আবার সেই রমণীয় রমণীয়তা। ঠাকুর বলতেন কাজলের ঘরে থাকলে গায়ে কালি লাগবেই। আমি যতই অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করি না কেন সেই ভাবনা আসবেই। যে বাঘ একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছে সে বাঘকে গুলি না-খাওয়া পর্যন্ত মানুষখেকো হয়ে ঘুরতে হবেই।
আঁচলের কেরামতি শেষ করে দু’হাতে জল ঢেলে দিয়ে ওপরে যাবার জন্যে সবে পা বাড়িয়েছি, কাকিমা এই যাঃ বলে কেমন যেন আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। কিছু একটা পড়ে যাবার টুকুস টুকুস শব্দ হল।
কী হল বলে ঘুরে তাকাতেই দেখলুম, দু’টুকরো সাদা মতো কী মেঝেতে পড়ে আছে।
ইস, এ কী হল পিন্টু! এতদিনের শাখা বেড়ে গেল আজ।
কী করে হল?
পাতকোর পাড়ে হাত রেখেছি, খেয়াল ছিল না। অসাবধানে চাপ পড়ে গেছে। ভীষণ অলক্ষণ। কেন ভেঙে গেল বলো তো!
কতদিনের পুরনো জিনিস! এতে অলক্ষণের কী আছে!
মেয়েদের ব্যাপার, ওসব তুমি বুঝবে না। তোমার সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে একজোড়া শাঁখা পরে আসব। আর বাবার নামে পুজো দোব। সকালে যাবে, না বিকেলে?
সকালে তো অফিস!
একদিন আমার জন্যে না হয় কামাই করলে।
সে খুব অন্যায় হবে।
অপর্ণা বললে কী করতে?
একই উত্তর দিতুম। কাজ আগে।
ওরে আমার কাজি রে! যাও ওপরে যাও। চট করে গা ধুয়ে নিই। এরপর আজ আর দম ফেলার সময় পাব না।
আমার সামনে গা ধোওয়া যাবে না?
সাতসকালে দুষ্টু দুষ্টু কথা বোলো না।
মাতামহ মশারির ভেতর শিশুর মতো নিদ্রাচ্ছন্ন। পিতার টেবিলে এখনও পাংশু বাতি জ্বলছে। টেবিলে মাথা রেখে নিদ্রাতুর। চারপাশে ছড়ানো বই। কোনওটা উপুড়, কোনওটা চিত। সবই হোমিওপ্যাথির বই। সারারাত এই নিয়েই কেটেছে। ভোরের দিকে টেবিলে মাথা রেখেছেন ক্লান্ত বীর। হাত বাড়িয়ে আলোটা নিবিয়ে দিলুম।
সুইচের শব্দ হতেই পিতা মাথা তুললেন। বললেন, সুপ্রভাত।
আজ্ঞে হ্যাঁ, সুপ্রভাত।
কী বুঝছ?
কীসের?
ওয়ান ডোজ, শেষরাতে জ্বর ছেড়ে গেল। এখন কেমন শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছেন!
কী করে হল?
