এম ডি কী করছেন, কী বলছেন, দেখেও দেখছি না, শুনেও শুনছি না। কেমন যেন ভোরের কুয়াশার ভেতর বসে আছি। শীতের সকালে ময়দানের ছবির মতো।
ধীরে ধীরে গাড়িতে এসে বসলুম। এম ডি আমার পাশে বসলেন। একটু আগে সাফল্যের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছিলুম। ভবিষ্যৎ উড়ে আসছিল বার্ডস অফ প্যারাডাইসের মতো রঙিন পাখা মেলে। আশঙ্কায় মন আর কোনও কাজ করছে না। স্থির হয়ে গেছে। দু’পাশ দিয়ে দৃশ্য ছুটে চলেছে। দেখেও দেখছি না।
এম ডি একবার শুধু বললেন, ঘটনার ওপর মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, পলাশ। যখন যা ঘটার তখন তা ঘটবেই। আমরা শুধু দর্শক। তুমি অত মুষড়ে পোড় না। তুমিই না সকালে আমাকে গেয়ে শোনালে, কত ডুববে উঠবে জীবন তরী। চঞ্চলতা এনো নাকো। এই তো তার হাতেনাতে পরীক্ষা।
মানুষ কী মন নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের দিকে যায় আমার জানা নেই। আমার এই মুহূর্তের মনের। অবস্থা দেখে হয়তো কিছুটা অনুমান করা যায়।
মেডিকেল কলেজের বিশাল চত্বরে গাড়ি এসে ঢুকল। এপাশে-ওপাশে এক-একটা ব্লক ইটের দৈত্যের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত নিচু একটা সিঁড়ি দু’পাশ দিয়ে একটা চাপা বারান্দা মতো জায়গায় উঠে গেছে। বড় বড় অক্ষরে লেখা, ব্লাডব্যাঙ্ক। পাশেই এমার্জেন্সি। সামনেই পঁড়িয়ে আছেন পঙ্কজবাবু। আমাদেরই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, অথচ আমাদের দেখতে পাচ্ছেন না। এম ডি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চমকে উঠলেন
এ কী? আপনি? না, না তুমি।
হ্যাঁ, আমি। ছেলেটাকে একা ছাড়ি কী করে? ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছে। কী অবস্থা? মারাত্মক কিছু?
তেমন মারাত্মক নয়। তবে হতে পারত। ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তেমন হলে চোখদুটো যেত।
ও তো একজন নামকরা পাকা কেমিস্ট। কী করে কী হল?
আর বোলো না, এক জুনিয়ারের কীর্তি। কীসে কী হয় ধারণাই নেই। একোয়ারিজিয়া দিয়ে কী একটা করছিল, ফ্লেম কন্ট্রোল করতে পারেনি। এক টেস্টটিউব মাল ছিটকে বুকে এসে পড়েছে। গেঞ্জিতে সোক করে, খুলে ফেলতে ফেলতেই ড্যামেজ হ্যাঁজ বিন ডান।
ডাক্তার অ্যাটেন্ড করেছেন?
হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গে। ভাগ্য ভাল, এমার্জেন্সিতে আজ তড়িৎ আছে।
তড়িৎ! আমাদের সেই তড়িৎ! যে বলত সাধু হয়ে সংসার ত্যাগ করব!
এখনও সেই ভাবই আছে। সুযোগ খুঁজছে। সংসারে একমাত্র বন্ধন মা। বুড়ি গেলে ওকে ধরে রাখা শক্ত।
চলো তা হলে, আমাদের বীর সৈনিককে এবার দেখে আসি। আজ ছাড়বে, না রেখে দেবে?
পড়েছে তড়িতের হাতে। সহজে নিষ্কৃতি পাবে বলে মনে হয় না।
যেতে যেতে পঙ্কজবাবু বললেন, ঘাবড়াবার কিছু নেই। স্কিনটা সামান্য পুড়ে গেছে। দিন পনেরোর মধ্যেই ঠিক হয়ে গেছে দেখবে। শুনলুম, তোমার মাতামহ ভীষণ অসুস্থ।
আজ্ঞে হ্যাঁ, বেশ ভালই অসুস্থ।
হরি সেইসব কথাই বলছিল, এমন সময় ওই কেয়ারলেস কেমিস্ট, সবই মানুষের নিয়তি! কার যে কখন কী হয়!
