পিতৃদেব বললেন, ওসব কথা এখন থাক। আমার মনে হয় মামাশ্বশুরের কাছে থাকাটাই সেফ হবে।
কাকিমা সারাশরীরে একটা ঝাঁকুনি তুলে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, না না। এর চেয়ে আমার আত্মহত্যা করাই ভাল।
পিতৃদেব বোঝাতে চাইলেন, কেন বউঠান, তিনি তোমার আত্মীয়, আমরা তোমার পাশে থাকব।
উত্তরে আঁচলে মুখ ঢেকে কাকিমা ছেলেমানুষের মতো মাথা ঝাঁকালেন।
দুই অভিভাবক পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো বসে রইলেন। কঠিন সমস্যা। জোর করে একজন অসহায় মহিলাকে তো আর দূর করে দেওয়া যায় না। ভগবানের তাজ্জব খেলা। খোঁড়ার পা-ই গর্তে পড়ে! যাঁর কেউ কোথাও নেই তাঁর স্বামীটিকে কেড়ে নিলেন!
কাকিমা হঠাৎ বললেন, আপনারা কোনও বাড়িতে আমাকে একটা রাঁধুনিগিরি জুটিয়ে দিন। কোনওরকমে আমার দিন চলে যাবে।
মাতামহ বললেন, তোমার এখন মাথার ঠিক নেই। যা-তা আবোলতাবোল বোকো না। হরিশঙ্কর রাগী মানুষ। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তোমার কথা শুনে রেগে গেছে।
পিতা বললেন, না, আজ আর রাগারাগি নয়। আজ আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। আজ। আর কোনও আলোচনাও নয়। তবে মামাশ্বশুরকে খবরটা দিতে হবে। খবর তো দিতে হবে বউঠান!
কাকিমা নিরুত্তর।
খবর না দিলে খারাপ দেখাবে। আমাদের দোষারোপ করবেন।
কাকিমা নিরুত্তর।
মাতামহ বললেন, তুমি এখন আর ওকে খোঁচাখুঁচি কোরো না। এমন একটা কিছু করো যাতে বেচারা শান্তি পায়। কী করলে মানুষ শান্তি পায় বলো তো?
শান্তি! সংসারী মানুষ পায় না। শান্তি পেতে হলে সন্ন্যাসী হতে হবে। সংসারে শান্তি নেই। সাময়িক যুদ্ধবিরতি আছে। ভুলে থাকা যায়, শান্তি পাওয়া যায় না।
কীভাবে তা হলে ভোলানো যায়?
সময়। সময়ের স্রোত পলি ফেলতে ফেলতে দুঃখ সুখ সবই চাপা দিয়ে দেবে। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মতো, কোনওদিন খুঁড়তে খুঁড়তে এক-একটা স্মৃতি বেরিয়ে আসবে। দুঃখের স্মৃতি, সুখের স্মৃতি।
তা যা বলেছ! কত কী-ই তো আমাদের জীবনে ঘটে গেল, সব কি আর মনে আছে! টেনে বের করলে তবেই বেরোয়। এসরাজ বাজাতে বাজাতে তোমার ওই আঙুলের কড়ার মতো, জীবন যত। দিন যায় তত দরকচা মেরে যায়।
পিতৃদেব ঘড়ির দিকে তাকাতে-না-তাকাতেই চারটে বাজতে শুরু করল। শেষ ঘণ্টাটি বেজে যাবার পর বললেন, এইবার একটু চায়ের জোগাড় করা যাক। আপনিও হালকা কিছু একটা খান।
তুমি চায়ের কী জোগাড় দেখবে? সে তো আমাদের হাতে।
কাকিমা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, আমি চা করে আনছি। বাবাকেও খেতে দিচ্ছি।
মাতামহ বললেন, আজ আর তোমার কিছু করে দরকার নেই।
পিতা বললেন, সেটা ঠিক হবে না। নিজেকে যত কাজে ব্যস্ত রাখবে ততই ভাল। আমি তো তাই করেছিলুম। ওর মা মারা যাবার পর আমি সারাদিনরাত নিজেকে গাধার মতো খাটাতুম। রাতেও ছাড়তুম না। সারারাত বসে বসে অঙ্ক কষতুম। একটা টেলিস্কোপ কিনেছিলুম। সারারাত
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতুম। সেই সময় আমার কত কী যে দর্শন হয়েছিল।
কী দেখেছিলে হরিশঙ্কর? গ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধূমকেতু!