মিরাকল। সিম্পলি মিরাকল। এ আমার চ্যালেঞ্জ। একটু চায়ের ব্যবস্থা করতে পারো! ওই মহিলাকে আর খাঁটিয়ো না। কাল সারারাত বেচারা চোখের পাতা এক করতে পারেনি।
যাচ্ছি, চা করে আনছি।
চা অবশ্য আমাকে আর করতে হল না। কেটলির খুটখাট শুনেই কাকিমা সব ফেলে ছুটে এলেন। হাত থেকে কেড়ে নিতে নিতে বললেন, থাক, খুব হয়েছে। যার কাজ তার সাজে অন্যের মাথায় লাঠি বাজে। গালে একটা ঠোনা মেরে দিলেন। সবে স্নান করে এসেছেন। হাত দুটো কী ঠান্ডা! মহিলার প্রাণে যেন নতুন জীবনের জোয়ার এসেছে। সুখ জিনিসটা কত ক্ষণস্থায়ী! কাকিমাকে দেখলে আমার আতঙ্ক হয়। ডাক্তার যখন জেনে ফেলেন রুগির রোগ ক্রমশই মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে প্রাণকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন তিনি দেখেন আর মনে মনে বলতে থাকেন, হেসে নাও, এ দু’দিন বই তো নয়। নেবার আগে প্রদীপ একবার তেড়ে জ্বলে ওঠে।
চা পর্ব চলেছে। ক্রুশেন সল্টের শিশি নেমে এসেছে টেবিলে। চামচেটা ভারী অদ্ভুত। বাইচ খেলার নৌকোর পাড়ের মতো আকৃতি। ছোট্ট এতটুকু। চিমটে পরিমাণ ওষুধ তোলার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। বেশিও না কমও না। ডিশে দু’চামচ ওষুধ ফেলে প্রথম চুমুক চা-টি পিতৃদেব স্বাস্থ্যসম্মত। করে তুললেন।
ডিশের চায়ে চুমুক মেরে মুখে যে কুঞ্চন উঠেছিল, দূরে কিছু একটা দেখেই সেইটাই হাসিতে রূপান্তরিত হল। মাতামহ বিছানায় উঠে বসেছেন। পিতা চেয়ার ঠেলে এগোতে এগোতে বললেন, কী, কেমন বোধ করছেন?
ভোরের প্রথম ফোঁটা ফুলের মতো।
ঠিক বলছেন?
কোনও ভুল নেই। শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ। এবার তা হলে অনুমতি দাও।
কীসের অনুমতি?
একবার ঘুরে আসি হরিদ্বার, লছমনঝোলা, হৃষীকেশ।
আপনি শিশুর মতো বায়নাদার হয়ে উঠেছেন। তারা কেবল খাব খাব করে, আপনি কেবল যাব যাব করছেন। আপনাকে আমি জলধর সেনের হিমালয় দিচ্ছি, বসে বসে পড়ুন। মানুষকে অত বঞ্চিত করতে চান কেন?
বঞ্চিত?
তা ছাড়া আবার কী? আমাদের একটু সেবার সুযোগ দিন।
সেবা!
মাতামহ খলখল করে হেসে উঠলেন। হাসি থামিয়ে বললেন, কত বছর বয়েসে আমাদের স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে বলো তো হরিশঙ্কর?
তা ঠিক, আমাদের স্ত্রীভাগ্য দু’জনেরই খুব খারাপ।
আমার ছেলেটাকে তো তুমিই মানুষ করলে!
ও কথা বলবেন না। ডোন্ট ফ্যান মাই ইগো। মানুষ হবে বলেই মানুষ হয়েছে। কেউ কাউকে মানুষ করতে পারে না।
অতসব আমি জানি না বাপু। আমি যদ্দিন বাঁচব তদ্দিন বলে যাব। তোমার গুণগান করে যাব।
আপনি না ঈশ্বরবিশ্বাসী?
ঈশ্বরবিশ্বাসী বলেই কোনও কোনও মানুষে ঈশ্বরদর্শন করি।
এই তো সারের সার উপলব্ধি। যে-ঈশ্বর আমার ভেতর সেই একই ঈশ্বর আপনার ভেতরেও। আপনার সেবা মানে ঈশ্বরের সেবা।
হরিশঙ্কর, সারাজীবন যে আমি বড় অবহেলা পেয়ে এসেছি। তাই ভেতরটা কেমন যেন কলসিতে রাখা সিল্কের কাপড়ের মতো কুঁকড়েমুকড়ে গেছে।
বিউটিফুল, বিউটিফুল। বড় সুন্দর উপমা। আমিও তা হলে বলি, ভালবাসার জলের ছিটে আর সেবার ইস্ত্রি দিয়ে আপনার রেশমের মতো সেই মনকে আমরা মোলায়েম করে দোব, মসৃণ করে দোব। বমিবমি ভাব আছে গেছে।
সে তো এখন বোঝা যাবে না, ব্রোঝা যাবে কিছু মুখে পড়লে।
আপনার ওষুধ এখন আমার হাতের মুঠোয়। পথ্যের ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। আচ্ছা এই যে আপনি পালাই পালাই করছেন, কালকের মতো বিদেশ বিভুঁইয়ে হঠাৎ জ্বর এলে কী করতেন?
