আজ্ঞে না।
কী দেখেছ তুমি! এবার দেরাদুনে গিয়ে, পাশেই ফরেস্ট, এইসব খুব ভাল করে লক্ষ করবে। পাখি যখন ডাল থেকে উড়তে চায় তখন তার চোখদুটো দেখবে উদাস হয়ে যায়। ডানাদুটো বারকতক খুলব কি খুলব না করে, তারপর কীসের তাগিদে ঝপ করে উড়ে চলে যায়। আচ্ছা যে কারণে তোমাকে ডেকেছি, গেট রেডি ফর দেরাদুন। তোমার শীতের ভাল পোশাক আছে?
আজ্ঞে না, করাতে হবে।
আজকালের মধ্যে অর্ডার দিয়ে দাও। শীত আসছে। ওখানে ভীষণ ঠান্ডা পড়ে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কী করাবে?
একটা গলাবন্ধ কোট।
শুধু ওপরের দিকটা ভাবলেই হবে না, তলার দিকটাও ভাবো। আমরা কী বলি? শীত করে, শীত পায়। তার মানে? করে মানে হাতে, পায় মানে পায়ের পাতায়। একটা গরম সুট করাও। টাকা চাই?
আজ্ঞে না।
না কেন?
আছে। দরকার হলে বলব।
না, তোমাকে আমি উপহার দোব। এই এমপ্লয়ার-এমপ্লয়ি সম্পর্কটা ভাঙতে হবে। ওপন্ আপ মাই ডিয়ার বয়, ওপন আপ। আমি আমাদের ট্রাভেল এজেন্টকে বলে দিচ্ছি, সামনের সপ্তাহে তোমাদের জন্যে দুন এক্সপ্রেসে টিকিট বুক করুক। শুক্রবার ভাল বার। রবিবার সকালে পৌঁছে যাবে। এখনও যথেষ্ট সময় আছে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
আমি তা হলে এখন আসি। একটা কাজ চাপিয়ে এসেছি।
হ্যাঁ যাও। তিনটের সময় তোমাকে নিয়ে আমি টেলারের কাছে যাব। সেইভাবে নিজেকে ফ্রি করে নিয়ো।
দুটো ব্লকের মাঝখানের ঝোলা বারান্দা দিয়ে আসতে আসতে আমার একটা কথাই কেবল মনে হচ্ছিল, সওদাগরি অফিসের ওপরঅলারা কর্মচারীদের সঙ্গে সাধারণত খুব একটা ভাল ব্যবহার করেন না। আমার বরাতে এ কী জুটছে! ঈশ্বরেরও তা হলে করুণা হয়। একসঙ্গে সব দিক শুকিয়ে দেন না। নীলকণ্ঠের গানের মতো, এক কূল নদী ভাঙে নিরবধি আবার অন্য কূলে তমকূলে সাজায়। বহু দূরে কোথায় কে জানে, তিনি বসে আছেন রত্নখচিত সিংহাসনে। তার জানলায় সোনার গরাদ। আয়ত দুটি চোখ পড়ে আছে জীবজগতের দিকে। সবই দেখছেন। দেখেছেন, জীবনের ভাণ্ডার থেকে এ ছেলেটা তো কিছু পায়নি। যা ধরতে গেছে, সবই পালিয়েছে হাত ফসকে। একে কিছু দেওয়া যাক। একটু স্নেহ, দুটো ভাল কথা। যা পাওয়া যায়! যা আসে, আসুক সেই অপার করুণাময়ের হাত গলে। যা চাই তা যখন পাই না, যা পাই তা মেনে নেওয়াই ভাল।
ল্যাবরেটরিতে ঘণ্টা দুয়েক চুটিয়ে কাজ করার পর জিনিসটা বাগে এসে গেল। কার ভেতর যে কী অদৃশ্য হয়ে থাকে। চা-বাগানের মেঝে ঝট দেওয়া আবর্জনার মধ্যে কী ঐশ্বর্য! বিকার থেকে সলভেন্ট উড়ে চলে গেছে, পড়ে আছে ধবধবে সাদা মিহি গুঁড়ো, যার নাম কেফিন। দামি একটি ওষুধ। আজ আমার দিনটা খুব ভাল। পিতার এক পুরিয়া চায়নায় মাতামহ আরোগ্যের পথে। এম ডি-কে গান শুনিয়ে খুশি করে দিয়েছি। বিকেলে যাব সুটের মাপ দিতে। চলেছি হিমালয়ের কোলে দেরাদুনে বসবাস করতে। মনে হয় পদোন্নতিও হবে। কেমিস্ট্রিতে হাত পেকেছে। তার হালফিল। প্রমাণ চোখের সামনে, বিকারে। প্রসেসটা কমার্শিয়ালাইজ করতে পারলে, টি-ওয়েস্ট থেকে কেফিন বের করে প্রতিষ্ঠান অনেক টাকা লাভ করবে। আর আমাকে পায় কে! আজ আবার জিমূতবাবু মাংসের কোরমা চাপিয়েছেন। সুগন্ধে সব পাগল হয়ে যাচ্ছেন। আর মিনিট পনেরো পরেই তিনি আসছেন নতুন ভাড়ে সি সি শব্দ ছাড়তে ছাড়তে।