সেসব তো ছিলই। প্রকৃতির জিনিস। অতিপ্রাকৃত কত কী যে দেখেছি! একদিন দেখলুম একটা মালা ভেসে চলেছে। দুধের মতো সাদা আলোর ফুলে গাঁথা গোড়ের মালা। দুলে দুলে ভেসে চলছে।
অ্যাঁ, বলো কী? তুমি তো তা হলে সিদ্ধপুরুষ হরিশঙ্কর। আমি শুনেছি। কখনও দেখিনি। ওই মালা কোথায় যায় জানো? কাশীর অন্নপূর্ণার মন্দিরে। তোমার হয়ে গেছে। তুমি পেয়ে গেছ।
আর একদিন কী দেখলুম জানেন? একটা সোনার খাট ভেসে চলেছে। ধীরে ধীরে পালতোলা নৌকোর মতো।
মাতামহ আর কথা বলতে পারলেন না। চোখে জল এসে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে। হঠাৎ যেন ভেঙে পড়লেন, যা ভেবেছি তাই হরিশঙ্কর। এই তোমার শেষ জন্ম। ওই পালঙ্ক তোমার! দেখা দিয়ে চলে গেল। আমি একা পড়ে গেলুম। তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে সেই তিনশো বছর পরে। তিনবার আসব। তিনবারের মেয়াদ শেষ করে তারপর ফিরে যাব। মাতামহ স্তব্ধ। ঘর স্তব্ধ। উত্তরের রান্নাঘরে প্রাইমাস স্টোভ হুহু করছে।
১.৬০ There is no path in the sky
তুমি তা হলে কী করবে পলাশ?
আজ্ঞে, বাবা সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে আমি দেরাদুন যাই কী করে?
আমিও তোমাকে এখুনি যাবার জন্যে পেড়াপেড়ি করছি না। আমি বরং আগে ওদের দুজনকে পাঠিয়ে দিই। অ্যাডভান্স পার্টি। তারপর তুমি আর আমি দু’জনে যাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে আমি দু’চারদিনের জন্যে চট করে একবার সিঙ্গাপুর থেকে ঘুরে আসি।
সে মন্দ হবে না। বাবা প্রায় সুস্থ হয়ে এসেছেন।
তোমার দাদু কেমন আছেন?
মোটামুটি ভালই, তবে অসুখটা তো তেমন সুবিধের নয়। দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেছে।
দুই রুগিকে তুমি একা সামলাচ্ছ কী করে?
আমি ঠিক একা নই। একজন মহিলা আছেন। বাবার এক পরিচিত ভদ্রলোকের স্ত্রী। আমাদের বাড়ির নীচের তলায় এসে উঠেছিলেন। ভদ্রলোক সুন্দর তবলা বাজাতেন।
অতীতকালে চলে গেলে কেন?
আজ্ঞে, তিনি আর নেই। মারা গেছেন।
কবে মারা গেলেন? ওই বাড়িতেই?
আজ্ঞে না। তিনি কোথায় কোন রাজ এস্টেটে যেন বাজাতে গিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ফেরার নাম : নেই। এই দিন কয়েক আগে এক সি আই ডি অফিসার এসে খবর দিলেন ভদ্রলোক খুন হয়েছেন। মর্গে পড়ে ছিলেন আনক্লেমড হয়ে। ডেডবডি যথাসময়ে পাচার হয়ে গেছে।
