খুব কষ্ট হচ্ছে?
তা তো একটু হবেই। সহ্য করতে হবে। উপায় নেই। একে কী বলে জানো, পিউরিফিকেশন অফ সোল। সুখে থাকলে মানুষ দেহযন্ত্রকে ভুলে যায়। এই যন্ত্রণায় আমি সব অনুভব করতে পারছি, হার্ট, লাংস, ফ্যারিংস, ল্যারিংস, স্ক্রিন, কিউটিস। চামড়ার আচ্ছাদনে একগাদা সেনসিটিভ যন্ত্রপাতি। হোয়্যার ইজ দি সোল? কোথায় সেই আত্মপুরুষ!
আমারও খুব জানার ইচ্ছে। হয়তো তিনি জানতে পেরেছেন। অসীম আগ্রহে বললুম, কোথায়?
নীচের দিকে নেই। হি মাস্ট বি সামহোয়্যার অ্যাট দি টপ। হি স্পিকস। আমারই কণ্ঠস্বর ধার করে তার প্রশ্ন, তার উত্তর। দেহবিদ খুঁজে পাবে না। খাঁচা খুললেই পাখি ঠিক উড়ে যায়। না, আর কথা বলব না। বেশ কষ্ট হচ্ছে। লেট মি সাফার অ্যালোন ইন সাইলেন্স।
হঠাৎ এমন দুর্ঘটনা ঘটল কেন? আপনি বলেছিলেন, অন্যায় আর পাপের পাথরে ধাক্কা না খেলে,
জীবন তরতর করে স্রোতের টানে এগিয়ে যায়।
হ্যাঁ তা ঠিক। পাপের সূক্ষ্ম কাঁটা বড় সেনসিটিভ, চিন্তাতেও নড়ে ওঠে। আমি তো দেবতা নই, আমিও মানুষ। আমার লোভ আছে, লালসা আছে, হিংসা আছে, অন্যের অনিষ্ট চিন্তা আছে, কত কী আছে! মাছের আঁশটে গন্ধ আতরে ধুলেও কি যায় রে বাবা! অরক্ষিত মন পথের পাশে দরজা খোলা ঘরের মতো। কখন কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে। অবারিত ব্যাপার। কতবার ধাক্কা খেতে খেতে, সাজা পেতে পেতে তবে মানুষ একটু মানুষ হয়।
আজ আমি এখানেই থাকি।
না না, তার কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু শুধু তুমি কেন কষ্ট করবে? আমি এখন প্রোফেশনালদের হাতে। তারাই হ্যাঁন্ডেল করবেন। তা ছাড়া যন্ত্রণা নির্জনে সাফার করতেই ভাল। লাগে। তোমার ওপর একজন বৃদ্ধ মানুষের দায়িত্ব রয়েছে। তার ব্যাপার আরও সিরিয়াস।
আপনাকে একা ছেড়ে যেতে ভীষণ খারাপ লাগছে। বাড়ি একেবারে খাঁখাঁ করছে। একা আমি থাকব কী করে? আপনার বিছানা শূন্য পড়ে থাকবে। ঘরে রাতের টেবিল ল্যাম্প জ্বলবে না। খাবার আসন পড়বে না।
উপায় নেই, বাবা। পৃথিবীটাই এইরকম। কেউ হাসপাতালে যায়, কেউ বাড়ি যায়, কেউ মারা যায়, কেউ সেজেগুঁজে বিবাহ করতে যায়। কেউ জেলে যায়, কেউ বিদেশে যায়। কেউ মন্দিরে যায়, কেউ যায় নাচঘরে। সবই যাওয়া। যার তেমন গতি। রাত হচ্ছে। তুমি এবার এসো। বাড়িতে তোমার ভূমিকা এখন আমার ভূমিকা। আমার অনুপস্থিতি তুমি একটু ফিল করো। আজ যা সাময়িক কাল তা চিরকালের। মন খারাপের কিছু নেই। পুরুষ হও। পৌরুষ আনো। আবার কাল। যে-জায়গাটা পুড়েছে, সে জায়গাটা বড় ভাল হে। হৃৎপদ্মে আগুন জ্বলছে। আচ্ছা, গুড নাইট।
হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে কলুটোলা পেরিয়ে প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো চিৎপুরে চলে এলুম। মানুষ যে-সময় কাছে স্ত্রীকে পেতে চান, সে সময় সন্তান কিছু করতে পারে না। পিতার পাশে এখন আমার মাতার থাকা উচিত ছিল। সন্তান রক্তের অংশ হতে পারে, স্ত্রী হলেন মনের অংশ। আরও কাছের। দুঃখের, সুখের, দেহের। কী জানি, কী হয়!
