গাছতলায় কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে জগদম্বার নাম জপ করতুম।
তা হলেই সব হত। হ্যাঁ, কে কোথায় গেলে! মুখ ধুয়ে নিন। খুব লাইট চা আর বিস্কুট খান। তারপর সব ব্যবস্থা করছি। আচ্ছা, জয়কে কি একটা টেলিগ্রাম করা দরকার?
না না, ওকে আর বিরক্ত কোরো না। সত্যি কথা বলব তোমাকে, বিয়ের পর অধিকাংশ ছেলেই। কেমন যেন হাতছাড়া হয়ে যায়!
আঃ, সে তো একটু যাবেই। নান ক্যান হেল্প। বিবাহ একটা রেসপন্সিবিলিটি। ঘরের মধ্যে ঘর।
রাতভোরে পাখি ডাকলে যেমন নতুন দিন আসার আনন্দে মন ভরে যায়, মাতামহর উঠে দাঁড়ানোর আনন্দও অনেকটা সেইরকম। নিবতে নিবতে আবার শিখা জ্বলে উঠেছে।
পিতা বললেন, আমি আজ বাজারে যাচ্ছি। আজকের বাজারে বেশ ঝামেলা আছে। চারামাছ চাই, বরফ চাই, মুড়ি চাই।
বরফ কী করবেন?
সাংঘাতিক একটা টোটকা আবিষ্কার করে ফেলেছি। এক গেলাস জলে এক মুঠো মুড়ি ফেলে, চারপাশে বরফ দিয়ে ঘণ্টাখানেক ফেলে রাখো। তারপর সেই শীতল মুড়ির জল বারেবারে চুমুকে চুমুকে খাওয়াও।
কাল জ্বর হল আজ বরফজল, যদি অন্যরকম কিছু হয়ে যায়!
কী হতে পারে?
যদি নিমোনিয়া হয়, কি ব্রঙ্কাইটিস হয়, তা হলে কী হবে?
তারও ওষুধ আছে। নাও তুমি গোটাকতক ব্যাগ নাও, আর দেরি না করাই ভাল। জ্যান্ত চারামাছ এরপর বাজার থেকে উঠে যাবে।
সকালের বাজারের সে কী শোভা! বেঁচে থাকার আনন্দে চারপাশ টগবগ করছে। বেগুনের বেগুনি, শাকের সবুজ, মাছের রুপোলি তবক, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। বাজার শেষ করে বরফের ডিপোয় গিয়ে মন বড় মিইয়ে গেল। ছোট্ট একটা গহ্বরে থান থান বরফ কাঠের গুঁড়োর বিছানায় শুয়ে আছে। ঘষা কাঁচের মতো চেহারা। আগুন নয়, তবু ধোঁয়া উঠছে। মৃত্যুর শীতল মুখগহ্বর থেকে যেন চিতার ধোঁয়া বেরোচ্ছে হিলহিল করে।
১.৫৬ সুখের কথা বোলো না আর
ম্যানেজিং ডিরেক্টারের ঘরে ডাক পড়ল। আমার ওপর চায়ের ঘাট থেকে কেফিন নিষ্কাশনের ভার পড়েছে। ফ্লাস্কে চায়ের ঘট আর সলভেন্ট ভিজছে। কাজটা খুব একটা দুরূহ নয়, তবে বিপজ্জনক। আগুন আর দাহ্য পদার্থ নিয়ে খেলা। একটু অসাবধান হলেই অগ্নিকাণ্ড। ডাকছেন যখন, যে-অবস্থাতেই থাকি যেতে হবে।
ঘরে ঢুকতেই বললেন, তোমাকে অনেকদিন দেখিনি। কী হয়েছে তোমার? এত বিমর্ষ কেন?
আজ্ঞে, আমার দাদু ভীষণ অসুস্থ। মামা কলকাতা ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন।
কোন মামা? যিনি সিনেমা তুলছিলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বোসো। সংসারের ঘোলা জলে সকলকেই ভাই হাবুডুবু খেতে হবে। কাল ঊষা একটা গান গাইছিল। ভারী সুন্দর! সবটা মনে নেই। যে কটা লাইন মনে আছে:
এসেছ যখন ভবে
থাকার মাশুল দিতে হবে।
কত ডুববে উঠবে জীবন তরী
চঞ্চলতা এনো নাকো ।।
আজ্ঞে, পুরো গানটাই আমি জানি।
তাই নাকি! তুমি গান জানো?
