সুখেন একটা ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল। অনেকদিন হয়ে গেল, মায়া এক শিশি কালি চেয়েছিল। মেয়েটি খুব সুন্দর ছবি আঁকে। হাতের লেখা যেন ছাপার অক্ষর। যখন কাজ করে পাশে বসে দেখতে বড় ভাল লাগে। কেমন করে আঁকছে, রং করছে, লিখছে। পরনে কনট্রোলের লালপাড় সাদা শাড়ি, গেরুয়া ব্লাউজ। পিঠে ছড়ানো রুক্ষ চুল। কেমন একটা শিল্পী শিল্পী চেহারা। সুখেনের সবেতেই পাপ। আমার কেউ কোথাও নেই। ছায়া মায়া তো আমার বোনের মতো। ছায়া আমার চেয়ে বয়েসে ঢের বড়। মুখে বড় বড় বসন্তের দাগ। গেরুয়া নিয়েছে। তার সঙ্গে কারুর কোনও প্রেম, ভালবাসা, বিয়ে হতে পারে? সুখেন শুধু একটা কথাই জানে, যন্তর। ওর বাবার উচিত ছেলের শ’খানেক বিয়ে দিয়ে একটা আড়তে এক বছর বন্ধ করে রাখা। আমার পিতা যেমন রাত বারোটার সময় গলায় ডান্ডা পুরে এক জার মোরব্বা খাইয়েছিলেন জোর করে।
মায়াকে আজ এক দোয়াত কালো কালি দিয়ে আসতেই হবে। দেবার মতো আমার আর কী আছে? পিতার ধনে পোদ্দারি। নানা জিনিস তৈরি তার হবি। লেখার কালি তৈরি তার মধ্যে একটি। বড় কঠিন কাজ। সবচেয়ে দুরূহ কেরামতি হল কালো কালি তৈরি। এতটুকু তলানি পড়বে না, ঝরনা কলমের মুখ দিয়ে সূক্ষ্ম ধারায় বেরোতে থাকবে অবিরাম। বিলিতি কালির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, স্টিফেনস সক্রিপ, কুইঙ্ক, ওয়াটারম্যান, সোয়ান। সারি সারি বোতল, মুখে ফেঁদল আর বিভিন্ন ঘনত্বের ফিল্টার পেপার। সারাদিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে পরিশ্রুত কালি। নির্জন নিঃস্তব্ধ ঘরে কান পাতলে শোনা যাবে বিলুপতনের শব্দ, টুপ টুপ। এমন সব উপমা মাঝে মাঝে মনে আসে যা কালিদাসের পিতাও ভাবতে পারবেন না। বিশাল পালঙ্কে সময় শুয়ে আছে। ডান হাত ঝুলে আছে পালঙ্কের পাশে। তলায় একটি পাত্র। ধমনী চিরে গেছে ধারালো অস্ত্রে। রক্তের বিন্দু পড়ছে ফেঁটা ফোঁটা। পাণ্ডুর হয়ে আসছে শরীর। দিন যায় দিন যায়। গ্রিক পদ্ধতিতে সময়ের আত্মহত্যা। এর নাম কালি-ঘর। মাটির গামলায় বেদানার ভোলা আর হরীতকী পচছে। তাকে তাকে অসংখ্য শিশি। কোনও কোনও শিশি মৃত্যুর মতো নীল, খুনির মতো লাল। চিনির দানার মতো শুভ্র জরানো এক ধরনের পদার্থ, অকজ্যালিক অ্যাসিড। বাদামি ট্যানিক অ্যাসিড। ঝুলের আবরণে হরেক শিশি বসে আছে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে। ঘরটা তেমন আলোকিত নয়। শীতের শেষ দ্বিপ্রহরে ঢুকলে মনে হবে প্রেতাত্মা নৃত্য করে চলেছে নূপুর পায়ে।
মায়ার জন্যে কালি আমাকে চুরি করতে হবে। এ শিশি থেকে একটু, ও শিশি থেকে একটু। এ চুরিতে নীতির প্রশ্ন নেই। অর্থ নয়, অলংকার নয়, সামান্য তরল পদার্থ। বিদ্যার্জনের প্রয়োজনে লাগবে। তা ছাড়া একটা গর্বও আছে। আমার পিতা কী না পারেন? আমি সামান্য হলেও তিনি অসামান্য। কত কী পারেন, যা কেউ পারে না।
শিশিতে কালি ঢালাচালি চলছে, কনক এসে ঘরে ঢুকল। নীচে কী করছিলে এতক্ষণ? এঁদো স্যাঁতস্যাঁতে গলিতে?
