ইঞ্জেকশনের শিশির রবার ছ্যাঁদা করে জল ভরতে ভরতে সিস্টার বললেন, ইয়োর রেস্টলেসনেস উইল বি কস্টলি ফর মি। মাইন্ড ইট।
পিতা বললেন, আই অ্যাম সরি।
ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন। এ যেন কলেজ রিইউনিয়ন। চার বন্ধুর সঙ্গমে আমি এক উত্তরপুরুষ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি। ওপাশে দন্তুর জীবনের আক্রমণে শতছিন্ন প্রাণের আর্তনাদ, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জীবনমৃত্যুর সাপে নেউলে খেলা, এদিকে অতীতে বর্তমানে মহামিলন।
এম ডি বললেন, তড়িৎ, দাড়িটাড়ি রেখে কী হয়েছিস! র্যাসপুটিনের মতো চেহারা করেছিস।
ডাক্তার বললেন, তোর চেহারার মধ্যে একটা মুখ্যমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী ভাব এসেছে রে। পশ্চিমবাংলার নাম্বার ওয়ান শিল্পপতি।
পিতা বললেন, বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। উপায় নেই। থাইমলের দাগ লেগে যাবে।
সিস্টার পুট করে ওপর বাহুতে উঁচ ফুটিয়ে দিলেন। হাসিমুখে বললেন, নড়িবেন না, উঁচ ভাঙিলে বন্ধুগণ কিছুই করিতে পারিবেন না।
এতক্ষণ লক্ষ করিনি, পিতৃদেবের ডান চোখের ঠিক নীচে একটা পোড়া দাগ। একোয়ারিজিয়া সাংঘাতিক বস্তু। সোনা গলে যায়। মানুষ তো গলবেই। ওই জায়গাটার দিকে ডাক্তারদের এখনও চোখ পড়েনি।
ডাক্তারবাবু বললেন, একটু চা হোক।
তিনজনে সমস্বরে বললেন, হয়ে যাক। হয়ে যাক।
ওয়ার্ডবয় ছুটলেন চা আনতে। মানুষের বুক বড় নরম জায়গা, সেখানে গরম হাইড্রোক্লোরিক আর নাইট্রিকের মিশ্রণ কী ক্ষতি করতে পারে ডাক্তার না হলেও আমার জানা আছে। শুধুমাত্র অসম্ভব মনের জোরে মানুষটি স্থির হয়ে বসে আছেন। ছাত্রজীবনের বন্ধুদের সঙ্গে মাপা রসিকতা করে যাচ্ছেন।
চা শেষ করে ডাক্তারবাবু বললেন, নাও চলো, তোমাকে ভি আই পি কেবিনে পুরে দিয়ে আসি। আমাদের সেবাযত্নে দিনকতক থাকো।
তার মানে? তুমি আমাকে হাসপাতালে ভরে রাখবে? আমার দুঃস্বপ্নেও এমন সম্ভাবনা দেখিনি। এমন আহামরি কিছু হয়নি যে হাসপাতালে পড়ে থাকতে হবে।
এম ডি বললেন, বার্নকেসে সেবাযত্নের প্রয়োজন। টোয়েন্টি ফোর আওয়ারস্ সাফারিং। তুমিও কেমিস্ট্রি আমিও কেমিস্ট্রি। কীসে কী হয় ভালই জানিস। গোঁয়ারতুমি করিসনি।
আমার থাকার উপায় নেই।
পঙ্কজবাবু বললেন, ছেলের কথা ভাবছিস?
শুধু ছেলে কেন? শ্বশুরমশাই অসুস্থ। আমার ভরসায় এখানে আছেন।
পঙ্কজবাবু বললেন, তোমার বাড়ির দায়িত্ব আমি নিচ্ছি।
পিতা চেয়ার থেকে পা নামিয়ে জুতো খুঁজতে লাগলেন। তার মানে জুতো পরেই দৌড় মারবেন। কারুর ক্ষমতা নেই ধরে রাখে।
ডাক্তারবাবু উঠে এসে বললেন, হরি, নাউ আয় অ্যাম সিরিয়াস। এখন আর আমি তোর বন্ধু নই, ডাক্তার। জীবন নিয়ে খেলতে গিয়ে মৃত্যুকে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। আমরা মৃত্যুর শত্রু। গেট আপ। তোমার ব্যাপারটাকে খুব সামান্য ভেবো না। পোড়ার ডিগ্রি আছে জানো! এটা তোমার কেমিস্ট্রি নয়। গেট আপ।
অসহায় মুখে পিতা উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছুদিনের জন্যে নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন হয়ে গেলুম। সামলাতে পারবে তো?
