বিলের টাকা দেবার জন্যে সুখেন লাফিয়ে উঠল। খবরদার! আমি দোব বলেছি। সত্যভঙ্গ হবে।
খামচাখামচি করে সুখেনকে নিরস্ত করলুম। ঠাকুর বলে গেছেন, বিষয়ীর পয়সার খাবার মুখে তুলতে নেই। অন্তরপুরুষ সংকীর্ণ হয়ে যাবে। জবা বললে, আঃ, এরপর একটা পান খেতে পারলে যেন যোলোকলা পূর্ণ হত।
পান? পান খাবে, বলে সুখেন ঢাউস সুটকেস হাতে পানের দোকানের দিকে ছুটল। চারপাশে ভীষণ ভীষণ চেহারার মানুষের আনাগোনা। জবা আমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ছোট্ট লেডিজ রুমাল দিয়ে ঠোঁট মুচছে। সেন্টের গন্ধ উড়ছে।
জবা বললে, ভাল মেয়ে আছে, বিয়ে করবেন? আমাদের ওখানে। দেখতে শুনতে ভাল। গান জানে, নাচ জানে। বাপের একমাত্র মেয়ে। ভাল দেবেথোবে। আপনার সঙ্গে বেশ মানাবে। ছিপছিপে চেহারা।
আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
তাই নাকি! খবরটা এতক্ষণ চেপে রাখা হয়েছিল! আমাদের নেমন্তন্ন করবেন তো?
যদি হয় নিশ্চয় করব।
আবার যদি কেন? সামনের মাঘেই লাগিয়ে দিন। ও তখন তো আবার…।
জবা চোখ নামাল, নাঃ আমার আসা হবে না।
সুখেন এসে গেল, তুই পান খাবি?
আমি খাই না।
এঃ একটা তা হলে বেশি হয়ে গেল।
জবা বললে, আমাকে দাও। রুমালে মুড়ে রাখি। কাল খাওয়া যাবে। কী দাম নিলে গো?
কুড়ি পয়সা এক খিলি।
বলো কী? তোমায় নতুন লোক দেখে ঠকিয়েছে।
না না, ঠকাবে কেন? মঘাই পান।
রাখো তোমার মঘাই। যা হয় একটা বললেই হল। এই বেড়ালই বনে গেলে বনবেড়াল।
না গো, দেখছ না কেমন সাদা সাদা। বরফে শোয়ানো ছিল।
তোমার কলকাতা এক গলাকাটার জায়গা।
সুখেন ট্যাক্সি ধরতে ছুটছিল। জবা হাঁ হাঁ করে উঠল, ট্রামে চলো, ট্রামে। অত বড়লোকি চাল ভাল নয়। ঢাউস সুটকেস আর একটা লাল বউ নিয়ে সুখেন ট্রামে উঠে পড়ল। যাবার সময় বলে গেল, একবার আমাদের ওখানে আয় না।
সুখেনের কী অদ্ভুত পরিবর্তন! ভেড়ার মতো হয়ে গেছে। ঠাকুরের কথা মনে পড়ছে, সংসারী লোকগুলো তিনজনের দাস, তাদের কি পদার্থ থাকে? মেগের দাস, টাকার দাস, মনিবের দাস।
১.৫৮ In the great crisis of life
মানুষের জীবনে ভাল আর খারাপ একই সঙ্গে আসে। কালো আর আলো। আকাশে যখন মেঘের খেলা তখন বিশাল প্রান্তরে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা চলে। ছায়ার পেছন পেছন তাড়া করে আসে আলো। আলোর পেছন পেছন ছুটে চলে ছায়া।
লেটারবক্সে পাশাপাশি দুটি চিঠি শুয়ে ছিল। কবে এসেছিল কে জানে! রোজ লেটারবক্স দেখার অভ্যাস এ বাড়ির কারুরই নেই। চিঠি লেখাতেও আলস্য, চিঠি দেখাতেও আলস্য। চিঠি আদানপ্রদানের পরিসরও খুব কম। আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা কে যে কোথায় আছেন আজও জানা হল না। আমাদের বংশের ডালপালা মনে হয় খুবই কম। নেই বললেই চলে? শাখাপত্রশূন্য একটি বৃক্ষকাণ্ড, একটি মাত্র লিকলিকে ডাল মেলে ঊষর প্রান্তরে এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে আছে।
চিঠি দুটির একটি খাম, আর একটি পোস্টকার্ড। দুটিই আমার নামে। আমার সেই মানুষ নামক জ্ঞানগর্ভ, এখান থেকে ওখান থেকে মারা প্রবন্ধটি একটি নামকরা মাসিকপত্রে পাঠিয়েছিলুম। পত্রিকাটি বৃহৎ একটি ধর্মীয় সংস্থার। সন্ন্যাসী সম্পাদক লিখছেন,