ওই যে আমার এক বন্ধু এসেছিল, সুখেন।
বেশ দেখতে ছেলেটিকে। কেমন সুন্দর স্বাস্থ্য। তোমার যদি ওইরকম হত। একটু চেপে খাওয়াদাওয়া করো না! দুধ, ঘি, মাখন। সকালে তোমার খাওয়া দেখলুম তো! পাখির আহার!
হুম!
স্বাস্থ্য তুলে কথা বললে উত্তর এক অক্ষরেই হওয়া উচিত। শরীর ছাড়া পৃথিবীতে আর যেন কিছুই নেই। এ যেন গো-হাটায় গোরু বিক্রি। নধর গাভীটির দিকে সবাই দৌড়োবে। দাম উঠবে চড়চড় করে। শাস্ত্র বলছেন, দেহটা কিছুই নয়। আসল হল আত্মা। সে বাবা এমন জিনিস, আগুনে পোড়ে না, জলে গলে না, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা যায় না। নাও, কী করবে করো। মেয়েদের। কথাবার্তাই যেন কেমন কেমন। চুল-ওলটানো ফচকে ছোঁড়া দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গেল। কী? না, শরীর! সাতটা বাঘে রুল অফ থ্রি-র হিসেবে রোজ এক ঘণ্টা করে খেলে তিন দিনে সুখেন ফুরোবে। আর আমাকে? বাঘ দেখেও দেখবে না। এক যদি কোনও এয়োস্ত্রী বাঘ কাটোয়ার ভঁটা ভেবে একটু। চিবিয়ে দেখে। তাতে হয়েছেটা কী! সুখেনের ভেতর দেখো, আর আমার ভেতর দেখো! শ্রীচৈতন্যদেবের চেহারা কি গোয়বাগানের ব্যায়ামবীরের মতো ছিল! শ্রীরামকৃষ্ণ পেটরোগা ছিলেন। সারদা মা কাঁচকলার ঝোল ভাত বেঁধে খাওয়াতেন। বুদ্ধদেব কি রোজ গুপেগুড়ার মতো। মুগুর ভাজতেন। পুণ্যের শরীর একরকম, পাপের শরীর আর একরকম। মেয়েরা বোঝে না কেন?
কনক উবু হয়ে আমার গা ঘেঁষে বসল। বসল তো ভারী বয়েই গেল। আমি তো আর সুখেন নই যে ভেতরটা জল থেকে তোলা মাছের মতো ছটফট করবে। আমি তো আগমার্কা ঘি। কোনও ভেজাল নেই। খুব বেসামাল হয়ে পড়লে, একবার শুধু বলব, মা বিপত্তারিণী, রক্ষা করো। গেল, গেল বুঝি সব রসাতলে। কনক ফিসফিস করে বললে, কী হচ্ছে কী এসব? সারি সারি বোতল।!
কালি ফিল্টার হচ্ছে।
কী হবে এত বোতল বোতল কালি?
লেখা হবে।
বাব্বা, মহাভারত লেখা হয়ে যাবে যে! আমার কলমে একটু ভরে দেবে? দেখি কেমন কালি!
এ জিনিস বাজারে মিলবে না। ঝুল কালো। নিবে আটকায় না। যে-কাগজে লিখবে সে কাগজে ভাগ্যের লিখনের মতো চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।
বাঃ, পাক্কা সেলসম্যান ভাস্করবাবুর মতো কথা বলতে পারছি। একটুও আটকাচ্ছে না। পিতার ইচ্ছে কালি যদি কালীর মতো দাঁড়িয়ে যায় মহাদেবের বুকে, মহাদেব মানে বাঘমার্কা সাদা কাগজ, আর লজ্জায় যদি জিভটি না বেরোয়, তা হলে নেমে পড়বেন ব্যবসায়। নামও ঠিক, ইলিসিয়াম ইঙ্ক। আমি হব সেলসম্যান। দোকানে দোকানে অফিসে অফিসে ঘুরব। লেখার কালি দিয়ে শুরু করে, স্ট্যাম্প প্যাড় ইঙ্ক, মার্কিং ইঙ্ক, শেষ হবে ছাপার কালিতে।