অল্পস্বল্প চর্চা ছিল। বাবা এসরাজ বাজান। মামা গাইয়ে। এ গানটা আমি ঊষাদির কাছেই শিখেছি।
তাই নাকি? আচ্ছা প্রথম লাইনটা সুরে শোনাতে পারো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। রোগ জানুক আর দেহ জানুক/মন তুমি আনন্দে থেকো/দেহাতীত হয়ে সদাই/আনন্দময়ীরে ডেকো ।।
যতদূর সম্ভব মোলায়েম করে প্রথম চারটে লাইন শুনিয়ে দিলুম। সংগীত এমন জিনিস, এম ডির চোখ ছলছল করছে। তিনি চেয়ার ছেড়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে পিঠে হাত রাখলেন। তসরের পাঞ্জাবির ঢোলা হাতা পিঠের কাছে খসখস করছে।
তুমি তো বড় গুণী ছেলে হে!
আজ্ঞে না, এমন কী আর গুণ? গান অল্পবিস্তর সব বাঙালির ছেলেই গাইতে পারে।
হে, তোমার অনেক গুণ। নিজের গুণ নিজে বোঝা যায় না। তোমাকে একদিন আমাদের বাড়িতে যেতে হবে। বেশ নির্জনে একপাশে বসে তোমার গান শুনব।
এম ডি নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, বুঝলে, ঊষা মেয়েটি বড় ভাল। দেবী। এসব মেয়ে ক্ষণজন্মা। লাখে এক। ওর কাছাকাছি এলে মানুষের ধর্মভাব হয়। নতুন দিগন্ত খুলে যায়। কত কী যে শেখার আছে ওর কাছে! পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত জায়গা, পলাশ। ছেড়ে চলে যেতে হবে এই যা দুঃখ। আর কি আসা হবে? আচ্ছা, তুমি ওই গানটা জানো, তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলে যে যাই।
ঠিক সুরে পারি না, তবে মাঝে মাঝে গাইবার চেষ্টা করি।
আহা, কী লেখা। দিনের শেষে ঘরে এসে লজ্জা যে পাই। বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে। নাঃ আমার দ্বারা আর ব্যাবসাট্যাবসা হবে না। যত দিন যাচ্ছে তত রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছি।
সে তো ভালই। শুষ্কং কাষ্ঠং না হওয়াই ভাল।
আর কি আমার সে বয়েস আছে, পলাশ! আমাদের ওই বৈদ্যুতিক চালুনি যন্ত্রটা কোনওদিন দেখেছ!
না স্যার।
আবার সেই বাঙালের মতো স্যার বলছ? ওই সম্বোধনে দূরত্ব বেড়ে যায়। হ্যাঁ যা বলছিলুম, যন্ত্রটা বড় মজার! প্রথমে এক পাশে কাত হয়ে কিছু জিনিস তুলে নিয়ে নাচাতে নাচাতে আর এক পাশে কাত হচ্ছে। একেবারে সঙ্গে সঙ্গে বড় দানার জিনিস গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। থাকছে ছোট দানা। যন্ত্র তখন সেইগুলোকে নাচাচ্ছে। একেবারে পৃথিবীর কায়দা। এক প্রান্তে প্রবেশ, আর এক প্রান্তে প্রস্থান, মধ্যে নাচানাচি। আমরা সেই বৃদ্ধের দল, নাচতে নাচতে লাফাতে লাফাতে নির্গমন-পথের দিকে চলেছি। দিন এলে রাতের প্রদীপ ম্লান হবেই। কোনওদিন দাবার চাল দেওয়া দেখেছ?
আজ্ঞে না।
বড় মজার দৃশ্য! ছক থেকে মুন্ডু ধরে দাবাড়ু একটি খুঁটি অল্প একটু তুলে এক পাশে কাত করে ধরে আছেন। চাল ভাবছেন। এগোতে গিয়ে পেছিয়ে আসছেন। খুঁটির যাবার সময় হয়েছে। ঘরে স্থির হয়ে বসা আর চলবে না। খেলোয়াড়ের দ্বিধায় যাব কি যাব না ভঙ্গিতে ঘর ছুঁয়ে আছে। ঠিক আমার অবস্থা, একটা পা উঠে পড়েছে। আর একটা পা উঠল বলে। ডালে বসে থাকতে থাকতে পাখির ওড়া দেখেছ?