মৃগ যেমন কস্তৃরীর গন্ধে পাগল হয়ে যায়, আমিও তেমনি নিজের অহমিকায় বিভোর। ঘুরতে ঘুরতে ওপরে উঠছি, আবার একটু নীচে নামছি। নিজেই নিজের গলায় বিজয়মাল্য পরাচ্ছি। কাঁধের পাশ থেকে কে বললেন, আপনাকে ডাকছেন।
এম ডি-র পিয়োন। কী ব্যাপার, এর মধ্যে তিনটে বেজে গেল? কই না তো, সবে একটা পনেরো। ভাব আর ভাবনার মাকড়সার জাল থেকে নিজেকে বের করে আনলুম। ঝুলবারান্দা দিয়ে যেতে যেতে নাকে নানারকম গন্ধ এসে লাগল। নীচের ফ্যাক্টরিতে সাবান তৈরি হচ্ছে। সুঁই ফুলের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। হঠাৎ অপর্ণার কথা মনে পড়ে গেল। এমন একটা ব্লাউজ পরেছে, গায়ের রঙের সঙ্গে জামার রং মিলে গেছে। বুকের কাছে ছিলে কাটা সোনার হার দুষ্টু ছেলের মতো চিকমিক করে হাসছে। শরীরের ভেতর কোথাও কোনও একটা কিছু মুচড়ে উঠল। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর ভিজেভিজে বাতাসের মতো সুখের অনুভূতিতে শরীর যেন অবশ হতে চাইছে।
এম ডি মৃদু হেসেই মুখ গম্ভীর করলেন। আমাকে বললেন, বোসা।
বসলুম। টেবিল আর সকালের মতো খালি নেই। কাগজপত্রে ভরে উঠেছে। স্যাম্পল-ভরতি শিশি সারি সারি একপাশে। নীচের সিন্থেটিক ল্যাবরেটরি থেকে ওপরে উঠে এসেছে। এম ডি স্থির চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ঠিক আছ? স্থির আছ তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
নিজের ওপর নিজের কন্ট্রোল আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা হলে, তুমি এখুনি একবার মেডিকেল কলেজে চলে যাও। আমি গাড়ি দিচ্ছি।
মেডিকেল কলেজে কেন?
তুমি এমার্জেন্সিতে যাবে। সেখানে তুমি পঙ্কজকে পাবে। হরিশঙ্করের অফিসের আরও কয়েকজনকে পাবে।
সেখানে তাঁরা কী করছেন?
একদম উতলা হবে না। লাগাম টেনে রাখো। হরির মাইনর একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। ভয়ের কিছু নেই।
হঠাৎ মনে হল আমি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হয়েছি। প্যারাচুটের দড়ি না খুললে প্যারাট্রুপারের মনের অবস্থা যেমন হয়, আমার মনের অবস্থাও সেইরকম হয়ে গেল। আকাশ বেয়ে হুড়মুড় করে। নেমে চলেছি নীচের দিকে। এরই মধ্যে শুনতে পেলুম এম ডি বলছেন, বুঝতে পেরেছি। তোমাকে একা ছাড়া ঠিক হবে না। চলো আমিও তোমার সঙ্গে যাই। অনেকদিন আমার ওল্ড ফ্রেন্ডকে দেখিনি। বহুবার বলেছি, আয় চলে আয়, আমার পাশে এসে দাঁড়া। পশ্চিমবাংলার মাটিতে আচার্য রায়ের স্বপ্ন সফল করি। বোম্বাই আমাদের কান কেটে দিচ্ছে। শুনবে? কারুর কথা শুনবে? ভগবান একটা ষাঁড় তৈরি করতে গিয়ে হরিশঙ্কর করে ফেলেছেন। নিজের মাথার দাম নিজেই বুঝল না। নাও চলো। গেট আপ।
