তিন দিনের জন্যে এসেছি। উঠেছি বালিগঞ্জে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। চল না, ওই রয়ালে গিয়ে একটু বসি। জবার ভীষণ চাপ খাবার ইচ্ছে। জানিস তো এইসময় মেয়েদের নানারকম খাবার ইচ্ছে হয়।
জবা সুখেনের সুটকেস ধরা ডান হাতটা আদর করে খামচে দিল। রাস্তার দিকে মুখ নিচু করে বললে, অসভ্য!
আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে, বিশাল সুটকেস হাতে নিয়ে সুখেন এগিয়ে চলল রয়ালের দিকে। বউকে আজ চাপ খাওয়াবেই রুমালি রুটি দিয়ে। জবা আমার পাশে পাশে ধীরে ধীরে হাঁটছে। শরীরের আয়তন বেড়েছে। আইবুড়ো বেলায় জবার একটা রিপু খুব প্রবল ছিল। সুখেনের হাতে পড়ে ভালই হয়েছে। মা হলে মনটা ঘুরে যাবে। ট্রামলাইন পার হবার সময় আমার একটা হাত জড়িয়ে ধরল। চারপাশে লোকজন, যানবাহন, বেচারার ভয় করছে। হাতের তালু বেশ গরম। রক্ত এখনও শীতল হয়নি।
রয়ালের বাইরে বিশাল একটা উনুন। কাঠকয়লার আগুনের ওপর বিশাল এক কানা-উঁচু পাত্রে ঘি আর মশলায় জরোজরো নিখুঁত সব মাংসের টুকরো। মৃদু আঁচে পুটপুট করে ফুটছে মানুষের রসনার সুখখণ্ড। আতরের ভুরভুরে গন্ধ। সুখেনের পেছন পেছন সিঁড়ির ধাপ ভাঙছে জবা। সিল্কের আবরণে শরীর টানটান। জবার দেহ সবসময়েই যেন গলা ছেড়ে চিৎকার করছে, আমাকে দেখো, আমাকে দেখো। অপর্ণার সঙ্গে কনকের সঙ্গে এই তফাত। মুকুর সঙ্গে কিছুটা মেলে। আমার মনে হয় মনের আকারের সঙ্গে মানুষের দেহের মিল থেকে যায়। মন অনুসারে দেহ সূক্ষ্ম হয়, স্থূল হয়।
ধপ করে টেবিলে একটা মেনু ফেলে দিয়ে গেল। এপাশে ওপাশে যাঁরা আহারে বসেছেন, সকলেরই চেহারা যেন কেমন কেমন। পাশবিক মানুষ দেখলেই যেন চেনা যায়। মাংস, মদ, মেয়েছেলে, সব নিয়ে একটা হাঁসফাস অবস্থা। দাঁতে মাংস ছিঁড়ছে। গজর গজর বকছে। হ্যাঁ হ্যাঁ। করে হাসছে। গলগল ঘামছে। ঢুকে পড়ে বিপদ করেছি। ভেতরটা পালাই পালাই করছে।
জবা মেনু থেকে চোখ তুলে বললে, সবকিছুর বড্ড দাম যে গো! কী করবে?
সুখেন আর আমি পাশাপাশি। জবা আমাদের উলটো দিকে। টেবিলে দু’কনুইয়ের ভর রেখে সামনে ঝুঁকে আছে। এতক্ষণ লক্ষ করিনি, হাতে লাল সুতো দিয়ে একটা মাদুলি পরেছে। ব্লাউজের হাতা কুঁড়ে লাল সুতোর ছোট্ট একটি অংশ বেরিয়ে এসে দোল খাচ্ছে। তেল চুকচুকে কপালে দিগন্তে লাল সূর্যের মতো গোল একটা সিঁদুরের টিপ।
সুখেন অসহায়ের মতো বললে, কী করবে তা হলে, অন্য কোথাও যাবে?
সুখেন বউয়ের হাতে নিজেকে একেবারে সমর্পণ করে দিয়ে বসে আছে। উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। আমি বললুম, আপনি দামের জন্যে ভাবছেন কেন? যা প্রাণ চায় খেয়ে যান। আজ আমি আপনাদের খাওয়াব।
সুখেন বললে, তুই আপনি বলছিস কী রে?
তাতে কী হয়েছে! আমি চট করে কাউকে তুমি বলতে পারি না। নিন খাবার সিলেক্ট করে অর্ডার দিন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
তুই খাওয়াবি? চাকরি পেয়েছিস?
