বলেই মনে হল গাছের গুঁড়িতে কাঠুরিয়ার শেষ কোপ পড়ল। বিশাল একটি গাছ বনের মাথা কাঁপয়ে চারপাশে ভীষণ এক আলোড়ন তুলে আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ ফেলে নেমে চলেছে মৃত্তিকার মৃত্যুর দিকে।
আমাকে আবার কে ডাকবে?
বাইরের ঘরে একবার আসুন।
হাতটা কোনওরকমে ধুয়ে কাকিমা আমার পেছন পেছন আসছেন। এখনও জানেন না কে এসেছেন। দরজার কাছে এসে হাত চেপে ধরে বললেন, একী! পুলিশ! আমি তো কিছু করিনি।
অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আসুন আসুন। কোনও ভয় নেই। পোশাক দেখে ভয় পাবেন না।
কাকিমা ঘোমটা টেনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন। অফিসার বললেন, বসুন, আপনাকে দু’-একটা জিনিস দেখিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করব।
কাকিমা চেয়ারে আড়ষ্ট হয়ে বসলেন। আমি দূরে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছিলুম। অফিসার বললেন, আপনিও আসুন। তা হলে একটু সাহস পাবেন ইনি।
অফিসার দু’হাঁটুর ওপর সুটকেস রেখে ডালা খুলে ফেললেন। খুলতে খুলতে বললেন, আপনার স্বামীর নাম প্রফুল্লচন্দ্র দাস?
কাকিমা ঘাড় নাড়লেন।
কতদিন হল বাইরে গেছেন?
খুব মৃদু সুরে কাকিমা বললেন, অনেকদিন।
কোথায় গেছেন?
কোন এক রাজবাড়িতে তবলা বাজাতে।
জায়গার নাম মনে আছে?
না।
কোনও চিঠিপত্র পেয়েছেন?
না।
এতদিন বাড়ি ছাড়া, চিঠিপত্র নেই, খোঁজখবর নেই, আপনি জানার চেষ্টা করেননি তিনি কোথায় আছেন কেমন আছেন?
আমি কেবলই ভেবেছি, এই ফেরেন এই ফেরেন। আপনি কি তার কোনও খবর পেয়েছেন, কোথায় আছেন, কেমন আছেন?
উত্তেজনায় কাকিমার মাথা থেকে আঁচল খুলে পড়েছে। অফিসার বললেন, উত্তেজিত হবেন না। আমার আরও প্রশ্ন আছে।
চেয়ারের হাতল ধরে দাঁতে দাঁত চেপে কাকিমা কোনওরকমে বসে রইলেন। অফিসার সুটকেসের ডালার খাপ থেকে একটি ফটো বের করলেন, আচ্ছা দেখুন তো ইনিই কি আপনার স্বামী?
ছবি দেখে কাকিমা নীরবে ঘাড় নাড়লেন। ভদ্রলোক ধীরে ধীরে খাদের দিকে নিয়ে চলেছেন। এ সেই ছবি। মর্গে শায়িত অবস্থায় তোলা। মুখ দেখে বুঝতে সামান্য সময় লেগেছিল। এইবার বুঝে ফেলেছেন। সিঙিমাছে কাটা মারলে মানুষ যেভাবে লাফিয়ে ওঠে, কাকিমার সারাশরীরে একটা। কঁপন বয়ে গেল। একেবারে শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ‘পিন্টু এ কী হল’ বলে আঁচলে চোখ ঢাকলেন।
আমি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠেছি। যা হবার তা তো হবেই। আর তো রোখা যাবে না। উল্কার বেগে ট্রেন ছুটে আসছে। লাইন ছেড়ে সরে যাবার আর সময় নেই। মাথা দিতেই হবে। ভদ্রলোক বোকার মতো ছবিটা কেন সবার আগে দেখাতে গেলেন! সুটকেসে আরও তো অনেক কিছু দেখাবার ছিল।
কাকিমা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, কী করে এমন হল! কোথায় তাকে রেখেছেন?