সেই সতীমার হাসি শুনতে পেলুম। গঙ্গার ঘাট ভেঙে ভেঙে উঠছেন আর বলছেন, ওই দেখ তোর পথ। ফণীমনসার ঝোঁপের পাশ দিয়ে চলে গেছে অন্ধকারের দিগন্তে। জীবনের কাছ থেকে কিছু আশা করিসনি।
১.৫৭ আব ইয়ে সমঝ্মে জফরকি আয়া
নিখুঁত পরিপাটি বিছানায় মাতামহ বসে আছেন। চাঁদরের ওপর ধূসর একটি কম্বল বিছানো। হাতে একটি বহুকালের পুরনো কীটদষ্ট বই। বইটি সামনে খুলে ধরে মাতামহ একেবারে তন্ময় হয়ে গেছেন। পোকায় ফুটো ফুটো করে দিয়েছে। সমস্ত পাতা পাঁপড়ভাজার মতো মচমচে। দূর থেকে দেখছি, যেন ধ্যানস্থ মহাদেব।
আমার পদশব্দে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন। চোখদুটি আরক্ত। জলে ছলছল করছে। মৃদু একটি হাসি ঠোঁটের কোণে নেমে এল। আমি জানি। আমি আজ এসেছি সব হাসি শুষে নেবার ব্লটিং পেপার হয়ে। যে-সংবাদ বুকে চেপে রেখেছি, সে সংবাদ যেই লাফ মেরে নেমে আসবে, বজ্রপতনের মতো আতঙ্ক ছড়াবে।
মাতামহ বললেন, এসো লর্ড, তোমাকে আজ যেন একটু কমজোর মনে হচ্ছে। তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল বুঝি?
তাড়াতাড়ি চলে আসতে হল। বাবার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
অ্যাঁ, কী বললে? হরিশঙ্করের…!
মাতামহের হাত থেকে বইটি বিছানার ওপর খসে পড়ে গেল।
আজ্ঞে হ্যাঁ, পুড়ে গেছেন।
পুড়ে গেছে? ও তো পুড়েই আছে। আবার নতুন করে কী পুড়বে? এখনও কি ব্রহ্মময়ী হয়নি তোর মনের মতো? আরও পোড়াবে!
অ্যাসিডে বুক আর মুখের একটু পুড়ে গেছে।
তাকে কোথায় রেখে এলে?
হাসপাতালে। মেডিকেল কলেজে।
আমি যাব। আমি এখুনি যাব। সে এখন কেমন আছে? কথা বলছে? হাসছে?
হ্যাঁ, কথা বলছেন।
তা হলে? ফিরে আসবে তো? না, সবাই যেভাবে চলে গেল, সেইভাবে চলে যাবে? অ্যাসিড নিয়ে সে কী করছিল? জানে না অ্যাসিডে মানুষ পুড়ে যায়? এত জানে, এই সামান্য জিনিসটুকু জানে না!
মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। পা দুটো বেশ তপতপে ফুলে আছে। মুখটা আজ বড় বেশি ফরসা দেখাচ্ছে। শরীরের রক্তস্রোতে ক্রমশই মনে হয় ভাটা পড়ে আসছে।
বউমা! মাতামহ গর্জন করে উঠলেন।
নীচের কলতলা থেকে কাকিমার গলা ভেসে এল, যাই বাবা।
আমার জামাকাপড় দাও।
আঁচলে হাত মুছতে মুছতে কাকিমা দরজার বাইরে থেকে উঁকি মারলেন।
আমার জামাকাপড় দাও। জানো না কী হয়েছে? হরিশঙ্কর পুড়ে গেছে।