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। নাখোদা মসজিদের মিনেকরা মিনার সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে। সামনেই বিশাল প্রবেশপথ। হঠাৎ মনে হল আমি এক জাতিস্মর। বহুকাল আগে আমি এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রায়ই যাতায়াত করতৃম। হয়তো রাজা নবকৃষ্ণের আমলে, ভোলা ময়রার কালে। আমার একটা জুড়িগাড়ি ছিল। শ’খানেক বছর আগের আমিকে আমি দেখতে পাচ্ছি। চিকনের পাঞ্জাবি, জরির নাগরা, কানে আতর। অনেক রাত। পিরু মিঞার দোকানে ফিনফিনে রুমালি রুটি উড়ছে। কাবারের গন্ধ ছুটছে। নিকি বাই ঘুরে ঘুরে ঘুঙুর পায়ে নাচছে।
অন্ধ একটি মানুষ সামনে হাত পেতে, লাঠি ঠুকঠুক করে চলেছে। মুখে হাঁকছে, আল্লা দেনেঅলা, আল্লা দেনেঅলা। হঠাৎ ভীষণ দাতা হবার ইচ্ছে হল। পুরো একটি টাকা হাতে ফেলে দিলুম। আর সঙ্গে সঙ্গে ঢক করে একটা শব্দ হল। পেছনেই জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটের বিখ্যাত মাংসর দোকান। বৃহৎ একটি খাসির পেছনের ঠ্যাংটি অস্ত্রের আঘাতে নেমে এল। ত্রিপদ মৃত পশু ঘিনঘিনে চর্বির আস্তরণ নিয়ে পেন্ডুলামের মতো দুলতে লাগল। বলছে, লোভ, লালসা, লালসা, লোভ। উলটো দিকের একটা দোকানে আজও শিককাবাব হচ্ছে, যেমন হত একশো বছর আগে। কেন যে পা আমাকে আজ এদিকে চালিয়ে নিয়ে এল!
আরে কে রে, পিন্টু না?
প্রশ্ন এবং মানুষ দুটোই যেন মাটি খুঁড়ে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে সুখেন আর জবা। সুখেনের হাতে নতুন একটা চামড়ার সুটকেস। চেহারা ভালই ছিল। আরও ভাল হয়েছে। জবার চেহারাতেও চেকনাই এসেছে। দেখলেই বোঝা যায় মা হতে চলেছে।
জবা বললে, আপনি এখানে কী করছেন? কারুর জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন?
দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ আনন্দ হল। কী সুন্দর মানিয়েছে! জবা ফিকে লাল রঙের একটা সিল্কের শাড়ি পরেছে। আগেকার সেই চঞ্চল স্বভাব আর নেই। বললুম, না, কারুর জন্যেই দাঁড়িয়ে নেই। বাড়ি ফিরছি।
সুখেন বললে, এ পথে কেন?
এসেছিলুম মেডিকেল কলেজে। কী মনে হল, হাঁটতে হাঁটতে এলুম এদিকে।
হাসপাতালে আবার কী হল?
সুখেনকে সংক্ষেপে সব বললুম। জবা বললে, আপনার তা হলে খুব বিপদ যাচ্ছে।
সুখেন বললে, তোর খুব তাড়া আছে?
তাড়া মানে, যত তাড়াতাড়ি ফেরা যায় ততই ভাল। তোরা কবে এলি, কোথায় আছিস?
