হাত মোছার কথা ভুলে গেছেন। মেঝেতে জল পড়ছে টপটপ করে। ভিজে হাতেই বুকের কাছে চাদর চেপে ধরে বললেন, তা হলে কী হবে? ডেডবডি আনার কী ব্যবস্থা হবে!
ডেডবডি আর নেই। ডিসপোজড অফ।
কেন, কার হুকুমে?
মৃত্যু হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে।
বাঃ বেশ মজা! এক পাশ দিয়ে নিঃশব্দে এল, আর এক পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল। কাউকে একবার জানতে দিলে না। ও কি ফুল ছিল? ও কি পাতা ছিল? ও তো মানুষ ছিল। শিল্পী ছিল। অমন তবলা কে আর বাজাবে? তা বলে বেঁচেও জ্বালাবে, মরেও জ্বালাবে!
পিতা ধীরে ধীরে কাকিমার দিকে এগোতে লাগলেন। আমার ভেতরটা বহুক্ষণ শূন্য হয়ে গেছে। সাধক এই শূন্যতায় ঈশ্বর লাভ করেন। আমি তো এক মিনমিনে কল্পবিলাসী। আমি আর কী পাব! পিতৃদেবের ডান হাত সামান্য ইতস্তত করে কাকিমার মাথার পেছন দিক স্পর্শ করল।
বউঠান, যা হবার তা তো হয়েইছে। সহ্য করা ছাড়া মানুষের আর কী করার আছে? ভাগ্যকে যে মানতেই হবে।
জল-ভরা চোখে পিতার দিকে তাকিয়ে কাকিমা বললেন, আমি এখন কী করব? আমি এখন কোথায় যাব? আমার যে কেউ নেই বটঠাকুর!
কেন, তোমার মামাশ্বশুর? পয়সাঅলা মানুষ। ভোগ করার কেউ নেই।
প্রবল আতঙ্কে কাকিমা বললেন, না না, মরে গেলেও আমি আর ওখানে যাব না।
তা হলে, তুমি আমাদের কাছেই থাকবে। আমাদের জন্যে তুমি যা করেছ, সে ঋণ ভোলার নয়। আমাদের দিন চলে গেলে, তোমার দিনও চলে যাবে।
যদি জোর করে নিয়ে যেতে চায়?
তুমি যাবে না।
কী অধিকারে থাকব?
মহিলার আকস্মিক বাস্তববাদী প্রশ্নে আমার আদর্শবাদী পিতা থতমত খেয়ে গেলেন। মহিলারা সমাজ নামক পাঁচকলটিকে পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি চেনে। কিছু ভেবে না পেয়ে পিতা বললেন, সেসব পরে ভাবা যাবে। তুমি থাকবে তোমার অধিকারে, আমাদের শ্রদ্ধার আসনে।
কাকিমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। বলা হল না। ঘরে একসঙ্গে অনেকে এসে হাজির হলেন। সিস্টার, ডাক্তার, সেই কাজের মেয়েটি। ট্রে-তে গরম জল, ভাসমান বরিক তুলল, ওষুধের শিশি, অ্যান্টিসেপটিক, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। লটবহরের শেষ নেই।
সন্ন্যাসীভাবাপন্ন সেই ডাক্তারবাবু কোনও দিকে না তাকিয়েই বললেন, শুয়ে পড়, শুয়ে পড়, একটু মেরামতির কাজ আছে। ভালই হিল আপ করছে। পারফেক্ট সিস্টেম। এই বয়েসে ভোগী মানুষের সুগার দেখা দেয়। তুই বেঁচে গেছিস। কৃচ্ছসাধনের এই গুণ।
ডাক্তারবাবু নিজের খেয়ালে কথা বলছেন। সিস্টার মাঝে মাঝে কাকিমার দিকে তাকাচ্ছেন। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে। এক মহিলার আর এক মহিলার প্রতি স্বভাবসুলভ কৌতূহল। প্রফুল্লকাকা মারা গেছেন। ব্যাপারটা আমার কাছে আর তেমন শোকাবহ নয়। আমারও চোখ আছে। সে চোখ জলে ঝাঁপসা নয়। বেমানান হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, কাকিমাকে আজ কালিদাসের বিরহী নায়িকার মতো দেখাচ্ছে। উড়ুউড়ু চুল, ছলছলে চোখ, সাদা শাড়ি। উত্থান পতনে জায়গায় জায়গায় সামান্য ধুলোময়লা লেগেছে। জানি, আমার এ দৃষ্টি ভাল নয়। জানলে কী হবে! বিল্বমঙ্গলের সাহস কোথায়! কাটা ফুড়ে অন্ধ করে দিতে পারছি কই!
