যতই দেখব না ভাবি, মুকুর চিঠির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। ‘প্রিয় পলাশ’। পলাশ কারুর প্রিয় নয়। কেন অশান্তি করছ মুকু? ‘তোমাকে একটা সুখবর দিই।’ কার সুখবর? তোমার না আমার! আমার সব খবরই কুখবর। কবর খোঁড়ার খবর। ‘আমি অনার্সে ফার্স্টক্লাস নিয়ে পাশ করেছি।’ ও তাই তো! কয়েকদিন হল তোমার রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমার নীরব অভিনন্দন গ্রহণ করো। এম এ পড়ার জন্যে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হব ঠিক করেছি। কই তুমি তো আমার চিঠির উত্তর দিলে না! তোমাকে লিখতে আমার ভীষণ লজ্জা করছে। জানি না, তুমি আমাকে কী ভাবছ? মেয়েরা কোনও একজনের কাছে কিছু যে বলতে চায়। সেই একজন যে কে, তা কি বলা যায়? মানুষেই তো স্বপ্ন দেখে? স্বপ্নও তো বাস্তব হয়? বলো হয় না? অপর্ণাকে আমার কিন্তু একেবারেই ভাল লাগেনি। বড় কাঁচা মেয়ে। কাঠের বন্দুকের মতো সারাজীবন কাঁধে বয়েই বেড়াতে হবে। কেন তা জানি না। সেসব কথা তোমার কাছেই গোপন রেখো। ওপর দেখে মানুষ চেনা বড় শক্ত। সম্পর্কের খাতিরে সারাজীবন আমাদের অভিনয় করে যেতে হয়। মেয়েদের অভিধানে বিদ্রোহ শব্দটি নেই। লেখাপড়া শিখে আমরা স্বামীর ঘর করতে চলে যাই। এক কারাগার থেকে আর এক কারাগারে। ভারত স্বাধীন হলেও আমরা স্বাধীন নই। তুমি কি হোমচৌধুরির খোঁজ করেছিলে?
সে আবার কী? এ যেন গোটা চারেক কিস্তি বাদ দিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস পড়া। কিছুই বুঝতে পারছি না। হোমচৌধুরিটা আবার কে? মুকুর রেখে যাওয়া কাগজপত্র সব গভীর কুয়োর জলে। সলিল সমাধি হয়ে গেছে। জানার আর উপায় নেই। সব পারিবারিক গুপ্ত কথা লোপাট।
বিকট শব্দে মোটরবাইক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কে আসতে পারেন! ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের ইন্সপেক্টর! না কি পিতার কোনও বন্ধু? মোটরবাইক-অলা বন্ধু তো কেউ নেই। মুকুর চিঠিটা সব আর পড়া গেল না। খামে ঢুকিয়ে রাখলুম। জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল। একজন পুলিশ অফিসার বাড়ির দিকে তাকিয়ে পঁড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হয়ে গেল। হাত নেড়ে নীচে ডাকলেন।
হঠাৎ পুলিশ কেন? কী আবার হল? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে নামতে মনে মনে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করলুম, না জেনে নিজেকে কোনও অপরাধে জড়িয়ে ফেলেছি কি না! একটা কথা ভেবে বুকটা আবার ধড়াস করে উঠল, ভদ্রলোক হাসপাতাল থেকে কোনও খারাপ সংবাদ আনেননি তো! ভাবামাত্রই ভীষণ শীত করতে লাগল।
পুলিশ অফিসার রাস্তার ওপাশ থেকে এপাশে চলে এসেছেন। একেবারে সদরের সামনে। হাতে একটা সুটকেস। রাগীরাগী চেহারার বাইকটা ওপাশে রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোককে ‘কী বলছেন?’ বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। এই প্রথম অনুভব করলুম, চোর আর পুলিশ দু’জনেই সমান। সামনে এসে দাঁড়ালে ভয়ে কণ্ঠরোধ হয়ে যায়।
বিশাল আকৃতির মানুষটি বেশ মিষ্টি গলায় বললেন, প্রফুল্লবাবু নামে এ বাড়িতে কেউ থাকেন?
মনে হল একটা ঘুষি খেলুম। নাকটা যেন থেবড়ে গেল। প্রথমে মনে হল বলি, না। তারপর ভাবলুম, মিথ্যে বললে জল আরও ঘোলা হয়ে যাবে। আমার তো কিছু জানার কথা নয়। আমি তো মর্গে কিছু দেখিনি। এই মুহূর্তে আমাকে অতি নিরীহ ভালমানুষের অভিনয় করতে হবে। বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ, থাকেন।
তিনি এখন কোথায়?
বেশ কিছুদিন হল বাইরে গেছেন।
আপনি তাঁর কে হন?
কেউ না। আমাদের বাড়ির নীচের তলায় তিনি থাকেন। নীচেটা খালি পড়ে ছিল।
প্রফুল্লবাবুর নিজের কেউ আছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, স্ত্রী আছেন।
আমি ভেতরে আসতে পারি?
হ্যাঁ, আসুন না।
আমি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে চাই।
মনে হচ্ছে আমার পক্ষাঘাত হয়েছে। সারাশরীর অবশ। পা যেন চলছে না। অভিজ্ঞ চোখে আমার এই অস্বাভাবিক আচরণ ধরা না পড়ে যায়। আমি আগে আগে, জুতোর ভারী শব্দ তুলে পুলিশ অফিসার পেছন পেছন উঠছেন।
দোতলায় উঠে এলুম কোনওরকমে। ভদ্রলোকের বিশাল চেহারায় ঘরের উচ্চতা কেমন যেন খাটো হয়ে গেল। আমাকে কিছু বলতে হল না। তিনি নিজেই চেয়ার টেনে বসে বললেন, তিনি। কোথায়?
যেন তর সইছে না। কত তাড়াতাড়ি একটা মানুষকে গুঁড়ো করে ফেলা যায়, সুখের ডালিমকে দু’হাতে নিংড়ে রস ঝরানো যায়। চাপরাশ পরা এই মানুষটির জগতে কর্তব্য ছাড়া আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই।
ধীরে বললুম, বসুন, ডেকে আনছি।
ভেতরের ঘরে মাতামহ এখনও বাহাদুরের সঙ্গে বকবক করছেন। টের পাননি বাইরের ঘরে শমন এসে বসেছেন। গায়ে আইনের গন্ধ। মুখে মৃত্যুর শীতল হাসি। বৃদ্ধ সোনালি সুতো দিয়ে অতীতের জামদানি বুনে চলেছেন।
রান্নাঘরে কাকিমা বসে আছেন। হাসপাতালে যাবেন, সাজগোজ সারা। সাদা শাড়ি পরেছেন। পিঠে লুটোচ্ছে আঁচল, লতাপাতার কাজ করা। চান করেছেন। গাটবাঁধা ভিজে চুল কোমর ছাপিয়ে মেঝে ছুঁয়েছে। পরিষ্কার মাজা মুখে সিদুরের গোল টিপ চকচক করছে। ঝকঝকে টিফিন কেরিয়ারে বাটির ওপর বাটি সাজিয়ে চলেছেন। আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, বটঠাকুর যা যা ভালবাসেন সব আজ বেঁধেছি। কত কম সময়ের মধ্যে সব করে ফেললুম বলো!
সবই শুনছি, কিছু বলতে পারছি না। কাকিমা আমার চোখের সামনে ভোরের কুয়াশার মতো ক্রমশ সাদা হয়ে যাচ্ছেন। আমি অতি কষ্টে বললুম, ওসব এখন থাক। আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।