হ্যাঁ রে।
সুখেন বললে, তবে আর কী? চালাও চাপ, চালাও তন্দুর।
পরের পয়সায় খেতে তোমার লজ্জা করবে না।
না, বন্ধুর পয়সায় আবার লজ্জা কীসের! তুমি জানো, আমার সব প্রেমপত্তর পিন্টু লিখে দিত? কী ল্যাঙ্গোয়েজ! তুমি অমনি কৃষ্ণের বাঁশি-শোনা রাধিকার মতো নেচে নেচে চলে এলে।
ও যে তোমার ভাষা নয়, তোমার লেখা নয় আমি জানতুম।
অর্ডার নিয়ে দোকানের কর্মচারী গম্ভীর মুখে চলে গেল। আমরা সামান্য পাতি খদ্দের। টেবিলে টেবিলে খাবার ব্যভিচার চলেছে। ঝক ঝক পায়রার মতো ফড়ফড় করে নোট উড়ছে।
জবা বললে, এবার তা হলে একটা বিয়ে করে ফেলুন। না, করে ফেলেছেন?
না, করিনি।
সেই মেয়েটি এখনও আছে? খুব সুন্দরী।
না, তারা চলে গেছে।
সেই শাড়িটার খোঁজ করেনি?
শাড়ি! কোন শাড়ি?
পাঁচিল টপকে এসে, আপনার হাত থেকে যে শাড়িটা নিয়ে পরে আমি চম্পট দিয়েছিলুম। মনে পড়ছে?
ও হ্যাঁ, না সেটার খোঁজ পড়েনি।
শাড়িটা আর নেই জানেন! চুরি হয়ে গেছে। আমাদের ওখানে যে কী চুরি হয়!
আমাদের নাকের পাশ দিয়ে খাবার এসে টেবিলে নামল। দারুণ মোগলাই গন্ধ বেরোল। জিবে আধপোয়া জল। খাবারের প্লেট টানতে গিয়ে হাত যেন অবশ হয়ে এল। এ আমি কী করছি! পিতা হাসপাতালে, মাতামহ অসুস্থ। আমার সামনে মোগলাই খানা। তার সামনে পরস্ত্রী। মাঝে মাঝে। আড়চোখে তাকাচ্ছি। এর চেয়ে স্বার্থপরতা আর কী হতে পারে? এখন আর উপায় নেই। নাচতে এসে ঘোমটা টানা চলে না।
আপনি আমার থেকে একটু মাংস আর ঝোল নিন।
বাটি-ধরা হাত জবার দিকে এগিয়ে গেল। সে না না, এ কী করছেন, এ কী করছেন, বলে দু’হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল। শূন্যে চারটি হাত আর পোর্সিলিনের বাটি ঝুলে রইল।
হাত ছাড়ুন, আপনার শাড়িতে পড়ে যাবে। আমি এতটা খেতে পারব না।
সুখেন বললে, দিচ্ছে যখন নিয়ে নাও। অনেকক্ষণ থেকে বলছিলে খিদে পেয়েছে।
তা বলে মরব নাকি!
মরবে কেন? তুমি তো এখন দু’জন।
জবা হাত ছেড়ে লজ্জায় মুখ নিচু করল। একটা তন্দুর, একটা ঝোল, এই আমার পক্ষে যথেষ্ট। নিঃশব্দে আহার পর্ব চলেছে। জবা মাঝে মাঝে হুসহাস করছে একটু-আধটু। গর্ভবতী রমণীর আহারের একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। রয়াল বেঁধেছেও খাসা। যে-দেহে নতুন একটি প্রাণ আসছে, সেই দেহের জিভ এমন জিনিসই পছন্দ করবে। সামান্য ঝাল লেগেছে। চোখমুখ কেমন যেন বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। মৃদু মৃদু হাসছে। অন্যকে খাওয়ানোর এত যে তৃপ্তি, আগে কখনও বুঝিনি। তৃপ্তি মানুষের মুখকে দেবীর মুখের মতো করে তোলে। কী থেকে মানুষের মনে কী ভাব এসে যায়! হঠাৎ মনে হল, আমি যখন গর্ভে ছিলুম আমার মা-ও হয়তো এইভাবে সাধ খেয়েছিলেন। এমনি আগ্রহ নিয়ে, লাল একটি শাড়ি পরে। আজ আর আমার সে দৃষ্টি নেই, যে-দৃষ্টিতে ছাদের ফুলগাছের টবের আড়ালে থেকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখতুম। অনেকদিন আগে। গা তখন শিরশির করে উঠত। মনে কুভাব আসত। মনটা বড় উৎফুল্ল হয়ে উঠল, এতদিনে, এতদিনে তা হলে মহিলাকে মা ভাবতে পেরেছি।
