্কর! আমার যে কত কথাই মনে পড়ে!
