তারপর! মাঘ মাসের কোনও এক পবিত্র তিথিতে!
সুযোগ এসে গেল। এই অনুচ্ছেদটি যতবার পড়ি গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
‘জনপ্রাণীশূন্য কোন এক নিভৃত স্থানে অবিলম্বে আমরা পৌঁছিলাম। পরে আসনে উপবেশনপূর্বক কামিনীকে কিঞ্চিৎ অন্তরে অবস্থান করিতে বলিলাম।’
পূজারির সামনে যজ্ঞবেদি, যজ্ঞের কাঠ, ঘি, বেলপাতা, অতসী, জবা, অপরাজিতা, ধূপ, ধুনো, চন্দন। সময় দিবা দ্বিপ্রহর। শ্রীশ্রীচণ্ডীর কিছু অংশ পাঠ করলেন, গায়ত্রী জপ করলেন। যজ্ঞাগ্নি জ্বলে উঠল।
‘কামিনী আমার ইঙ্গিতানুসারে প্রহৃষ্ট অন্তরে অমনি উলঙ্গিনী হইয়া দাঁড়াইলেন। তখন দেবীর অভীপ্সিতা অতসী, অপরাজিতা, জবা, বিদল অঞ্জলি পুরিয়া মস্তকে ধারণ করিলাম। পরে চণ্ডীর যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা, ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চৈঃস্বরে পঠনান্তর পুনঃপুনঃ নমস্কার করিয়া, সঙ্গে সঙ্গে রমণীর নখাগ্র হইতে কেশাগ্র পর্যন্ত, প্রতি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থিরভাবে মনোযোগ পূর্বক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম। আশ্চর্য দেখিলাম– অকস্মাৎ উহার নাভিস্তর হইতে উরুদ্বয়ের মধ্যদেশ পর্যন্ত, গোলাকৃতি নিবিড় কালো ছায়ায় একেবারে আবৃত হইয়া পড়িল; মধ্যাহ্নে প্রশস্ত সূর্যালোকে চতুর্দিক আলোকিত। আচম্বিতে গৌরাঙ্গীর অঙ্গবিশেষে মহাকালীর আবির্ভাব হইল। বহুক্ষণ বারংবার দৃষ্টি করিয়াও, ঘন কৃষ্ণবর্ণের অন্তরালে দীপ্তিময়ী কাল বিজলীর ঝিকিমিকি ব্যতীত আর কিছুই দেখিলাম না। অসম্ভব দৃশ্য দেখিয়া আমার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইল।’
কিন্তু তারপর কী হল!
‘অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিলাম। তখন দেখিলাম, রমণীর গৌর মুখমণ্ডল রক্তিমাভ হইয়া ওষ্ঠাধর ঈষৎ কম্পিত হইতেছে; কুঞ্চিত নয়নে দৃষ্টিসঞ্চালন পূর্বক মনোহারিণী শোভা ধারণ করিয়াছেন। উহার পানে তাকাইয়া আমি মুগ্ধ হইয়া পড়িলাম। উঁহার চঞ্চল কটাক্ষে, তড়িৎ বেগে আমার ভিতরে কামোত্তেজনার সঞ্চার হইল।‘
None can reach heaven who has not passed through hell.
