ঘরে ঢোকার আগে কাকিমা ফিসফিস করে বললেন, খাবার আগে কোনও কিছু বোলো না যেন! অসুস্থ মানুষ, একবার মাত্র আহার করেন। সব পণ্ড হয়ে যাবে। আমার যা হবার তা তো হয়েইছে।
অবাক হয়ে মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। আমি সন্তান হয়ে এই নিঃসঙ্গ মানুষটির জন্যে কখনও এভাবে ভাবিনি। ইনি কি তা হলে দেবী! আমার চিনতে ভুল হয়েছিল।
গ্রন্থে বড় তন্ময় হয়ে আছেন। মুখে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি একটা ঋষি-ঋষি ভাব এনেছে। পেছনে ছবির ফ্রেমের মতো জানলায় শরতের নীল আকাশ। মেঘের পেঁজা তুলো ভাসছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চোখ তুলে তাকালেন। চোখে অদ্ভুত এক সুদূরের দৃষ্টি। বেশ বোঝা যায় বহু দূরে চলে গেছেন। আমার অত্যন্ত ঈর্ষা হয়। অন্তরের হোমাগ্নি ধীরে ধীরে আমার চেয়ে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এত কাণ্ড করে আগে শুরু করেও আমি হেরে যাচ্ছি।
বই মুড়তে মুড়তে পিতা বললেন, একী, তোমরা এরই মধ্যে এসে গেছ!
এরই মধ্যে কী, আজ একটু দেরিই হয়ে গেছে।
বউঠান, তুমিও আজ এসেছ! আজকের দিনটা বড় ভাল। আকাশের দিকে একবার তাকাও। মা আসছেন।
ভেবেছিলুম উত্তর দিতে গিয়ে কাকিমা হয়তো ভেঙে পড়বেন। অদ্ভুত সংযম। নিজেকে ঠিক ধরে রাখলেন। মৃদু হেসে বললেন, পৃথিবী উলটে গেলেও আজ আমি আসতুম। কেউ আটকাতে পারত না।
সত্যিই তাই। ওঁর পৃথিবী তো উলটেই গেছে। পিতৃদেব পা নামিয়ে চটি খুঁজতে খুঁজতে বললেন, একদিকে আমি বড় ভাগ্যবান। তোমাদের অযাচিত স্নেহ ভালবাসায় দিন আমার বেশ ভালই কাটছে। আচ্ছা, প্রফুল্লর কোনও খবর পেলে?
প্রশ্ন করে তিনি হাত ধোয়ার জন্যে ঘরের কোণের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি কাকিমার মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালুম। কী উত্তর দেবেন? মিথ্যে বলবেন? কাকিমা ঠোঁটের ওপর। একটা আঙুল রাখলেন। কী আশ্চর্য, আমাকেই সাবধান করছেন।
টেবিলের ওপর টিফিন কেরিয়ার রেখে ঢাকনা খুলতে খুলতে বললেন, আপনি যা যা ভালবাসেন, সবই আজ বেঁধেছি। জানি না তাড়াহুড়োয় কেমন হল!
তোয়ালেয় হাত মুছতে মুছতে টেবিলের কাছে এসে পিতা বললেন, তুমি এ কী করেছ বউঠান? এত খাবার ক্ষমতা কি আমার আছে? তোমার যত্নে, এই ক’দিনে আমার ভুড়ি নেমে গেল।
চাদরটা বুক থেকে সরে গেছে। সাবধানে চাপা দিতে দিতে বললেন, কী অস্বস্তিকর হয়েছে। একবার দেখেছ? ঘষা লাগলেই শিউরে উঠছে। ভগবান আর ক’দিন যে ফেলে রাখবেন!