মান্যবরেষু,
আপনার প্রবন্ধটি মনোনীত হয়েছে? দু-একটি জায়গা কিঞ্চিৎ অস্পষ্ট থাকায় আপনাকে দেখা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। যে-কোনও দিন সকাল এগারোটার মধ্যে অথবা বিকেলে তিনটে থেকে ছ’টার মধ্যে দেখা করা যেতে পারে। ইতি সম্পাদক, নির্মলানন্দ।
সংক্ষিপ্ত চিঠি; কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। পৃথিবী যে ঘুরছে এই প্রথম টের পেলুম। নিজের ভেতর নিজে লাফাচ্ছে। চারপাশ থেকে স্বপ্ন ঘিরে আসছে। সাংঘাতিক সেই প্রবন্ধ অবশেষে ছাপা হবে। জ্বলজ্বল করে উঠবে আমার নাম। নিজের হাতে নিজেই একবার হাত বুলোলুম। পাঁচটা আঙুল, একটা মাথা, সমবেত হয়ে পাতার পর পাতা অক্ষর সাজিয়েছে। ছত্রে ছত্রে মানুষ নামক জন্তুর শ্রাদ্ধ। ভাব এসে গেল। চোখ ছলছল করছে। ঠোঁটে-ধরা পাত্র যেন শেষ মুহূর্তে হড়কে না। যায়! যদি না যায় তা হলে বাকি জীবন আমি হোমাপাখির মতো মহাশূন্যের ঊর্ধ্বলোকে লাট খেয়ে বেড়াব। পৃথিবীর মাস্তুলে আর পা ঠেকাব না। শেলির স্কাইলার্কের মতো দর্শনের গান গেয়ে ঊর্ধ্বে আরও উর্ধ্বে উঠে যাব। উপায় থাকলে আজই ছুটে যেতুম। এখনও এগারোটা বাজেনি। উপায় নেই। কাকিমা খাবার তৈরি করছেন। আজ তিনি আমার সঙ্গে হাসপাতালে যাবেনই। বাহাদুর এসেছে। মাতামহ তাকে ঘাটশিলার বাড়ির গল্প শোনাচ্ছেন। সুবর্ণরেখার স্বপ্ন দেখছেন। তিনিও যাবার বায়না ধরেছিলেন। ছেলেমানুষের মতো ভুলিয়ে রেখেছি।
খামের চিঠিটা কার বুঝতে পারছি না। হাতের লেখা চেনাচেনা মনে হচ্ছে। খামটা সাবধানে খুলতেই মুকুর চিঠি বেরিয়ে পড়ল। দীর্ঘ দু’পাতা। মুক্তোর মতো ছোট ছোট হাতের লেখা। পুঁতির কিংখাবের মতো ঠাসবুনোনে সাজানো।
এবার বুক কাঁপল অন্যভাবে। আর কেন? আবার কেন? আর আমার সময় নেই। পথ ঘুরে গেছে। মতির গতি অন্যরকম হয়ে গেছে। পিতা সেদিন পাপের কথা বলছিলেন। চমকে উঠেছিলুম। কার পাপে কী হয়ে গেল কে জানে! পিতৃদেব সব ব্যাপারেই একটু হুড়ম দুড়ুম করলেও সাবধানী মানুষ। সবরকমের রিফ্লেকস অটুট আছে। তবু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। কেন ঘটল? কেন কাল। রাতে বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখলুম? গরদের শাড়ি পরে মা এসেছেন, মাথার সামনে। ভোরের ফিকে আলোয় চারপাশ গোলাপি। আমি যেন শুয়ে আছি আমাদের খোলা ছাদে। আমি শুয়ে শুয়ে মাথার দিকে তাকিয়ে বললুম, মা, তুমি? মা ঠোঁটের উপর একটা আঙুল রাখলেন। মুখে ফুটে উঠল সেই বিখ্যাত হাসি। যে-হাসিতে গালে টোল পড়ত। মা বললেন, খোকা, তোর বাবাকে যদি নিয়ে যাই তোর খুব অসুবিধে হবে? আমি ধড়মড় করে উঠে বসে বললুম, সে কী বলছ মা? মা বললেন, তুই তো বড় হয়েছিস। আমার যে বড় একা লাগছে! আমি ভীষণ জোরে না বলে উঠলুম। অনেকটা ধমকের সুরে। মা যেন আমার শত্রু। এত জোরে না বললুম যে ঘুম ভেঙে গেল। তখনও ভোর হয়নি। রাত তিনটে। ঘর অন্ধকার। ঘড়ি যেন অশরীরীর ভয়ে ঠকঠক করছে। মনে এমন একটা ভয় হল! পাশবালিশটাকে মা বলে আঁকড়ে ধরলুম। মনে হল জাহাজ-ভাঙা নিঃসঙ্গ নাবিক অন্ধকার আকাশের তলায় উত্তাল সমুদ্রে মোচার খোলার মতো ভেসে চলেছে। মৃত্যু সুনিশ্চিত। যতক্ষণ ভেসে থাকা যায়।