ব্রহ্মচারীজি গুরু শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে জিজ্ঞেস করছেন, রিপুর উত্তেজনা ক্রমশই যে বাড়ছে। যতই সাধন ভজন করছি ততই বাড়ছে।
গোস্বামীজি বলছেন, ‘ও রকম হয় নির্বাণের পূর্বে প্রদীপের মতো। আমার যখন ওইরকম হত, আমি কয়েক ঘড়া জল অমনি মাথায় ঢেলে দিতাম; কখনও বা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ায়ে হয়রান হলেই বুসে পড়তাম।’
একই ব্যাপার, এই লেফাফা-রমণীকে উলঙ্গ করলেই মনোহারিণী কটাক্ষে চিত্তচাঞ্চল্য। অভ্যন্তরে মুকু। কনকও থাকতে পারে। মেসোমশাইয়ের জীবনাতিরিক্ত জীবনের ইঙ্গিত থাকাও স্বাভাবিক। জল ঢালতে না পারি জলে ঢেলে দিতে পারি। বিসর্জনের এই তো প্রকৃষ্ট সময়। ঊষাকালেই তো যত মহৎ কাজ হয়। রাতের আততায়ী যাকে মেরে রেখে যায় তাকেও খুঁজে পাওয়া যায়।
বেরি দি পাস্ট। অতীতকে কবরখানায় ভরে দাও। খামটা হাতে নিয়ে নীচে নেমে গেলুম। গাছপালার বৃত্তের মধ্যে ইদারা সদৃশ আমাদের সেই বিশাল কুয়ো। যার মাঝামাঝি জায়গায় একটি সুড়ঙ্গের মুখ। যার ভেতর থেকে বলাইবাবুর অভ্যুত্থান। কুয়োর ভেতর এখনও রাতের অন্ধকার থিরথির করছে। মহাকাল যেন মুখব্যাদান করে রয়েছে। ব্রহ্মচারীজি, যা দেবী সর্বভূতেষু, বলে কামোত্তেজিতা কামিনীর অঙ্গে অতসী পুষ্প ছুঁড়ে মেরেছিলেন, আমি উত্তেজক লেফাফাটি মনের জোরে টুক করে ছেড়ে দিলুম। সেকেন্ড কয়েক সময়, জল স্পর্শ করার মৃদু শব্দ, যেন কোনও রঙিন পাখির ডানার আলতো শব্দ। মনে হল গলায় একটা পাথর বাঁধা ছিল। খুলে পড়ে গেল। জীবনের একটা চাপা অধ্যায় থেকে মুক্তি। বৃত্তে ঘুরছিলুম, আজ সেই বৃত্তের মুখ খুলে গেল। পাতার আড়ালে একজোড়া পাখি শুকশারীর গলায় যেন কথা বলছে। কী করলে, কী করলে!
সত্যিই, এ আমি কী করলুম! বহুতল বাড়ির ছাদ থেকে লাফ মেরে, বাতাসের মধ্যে দিয়ে পড়তে পড়তে আত্মহত্যাকারীর মনের যে অবস্থা হয়, আমার এখন ঠিক সেই অবস্থা। এ আমার কী ধরনের হঠকারিতা। আমি কি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী! আমি এক ভোগী যুবক। দীর্ঘ ভোগের পথ আমার সামনে। রমণীয় রমণী, সুস্বাদু খাদ্য, সুন্দর উপাধান, বিলাসের সামগ্রী, বংশ বিস্তারের অবাধ স্বাধীনতা। কেউ তো বলেননি, ওহে তোমাকে বুদ্ধ হতে হবে, মহাবীর হতে হবে, চৈতন্য হতে হবে। নির্দেশ তো, তুমিই মানব হও। কাগজের কী দাম? একটু সেন্টিমেন্ট। তৎক্ষণ থেকে ওঠা আবেগের তৎক্ষণ-বিলয়। কিন্তু আংটিটা! নিক্তির ওজনে যার দাম!
মানুষের লোভ! নির্লোভ নিষ্কাম হওয়া মুখের কথা নাকি! আংটির চিন্তায় মন একেবারে হাঁচড়পাঁচড় করে উঠল। এইরকম ছেলেকেই বলে সেন্টিমেন্টাল ফুল। ভাবার আগেই কাজ করে বসে। ঈশপস ফেবসের সেই দাড়িঅলা ছাগল। লাফাবার আগে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না।
সরসর করে পাতকোর বালতি নামিয়ে দিলুম। লেফাফা উদ্ধারের শেষ চেষ্টা। যদি তোলা যায়! বালতি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিকে-ওদিকে নানাভাবে চেষ্টা করলুম। কোথায় কী! কূপের শীতল জলে সমাধি। সব রহস্যের অবসান। জল সমেত বালতি তুলছি, পেছনে কাকিমা এসে দাঁড়ালেন, কী, মুখ ধোয়া হল! আমার হাতে একটু জল ঢেলে দাও তো।
হাতময় কয়লার কালি। উনুনে মনে হয় আগুন দিয়ে এলেন। ওপরদিকে তাকালুম। নীল আকাশে আমাদের বাড়ির সেই বিখ্যাত চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ফুঁসছে। ভোরের বাতাসে ধোঁয়ার রেখা এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। কাকিমা নিচু হতেই কাঁধ থেকে আঁচলটা সামনে লুটিয়ে পড়ল। কাকিমা বললেন, তুলে পিঠের দিকে পেঁচিয়ে দাও তো।
