মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, ডেডবডি আপনারা পুড়িয়ে ফেলেছেন?
ভদ্রলোক সুটকেস হাতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ডিসপোজড অফ। আচ্ছা আজ চলি, প্রয়োজন হলে আবার আসব।
বাতাসে শব্দের ঘুসি মারতে মারতে মোটরবাইক দূর থেকে দূরে চলে গেল। ঘরের মাঝখানে কাকিমা উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে। আজ বড় পবিত্র সাজে সেজেছিলেন। সব চুরমার হয়ে গেল। মোটরবাইকের শব্দটা যেন বুক থেকে উঠে দূরে মিলিয়ে গেল। মাতামহ চেয়ারে স্তম্ভিত। হঠাৎ নুয়ে-থাকা বাঁশের মতো ছিটকে উঠলেন। সোজা দাঁড়িয়ে হাহা করে হাসতে লাগলেন। ভয় হল, পাগল হয়ে গেলেন না তো! হাসি থেমে গেল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, সবই বেটির খেলা, সবই বেটির খেলা। অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। সুখের সংসার জ্বলেপুড়ে যায়।
কাকিমা বাহাদুরের পাশ দিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে ছুটলেন। মাতামহ বললেন, এবার তা হলে কী হবে! এমন সুন্দর মেয়েটা বিধবা হয়ে গেল। তুমি একবার দেখো, কী করতে কী করে ফেলে।
শোবার ঘরের আয়নার সামনে কাকিমা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের মুখোমুখি। সধবার সামনে বিধবা। প্রতিবিম্বের পাশে রাহুগ্রাসের মতো আমার মুখের কিছু অংশ ভাসছে। কাকিমা আঁচল দিয়ে কপালের টিপটা ঘষে তুলে ফেললেন। সিথির সিঁদুর তুলে ফেললেন ঘষে ঘষে। সেদিন দোরে ফেরিঅলা ডেকে শাঁখা পরেছিলেন। শাঁখাজোড়া নিজেই ভেঙে ফেললেন মটমট করে।
আমি সবই দেখছি। কিছু করার নেই। হঠাৎ আয়নার দিক থেকে আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, চলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে। বটঠাকুর না খেয়ে আছেন।
আচমকা আমি আবার একটা ধাক্কা খেলুম। মহিলা বলেন কী? এত মনের জোর! ইনি কি তা হলে সাধিকা? মায়া, মোহ, সংস্কার সবকিছু জয় করে বসে আছেন! চিনতে ভুল হয়েছিল। আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আপনি বলছেন কী?
চোখের জল এখনও ভাল করে শুকোয়নি। ঠোঁটদুটো এখনও আবেগে কাঁপছে। পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন ধীর পায়ে। এতই কর্তব্যবোধ যে এত বড় একটা শোক মিলিয়ে গেল, চাপা পড়ে গেল।
নিচু হয়ে টিফিন কেরিয়ার হাতে তুলে নিলেন। খরখরে সিমেন্টের মেঝেতে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়ল। দূরে চটকলের ভো বেজে উঠল। অদ্ভুত তার বুকখালি করা স্বর। পৃথিবীর সমস্ত মৃত্যুর জন্যে সমবেত এক আক্ষেপ বাঁশি হয়ে কেঁপে কেঁপে বাজছে। ঠাকুর বলতেন, সানাইয়ের সুরে সাধকের সমাধি হয়। এই বাঁশি শুনলে কী বলতেন!
হাতে টিফিন কেরিয়ার। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত চেহারা। কাকিমা আমার সামনে। চাপা গলায় বললেন, চলল।
আপনি যাকেন কী করে? এই অবস্থায়।
ভাল করে কথা বলতে পারছি না। এই প্রথম অনুভব করলুম মন এক। আমার মন, তোমার মন, অহংবোধে খণ্ড খণ্ড। আসলে মন একটাই, বৃহৎ মন। তা না হলে আমার মনে হবে কেন আমিও বিধবা হয়েছি! এই মহিলার শূন্যতা আমার মধ্যেও এসে গেছে।
কাকিমা নিজের মুঠোয় আমার হাত চেপে ধরে বললেন, আর দেরি কোরো না। যার কাছে গেলে আমি শান্তি পাব তার কাছে আমাকে যেতেই হবে।
মহিলাদের মন বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। শুনেছি ঈশ্বরও জানেন না। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মাতামহ উঁকি মেরে মেরে দেখছেন। মাতামহ জগৎমাতাকে চেনেন, সাধারণ রমণীর ব্যাপারে তিনি বড়ই অজ্ঞ। কতকাল হয়ে গেল মাতামহী চলে গেছেন। তারপর থেকে তো একেবারেই নাঙ্গাবাবা। স্ত্রীবিয়োগে স্বামীর অবস্থা স্মৃতিতে গাঁথা থাকলেও থাকতে পারে, স্বামীবিয়োগে স্ত্রীর অবস্থা জানবেন কী করে! মঞ্চভীত অভিনেতার মতো উইংসের পাশ থেকে উঁকি মারছেন।
ওঁর পাশ দিয়ে যাবার সময় ছেলেমানুষের মতো ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় চললে তোমরা?
