আরে রাখ!
নাবালক ছেলে, বাড়ি বসে হেঁশেল ঠেলিস, মেয়েরা যে কী কল বুঝবে সেদিন, যেদিন ছায়া, মায়া আর বিন্দুবালা একসঙ্গে চেপে ধরবে।
জানিস, আমি মেয়েদের পায়ের দিকে ছাড়া আর কোনও দিকে তাকাই না?
পা বেয়েই সুড়সুড় করে পিঁপড়ে ওপর দিকে ওঠে। ব্যাধ কাঠির ডগায় আঠা মাখিয়ে পাখি ধরে, জানিস তো?
সুখেন খুব খানিকটা জ্ঞান দান করে উঠে পড়ল। নতুন নেশা ধরেছে, সিগারেট। এখানে বসে অন্যান্য দিন গোটা তিনেক কেঁকা হয়ে যেত। ছাদে উঠে উত্তর দিকের আলসেতে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়িতে টোপ ফেলার চেষ্টা হত। অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চলছে। আমার জন্যেই বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না। সুখেন ব্যায়াম করে ভাগবে, কান ধরে নিলডাউন হব আমি। মেয়েটিও কম যায় না। মা আরও সাংঘাতিক। সেই যে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, মেয়েদের ঢং বেশ বুঝতে পারতুম। তাদের কথা, সুর নকল করতুম। কড়ে রাঁড়ি বাপকে উত্তর দিচ্ছে যা-ই। বারান্দায় মাগিরা ডাকছে, ‘ও তোপসে মাছওলা’। নষ্ট মেয়ে বুঝতে পারতুম। বিধবা সেজে সিঁথে কেটেছে আর খুব অনুরাগের সঙ্গে গায়ে তেল মাখছে। লজ্জা কম, বসবার রকমই আলাদা। আমিও আজকাল বুঝতে পারি ঠাকুর। ঈশ্বরকে চিনতে পারি না, হয়তো পারব একদিন, আর একটু ঝড়ঝাঁপটা খাই, মেয়েছেলের ব্যাপারস্যাপার বেশ ভালই বুঝি। উত্তরের ওই বাড়িটি বড় সুবিধের নয়। ওদিককার ছাতে পিতাঠাকুরের চন্দ্রমল্লিকার চাষ আবাদ। গোটা পঞ্চাশ টব বসানো আছে। তিনি ও তল্লাটে যান ছাতা মাথায় দিয়ে। তারস্বরে ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। কুহকিনীর হাত থেকে যেন শেক্সপিয়ারই রক্ষা করবেন, ক্যানস্ট দাও নট মিনস্টার টু এ মাইন্ড ডিজিজড। প্লাক ফ্রম দি মেমারি এ রুটেড সরো। একবার নিচু হয়ে বসতে পারলে শেক্সপিয়রের ছুটি। তখন গাছেদের সঙ্গে নানা সমস্যার আলোচনা। সবই তাদের জগতের। নাঃ তোমাকে আর বাড়তে দিলে না মানু। বুরুশ দিয়ে পাতার পিঠ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি কালো পোকা ঝাড়েন আর বলেন, ব্লাডি বাগারস।
Nothing begins, and nothing ends.
That is not paid with moan.
For we are born in other’s pain
and perish in our own.