সিস্টার হঠাৎ হাসপাতালের কণ্ঠে বললেন, ঘর খালি করুন, ঘর খালি করুন।
কাকিমাকে কি তার অসহ্য মনে হচ্ছে। তাই নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে ব্যস্ত? পিতৃদেব বললেন, তড়িৎ, আজ তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। আমার আর পড়ে থাকার উপায় নেই। চারপাশ থেকে চাপ আসছে প্রচণ্ড।
আর দু’-একদিন, তারপর ছুটি।
না, আজই। আমার আর উপায় নেই।
বাড়িতে এইসব ড্রেসিংট্রেসিং তোমার করবে কে? ট্রেইন্ড হ্যান্ড চাই।
ও আমি নিজেই করে নিতে পারব।
দিন দুয়েক বাড়ির বাইরে থাকলে কী এমন হবে?
সে তুমি বুঝবে না ডাক্তার! অনেক রকম সমস্যা এসে গেছে।
সেভেন্টি পার্সেন্ট সেরে এসেছে অবশ্য। ছেড়ে দেওয়া যায়। সিস্টার, ছাড়া যায়?
আমাদের সেবাযত্ন ওঁর যখন সহ্য হচ্ছে না, তখন তো ছেড়ে দিতেই হবে।
পিতৃদেব আশার আলো দেখতে পেলেন, তা হলে ড্রেসিংটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলুন। একটা ট্যাক্সি ডেকে আনুক, ওদের সঙ্গেই চলে যাই।
সিস্টার আবার বললেন, ঘর খালি করুন, ঘর খালি করুন।
লটবহর নিয়ে আমরা বাইরে এসে লম্বা একটা বেঞ্চে বসে পড়লুম। সময় ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। চাঁদরে ঢাকা একটা দেহ চাকা-লাগানো স্ট্রেচারে চেপে আমাদের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে দূর থেকে দূরে চলে গেল। একটি মাত্র মানুষ, একটি মাত্র দেহ, শূন্য করিডর। পায়রা ডাকছে। একঘেয়ে মন কেমন করা সূরে। অন্ধকার-অন্ধকার জায়গায় পালিশ করা ঢাউস বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে, পৃথিবী যেন থেমে গেছে। আমাদের কারুর মুখেই কোনও কথা নেই। মাঝে। মাঝে পুরনো দিন উঁকি মেরে যাচ্ছে। প্রথম যেদিন দু’জনে এলেন। সাজিয়েগুজিয়ে সংসার পাতা। ঘোর বর্ষণে ভেজা। মুখোমুখি বসে লুডো খেলা। সরষের তেল আর পেঁয়াজ মেখে মুড়ি খাওয়া। ঝালে হুসহাস করা। এই পৃথিবীতে কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। আজ এক রকম কাল এক রকম। মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে পৃথিবী এক দুঃসহ যন্ত্রণা।
ডাক্তার আর সিস্টার দু’জনে মার্চ করে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় একবার মাত্র আমাদের। দু’জনের দিকে তাকালেন। পৃথিবীতে সকলেই বড় ব্যস্ত। ঘরের দরজার সামনে এসে পিতৃদেব আমাদের ইশারায় ডাকলেন। অ্যান্টিসেপটিকের চড়া উগ্র গন্ধ বেরোচ্ছে।