কথা বলতে বলতে আহারে বসলেন। কাকিমা পাশে দাঁড়িয়ে বাটি সাজিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন। সরষে মাখা আস্ত একটি পার্শেমাছ ন্যাজা আর মুড়ো দু’পাশে বের করে ধনুকের মতো হয়ে আছে। কাকিমা তার ওপর ফোঁটাফোঁটা পাতিলেবুর রস ফেলছেন। কেউ জানে না, আমি জানি, এ হল চোখের জলের ফোঁটা। একই জগৎ মানুষের কাছে কীরকম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়! যিনি আহারে বসেছেন, তার আকাশে ঝলমলে আলো, যিনি আহার করাচ্ছেন তার আকাশ কালো। আলো আর অন্ধকারের কেমন পাশাপাশি অবস্থান।
পিতা খেতে খেতে বললেন, আজ যা বেঁধেছ বউঠান! বহুকাল এমন সুস্বাদু রান্না খাইনি। আজ তুমি চুটিয়ে বেঁধেছ। এখন মনে হচ্ছে, আমি যদি হরিশঙ্কর না হয়ে ভীমসেন হতুম, তা হলে গোগ্রাসে সব খেয়ে ফেলতুম। রান্নাও এক সাধনা, তুমি সিদ্ধিলাভ করেছ। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।
কাকিমা হাসার চেষ্টা করলেন। এইবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বর্ষার প্রথম। বৃষ্টির মতো দু’দানা বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা টিন-মোড়া টেবিলের ওপর শব্দ করে ঝরে পড়ল। পিতা হাত ধোয়ার জন্যে আসন ছেড়ে সবে উঠতে যাচ্ছিলেন, কাকিমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। বললেন, কী হল? আঘাত দিয়ে ফেললুম নাকি!
কাকিমা দাঁতে ঠোঁট চেপে ভীষণ চেষ্টা করছেন, আর যেন কান্না না আসে! পারলেন না। বাঁধন আলগা হয়ে গেছে। গাল বেয়ে হুহু করে জল নামছে। চোখে আঁচল চেপে ধরেছেন। এই প্রথম লক্ষ করলুম, ফরসা গোল হাতে কবজির কাছে রক্তের ধারা নেমে শুকিয়ে গেছে। জোর করে শাখা ভেঙে ফেলার সময় অসাবধানে ফুটে গেছে।
পিতা উঠে দাঁড়িয়েছেন। মাথায় দুজনেই প্রায় সমান সমান। দু’জনেরই সুঠাম শরীর। পিতাকে আজ রাজযোগীর মতো দেখাচ্ছে। কাকিমা যেন নিরাভরণ আশ্রমবালিকা। কিছুই বুঝতে না পেরে পিতা আমার দিকে তাকালেন, কী হল বলো তো!
আর চেপে রাখার কোনও মানে হয় না। ধীরে ধীরে বলেই ফেললুম, প্রফুল্লকাকা মারা গেছেন।
সেকী? তা কী করে হয়? ওর তো মরার বয়েস হয়নি। আমার চেয়ে অনেক ছোট। আমি এখনও বেঁচে, সে কেন মরবে এত তাড়াতাড়ি! কোথা থেকে তোমরা খবর পেলে?
একটু আগে বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, সি আই ডি।
কী হয়েছিল?
খুন। মেরে ফেলেছে। পুলিশ তিনজনকে অ্যারেস্ট করেছে।
সেকী? ভদ্রলোকের ছেলে খুন হয়? ভুল কথা, মিথ্যে কথা।
কাকিমা দেয়ালে কাঁধ ঠেকিয়ে একপাশে কাত হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছেন। আমাকে আবার বলতে হল, আজ্ঞে মিথ্যে নয়, ওঁর শেষ মুহূর্তে ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিস আমাদের দেখালেন, আর দেখালেন মৃত অবস্থায় ভোলা একটা ছবি।
সে তো নিদ্রিত অবস্থাও হতে পারে!
আজ্ঞে না, ঘুমন্ত অবস্থা আর মৃত অবস্থার তফাত দেখলেই ধরা পড়ে।
পিতৃদেব কোনওরকমে হাতমুখ ধুয়ে এলেন। কী পরিহাস ভাগ্যের! একটু আগে না জেনেই বলেছিলেন, আজ দিনটা কী ভাল! নীল আকাশ। দেখো মা আসছেন।