অফিসার বললেন, স্থির হন, স্থির হন। এখনও আমার অনেক প্রশ্ন আছে।
আর প্রশ্ন! অনেক প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যাবে। উত্তর আর পেতে হচ্ছে না। পাকা মানুষ, কী করে এমন কাঁচা কাজ করলেন? ভাবনার এই মুহূর্তটিতে মাতামহ ঘরে এলেন। অবাক হয়ে বললেন, একী, তোমাদের এসব কী হচ্ছে বউমা?
কাকিমা কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে মাতামহের প্রশস্ত বুকে আছড়ে পড়লেন। বাঁধভাঙা কান্না শুরু হল। অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে?
আমার দাদু।
কাকিমা ধীরে ধীরে নীচের দিকে নেমে আসছেন। মাতামহের পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলেন। কিছু বুঝতে না পেরে মাতামহ বললেন, কী ব্যাপার বলে তো? হরিশঙ্কর ঠিক আছে?
আমি বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তবে বউমা এমন ভেঙে পড়ল?
প্রফুল্লকাকা মারা গেছেন।
অ্যাঁ, সেকী? কোথায় মারা গেছে?
অফিসার উত্তর দিলেন, বসুন, সব বলছি। তার আগে কিছু কিছু জিনিস শনাক্ত করতে হবে। ওঁকে একবার দেখান তো, এই পাঞ্জাবিটা চিনতে পারেন কি না।
আমি বললুম, আমি পারি। পাঞ্জাবিটা প্রফুল্লবাবুর।
তবু একবার সামনে ধরুন না।
পাঞ্জাবিটার দিকে কাকিমা ফিরেও তাকালেন না। তাকাবার মতো অবস্থাও নেই। কেমন যেন হয়ে গেছেন। অফিসার একটা বিড়ির কৌটো আর লাইটার বের করে বললেন, চিনতে পারেন?
খুব পারি।
সুটকেসে আরও অনেক কিছু রয়েছে। সেসব আর বের করলেন না। যা যা বের করেছিলেন সব ঢুকিয়ে ফেললেন। বেরিয়ে এল আরও গোটা তিনেক ফটো। ছবি তিনটে সুটকেসের ওপর পাশাপাশি ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, এদের মধ্যে কেউ কখনও এ বাড়িতে এসেছিল?
দু’জনকে চিনি না। তৃতীয়জনকে চিনি। সেই অষ্টাবক্র লোকটি, যে আমার ঘড়ি নিয়ে ভেগেছিল। একে চিনি বলতে গিয়েও বলা হল না। নিজেকে সামলে নিলুম। কী থেকে কী হয়ে যায়, বলা শক্ত। মনে হতে লাগল পুলিশের জাল ধীরে ধীরে আমার দিকেও এগিয়ে আসছে। এই মৃত্যুর খবর আমি যে অনেকদিন আগেই জেনেছি, অথচ বলিনি। অফিসার বললেন, কী হল, চেনেন? এসেছে কোনওদিন?
না।
ওঁকে একবার দেখান।
কাকিমা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। পঁড়িয়ে বললেন, আমি যাব। শেষ দেখা একবার দেখব।
অফিসার বললেন, কোথায় যাবেন? সব শেষ হয়ে গেছে। সে কি আজকের কথা! অনেক আগেই আপনাদের খোঁজখবর করা উচিত ছিল। মর্গে আনক্লেমড ডেডবডি কতদিন পড়ে থাকবে?
মাতামহ বললেন, আপনাদের খোঁজ করা উচিত ছিল।
খোঁজখবর করতে করতেই তো এসেছি।
তাতে আমাদের কী লাভ হল?
আপনাদের না হোক, আমাদের হল। কেসটা এখন সাজানো যাবে। তিনটেকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। খুনের উদ্দেশ্যটা তেমন ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না। সব খুনেরই একটা উদ্দেশ্য থাকে, হয় নারী, না হয় টাকা, বিষয়সম্পত্তি। দেখা যাক কী করা যায়। ভদ্রমহিলাকে প্রস্তুত থাকতে বলবেন। দিন সাতেকের মধ্যেই কোর্টে ডাক পড়বে, তখন এইসব আর একবার শনাক্ত করতে হবে।
