কী বললেন? কী হয়েছে বটঠাকুরের?
কাকিমা জলপায়ে ঘরে এলেন।
অ্যাসিডে পুড়ে গেছে। হাসপাতালে আছে। যে-জাহাজে চেপে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলুম সেই জাহাজ বুঝি এবার ডুবে যায় বউমা! সবই এই বুড়োর ভাগ্য। সুখ সইবে কেন? গাছতলায় যার আস্তানা, রাজপ্রাসাদে সে কি থাকতে পারে! আগুন লাগবেই।
আপনি এত উতলা হচ্ছেন কেন দাদু? সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি যে ঘরপোড়া গোরু।
কাকিমা বললেন, একটু দাঁড়ান, আমিও যাব।
আজ আর আপনাদের কাউকেই যেতে হবে না। আমি যাই। দু-একটা প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে আসি।
তুমি কি ভাবছ আমি মরে গেছি? অথর্ব হয়ে গেছি! তুমি জানো না, আমি সকলকে মেরে তবে যাব। আমার পালা আসবে সব শেষে। আমি এক লোভী, ভোগী পুরুষ। জীবনে অনেক অপরাধ করেছি। তার প্রায়শ্চিত্ত করে আমাকে যেতে হবে সব শেষে। বেটি, তুই হরিশঙ্করের দিকে হাত বাড়ালি কেন? অবিচার তোর আগাগোড়া। ভবে এসে খেলব পাশা, বড়ই আশা মনে ছিল। মিছে আশ ভাঙা দশা, প্রথমে পঞ্জুড়ি পালা ॥ পো-বারো আঠারো ষোলো, যুগে যুগে এলেম ভাল। শেষে কচে-বারো পেয়ে মাগো, পাঞ্জা ছক্কায় বদ্ধ হল ॥
কাকিমা অবাক হয়ে মাতামহকে দেখছেন। আমিও এমন মূর্তি কখনও দেখিনি। দু’গাল বেয়ে। জলের ধারা নামছে। সংসার-সমরাঙ্গনে পরাজিত নৃপতি আধ্যাত্মিক শক্তিতে ভর করে উঠে। দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন।
কাকিমা এগিয়ে গিয়ে মাতামহের হাতদুটো ধরে ফেললেন। শুধুমাত্র একটি শাড়ি একটু উঁচু করে পাক দিয়ে পরে আছেন। গায়ে জামা নেই। গা ধুতে ধুতে উঠে এসেছেন। উপায় ছিল না এর চেয়ে পরিপাটি হয়ে আসার। ইনি যেন আমার মাতামহের আর এক কন্যা।
হাত ধরে বিছানার দিকে নিয়ে যেতে যেতে কাকিমা বলছেন, বাবা, শান্ত হন। শান্ত হন, আপনার শরীর ভাল নেই। টলছেন। পড়ে যাবেন।
দু’জনে ধরাধরি করে বৃদ্ধ মানুষটিকে বিছানায় বসিয়ে দিলুম। কাকিমা প্রায় জড়িয়ে ধরে আছেন। নিয়তি নামক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে অভিমানের তরোয়াল খুলে বারেবারে যুদ্ধে নামার চেষ্টা। অপরাজেয়কে যে পরাজিত করা যায় না! কে বোঝাবে সে কথা এই অভিমানী মানুষটিকে! মানুষ যদি বোকার মতো কষ্ট পায় কিছু করার আছে? সংসার থেকে শুধুমাত্র আনন্দের অংশটি তুলে নেবার মতো হাঁস কোথায় পাওয়া যাবে। তা হলে তো সকলকেই পরমহংস হতে হয়। এ কি সদলবলে মধুপুরে বায়ু পরিবর্তনে আসা! এলুম একসঙ্গে, ফিরে গেলুম একসঙ্গে। অদৃশ্য মৃত্যুপুরুষ আমাদের প্রত্যেকের কাঁধে হাত রেখে বন্ধুর মতো পাশে পাশে হেঁটে চলেছে। কখন কোন সময় সে হঠাৎ গতি থামিয়ে দিয়ে বলবে, চলো, এবার তোমার ফেরার সময় হয়েছে, কেউ জানে না। সেই মহা অভিভাবকের অবাধ্য হবার ক্ষমতা কারুর নেই। মানুষের বৃথা এই আস্ফালন। আসলে মৃত্যুই। আমাদের মধ্যে জীবিত হয়ে ঘুরছে। আচ্ছা চলি, বলে চলে গেলেই হয়ে গেল।
অতি কষ্টে মাতামহকে শান্ত করা গেল। গুম হয়ে রইলেন বিছানায়। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, আজ আর তা হলে সে ফিরছে না! এই শুন্য বাড়ি। তুমি আর আমি আর বউমা!
যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে আমি আবার হাসপাতালে ফিরে গেলুম। দিনের চোখে নিদ্রা নামছে। দু’-একটা আলো জ্বলেছে, তেমন জলুস নেই। পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ছোট্ট একটি কেবিনে শুয়ে আছেন পিতৃদেব। যে-মানুষ সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকেন তাঁর কাছে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে! আমার সঙ্গে খানকয়েক বইও আছে। এইবার সময়টা হয়তো সহজে কাটবে। আমার নিজের একবার অ্যাসিডে হাত পুড়েছিল। সেই সামান্য পোড়ার যন্ত্রণায় আমি এক রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। বুকের অনেকখানি জায়গা পুড়েছে। যন্ত্রণার তীব্রতা অনুমান করতে পারছি। যন্ত্রণার অংশীদার হওয়া যায় না। আনন্দ হয়তো ভাগ করে নেওয়া যায়। কষ্ট মানুষকে একাই ভোগ করতে হয়।
ঘরে আমিও ঢুকলুম, একজন সিস্টারও ঢুকলেন। খুবই কম বয়েস। ধড়াচূড়া খুলে ফেললে মনে হতে পারে আমার বোন। মুখে একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্যের আবরণ। আমার হাত থেকে জিনিসপত্র একে একে বুঝে নিলেন। তোয়ালে, সাবান, কাপড়, ঢোলা জামা। চা আনতে বলেছিলেন, এক প্যাকেট ভাল চা। চিনির কিউব। কাপ ডিশ, চামচে, গেলাস, কেটলি, ছাকনি। ঝোলা থেকে একের পর এক জিনিস বেরুচ্ছে। যতটা সম্ভব বাড়ির পরিবেশে রাখার চেষ্টা। সে কি আর সম্ভব হবে? হাসপাতালও এক কারাগার, অসুখের কারাগার।
কেবিনের বাইরে উঁকি মেরে সিস্টার কাকে যেন ডাকলেন, সুখী, সুখী।
সাধারণ শাড়ি পরা এক মহিলা টুল থেকে উঠে এলেন। সিস্টার বললেন, প্রায় সবকিছুই এসে গেছে। বুঝে নাও। এঁর যখন যা দরকার হয়, কান খাড়া রাখবে, উঠে এসে দেবে। বসে বসে ঘুমিয়ে পোড়ো না যেন।
সিস্টার নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন। হাইহিল জুতোর খুটখুট শব্দ চওড়া করিডরে দূর থেকে দূরে হারিয়ে গেল। মিষ্টি চেহারার শ্যামবর্ণা সুখী আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে টুলে গিয়ে বসল। সাদা ডোমে ঢাকা একটা ভুতুড়ে আলো দরজার সামনে কুয়াশার আঁচল পেতেছে।
পিতা ডাকলেন, এদিকে এসো।
কণ্ঠস্বর একেবারে পালটে গেছে। পুরনো টিন দিয়ে রেকর্ড বাজালে যেরকম হয়, সেইরকম খসখসে।
আপনার গলাটা এইরকম হয়ে গেল কেন?
ভোকাল কর্ড বেশ খানিকটা অ্যাসিড সোক করে ফেলেছে। ভেতরের মিউকাস মেমব্রেন অ্যাফেক্টেড। কথা বলতে গেলে বেশ লাগছে।