হাসপাতালে।
বউমাও!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তবু আমাকে কিছুতেই যেতে দেবে না। কী তোমাদের বিচার! হরিশঙ্কর কি শুধু তোমাদেরই? আমার কেউ নয়!
আর একটু সুস্থ হলেই আপনাকে নিয়ে যাব।
আর কত সুস্থ হব বলতে পারো? আমার বয়েসের মানুষ আর কত সুস্থ হবে? তোমরা মানুষের বয়েসটা ভুলে যাও।
কাকিমা গড়গড় করে কলের পুতুলের মতো কোনও দিকে না তাকিয়ে এগিয়ে চলেছেন, সোজা সিঁড়ির দিকে। আর বেশি কথা বাড়াবার সময় নেই। ঠাস বাঁধাকপির মতো এতকালের অবস্থা হঠাৎ শুকনো ফুলের মতো ঝরতে শুরু করেছে। সবকিছু সামাল দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে আর লাভ নেই। সময়ের চলন সহজে বোঝা যায় না। আজ যেন বুঝছি। মুহূর্ত নিমেষে মিনিটের সাঁকো পার হয়ে ঘণ্টার দিকে তরতর করে ছুটে চলেছে। কী দুর্বার তার গতি! একটা জিনিস এতকাল চাপা ছিল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে কন্যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
ট্যাক্সি চলেছে। পেছনের আসনে দু’জনের মাঝখানে টিফিন কেরিয়ার। এখনও গরম। কনুই লাগলে ছ্যাঁক করে উঠছে। দাঁতে দাঁত চেপে কাকিমা বসে আছেন। কোথায় গেল আনন্দ, কোথায় সেই বেশভূষা! সময় কী আশ্চর্য জিনিস! মুহূর্তের চৌকাঠ ডিঙোলে কে যে কোথায় গিয়ে পড়বে জানা নেই। একটু আগে কী ছিল, একটু পরে কী হল। কিন্তু আমি তো এতদিন এই মুহূর্তটাকে ধরে রেখেছিলুম। প্রায় সফলও হয়েছিলুম। অনেক আগেই যা হত তা হয়েছে অনেক পরে। সময়ও তা হলে চুরি করা যায়!
দূরে মেডিকেল কলেজের হলদে বাড়ি। গাড়ি তো ঢুকছে। ভাবছি এবার কী হয়!
১.৫৯ মনে করি এইখানে শেষ
হাসপাতালের লোহার খাটে পিতৃদেব বাবু হয়ে বসে আছেন। গায়ে একটি সিল্কের চাদর। জামা পরার উপায় নেই। পইতে গোল করে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন বৈষ্ণবের কঞ্চির মতো। কোলের ওপর হলুদ মলাটের একটি বই খোলা। দেখলেই চেনা যায়, শ্রীশ্রীসদ্গুরু সঙ্গ। সেদিন বলছিলেন, ধর্মজগতে এইরকম একটি ক্যানডিড ডায়েরি আর দ্বিতীয় নেই। মানুষকে মানুষ বলে মেনে নিয়ে ধর্মের পথে এগিয়ে যাবার এমন শিক্ষা আর কোনও গ্রন্থে আছে কি না জানা নেই। খুঁজে দেখতে হবে। কোনও লুকোচুরি নেই, ওপরচালাকি নেই। পড়তে পড়তে সেই কথাই আর একবার মনে হবে, নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ। কেউ মোড়কে মুড়ে দেবত্ব তোমার খোলে পুরে দিয়ে যাবে না। ভেতরটাকে আগে খালি করো, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করো। এই আমির মৃত্যু হলে তবেই সেই আমি এসে ধরা দেবে। সহসা একদা আপনা হইতে/ভরি দিবে তুমি তোমার অমৃতে। গোস্বামীজি যদি আজ থাকতেন, ব্রহ্মচারীজি যদি থাকতেন, সামনে গিয়ে একবার দাঁড়াতুম। গুরু একদিনে যা পারেন একা তা করতে কয়েক জীবন লাগে। দুর্ভাগ্য আমার এই ধর্মভূমি আজ শূন্য।