মাথায় মাথায় তিনটে ম্যাগনাম সাইজের বউ। গতর যেন ফেটে পড়ছে। তেমনই বেশবাস। সখি আমায় ধরো ধরো। মালা পরো পরো। পুরুষ একজন। কদাচিৎ তাঁকে দেখা যায়। ঘাড়ে শাঁস বের করা চুলের ছাঁট। ঠোঁটদুটো পুরুপুরু। সিল্কের পাঞ্জাবি। দিশি ধুতি। তিনি যেন সবসময় এলিয়েই আছেন। মুখ সদাসর্বদাই হাসিতে তুবড়ে তাবড়ে আলুর পুতুল। সুখেন ঠিক জলেই চার করেছে। মাছের নাম জবা। বেশ খেলিয়ে মাছ। আমার তাতে কাঁচকলা। বেল পাকিলে কাকের কী? তবে এটাও ঠিক, এদিকে এত বড় একটা ছাত পড়ে থাকতে আমারই বা কী দরকার ঘেঁষটে ঘেঁষটে ওই উত্তরে যাবার? বিকেলে রোদ পড়ে এলে ঝারি নিয়ে ফুলগাছে জল দেওয়া আমার একটা ডিউটি। মাথা নিচু করে সেই কর্মটি সমাধা করে সরে পড়লেই হয়! তা হলে অত বারেবারে, আড়ে আড়ে তাকানো কেন? এ আবার কেমনতর ব্রহ্মচারী! ওই জবাসুন্দরীর জন্যে পিতাকে একদিন নির্ভেজাল মিথ্যে বলেছি। গাছে এসেছে ফুল। তার নাম স্নোবল। চুলে আয়েশ করে চিরুনি চালাতে চালাতে জবা নিজে থেকেই বললে, কী সুন্দর হয়েছে! ব্যস, আর যায় কোথায়? মনের সাঁকো নড়ে ঝপাত করে জলে। ফুলের ব্যাখ্যানা হল পনেরো মিনিট। জবা হেসে হেসে, চোখ বড় বড় করে, ছোট ছোট করে, মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে, খোঁপা করতে করতে শুনে গেল। যেন কতই মনোযোগী চন্দ্রমল্লিকার ছাত্রী! লাল ব্লাউজ আর হাত তোলাতুলির শোভা দেখতে দেখতে কুপোকাত। কোথায় ব্রহ্ম, কোথায় আদি অনন্ত! স্রোতের মুখে কুটো। সেয়ানা মন মাঝেমধ্যে খোঁচা মারছে, অ্যায়, কী হচ্ছে! আর একটা মন সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠছে, চোপ। একে বলে সৌন্দর্যের শিল্পীসুলভ কদর। নারীর সৌন্দর্য। কালিদাস বড়, না লোমপাদ মুনি বড়? র্যাফেল, দাভিনচি, না স্বামী অঘোরানন্দ! ঈশ্বর তা হলে মহিলাদের সৃষ্টি করেছিলেন কেন?
বাসশ্চিত্ৰং মধু নয়নয়োর্বিভ্রমাদেশ দক্ষং
পুষ্পেদ্ভেদং সহকিশলয়ৈর্ভুষণানাং বিকল্পান্।
লাক্ষারাগং চরণকমলন্যাসযোগ্যঞ্চ
কী বর্ণনা! আমার পিতাও তো এই রচনায় মুগ্ধ, বিমুগ্ধ, তড়িতাহত। কালিদাস, দি গ্রেট পোয়েট বলে আত্মহারা হয়ে যান। রূপ বর্ণনা মহৎ, রূপ দর্শন লাম্পট্য, এ যুক্তি কি জজে মানবে? তুই মনের আনন্দে তারিয়ে তারিয়ে জবাকে দেখ।
তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষ্যামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভিঃ শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনা স্তনাভ্যাং খেয়োদাত, বৃষকাষ্ঠ অধরপণ্ডিতও এই অংশটি আবৃত্তি করতে করতে রসে হাবুডুবু রাজভোগের মতো হয়ে যেতেন। কই ফণিবাবুকে কি কেউ এমন করে দেখে কাব্য করবেন,
নধরকান্তি ঘটোৎকচং
তিন তিসি লোটাগদানং।
সগুমফ গোলাকারং
টাকান্বিত তিন্তিড়িবৃক্ষং ॥
সেই জবাসুন্দরীকে সম্মোহিত হয়ে একটি স্নোবল উপহার দিয়ে ফেলেছিলুম। জীবনে প্রথম এবং আপাতত শেষ পাপকার্য। গভীর রাতে চোখ বুজলেই জবাসুন্দরীর রক্তরাঙা উন্নত ব্লাউজ। সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখ বুজলেই জবাকুসুমসঙ্কাশং, ঠিক সেই অবস্থা। অনুশোচনায় মরি আর কী? এ কী অধঃপতন। জবাকে কুসুম দেবার এত মালী ছিল যে আমার মতো কৃশকায় খেকুরে ছাদমালীকে আর মনেই রইল না। সেই ঘটনা থেকে বুঝেছিলুম, আমি একটি বোকাপাঁঠা। হয় বৃষকাষ্ঠ, না হয় কাঠিয়াবাবা হবার জন্যে জন্মেছি।