এমার্জেন্সিতে ঢুকতেই মাথা ঘুরে গেল। দিন আর কতটাই বা গড়িয়েছে, এর মধ্যেই আশেপাশে কত কী ঘটে গেছে! ফুটফুটে ডলপুতুলের মতো একটি মেয়ে বাবার সাইকেলের পেছনে বসে ইস্কুলে যাচ্ছিল। স্পোকের মধ্যে পা ঢুকে চুলের বিনুনির মতো পাকিয়ে গেছে। মেয়েটির পিতা হায় হায় করছেন, এ আমি কী করলুম, এ আমি কী করলুম।
খুড়ো ভাইপোর মাথায় শাবল ঝেড়ে দিয়েছে। মাথা একেবারে ফুটিফাটা হয়ে গেছে। পাশেই ছেলেটির মা দাঁড়িয়ে আছেন। বোধহয় ছেলেকে জড়িয়ে ধরে এনেছিলেন। রক্তে থানধুতি ভেসে গেছে। সঙ্গে একজন পুরুষ রয়েছেন। ভালমানুষ স্কুল শিক্ষকের মতো নিরীহ চেহারা।
কোনও এক কারখানার কর্মী এসেছেন। মেশিনে হাত ঢুকে ডান হাতের তিনটে আঙুল কেটে ঝুলে পড়েছে। সঙ্গীসাথীরা রক্ত দিতে হবে রক্ত দিতে হবে বলে চিৎকার করছেন।
এক তরুণী শেষরাতে বিষ খেয়ে বসে আছে। পেট থেকে পাম্প করে বিষ বের করার আয়োজ চলছে। মেয়েটির সাংঘাতিক চেহারার শাশুড়ি মাকে শাসাচ্ছেন, কী মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন। কুলটা। নিজে মরছে মরুক, আমার সোনারচাঁদ ছেলেটাকে জেল খাটাবার মতলব!
ডাক্তার আর সাদা পোশাক পরা সিস্টাররা ছুটোছুটি করছেন। সকলকে সামলাবার চেষ্টা করছেন। ছিন্নভিন্ন এক-একটি প্রাণী ওটিতে যাচ্ছেন। কারুর হাত যাবে, পা যাবে, কেউ সেলাইফেঁড়াই হয়ে বেরিয়ে আসবে। কারুর চোখ হয়তো আর খুলবেই না। কাঁদতে কাঁদতে এসে হাসতে হাসতে চলে যাবেন।
কেমন যেন দিশাহারা হয়ে যাবার মতো অবস্থা। এই কুরুক্ষেত্রের কোথাও আমার পিতৃদেব নেই। তিনি বসে আছেন ভেতরের একটি বিশেষ ঘরে। উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। পদ্মাসনে যেন ধ্যানে বসেছেন। বুকে হলদে মলমের প্রলেপ। ডানা মেলে হলুদ রঙের একটি হাঁস যেন উড়ে চলেছে। সুন্দর চেহারার অবাঙালি একজন সিস্টার তার পরিচর্যায় ব্যস্ত। কিছুদূরে বসে আছেন ডাক্তারবাবু। তিনি নানারকম নির্দেশ দিচ্ছেন।
আমাদের দেখে পিতৃদেব উঠে দাঁড়াতে গেলেন। সিস্টার মৃদু ধমক দিলেন, ডোন্ট মুভ, ডোন্ট মুভ। আই হ্যাভ নট ফিনিল্ড ইয়েট।
ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে ডিসটিল্ড ওয়াটার ভরতে ভরতে তিনি আমাদের দিকে ভুরু তুলে তাকালেন।
প্রথমে কথা বললেন এম ডি, কী রে, চিনতে পারিস?
পিতা দু’হাত তুলে বললেন, হ্যালো, মাই ওল্ড ফ্রেন্ড!
হাত তোলার ফলে বুকে বোধহয় টান পড়ল। যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মুখে ফুটে উঠতে গিয়েও উঠল না। হাসির তলায় চাপা পড়ে গেল। একেই বলে পুরুষমানুষ। উত্তরাধিকার সূত্রে সিকির সিকি গুণও যদি পেতুম।
