বাড়ি পৌঁছেও মাতামহের কাপুনি থামল না। অতটা প্রবল না হলেও কাঁপছেন। সেই অবস্থাতেই আমরা বিছানায় শুইয়ে দিলুম। বেশ মোটা একটা চাঁদরের তলা থেকে মুখটি শুধু বেরিয়ে রইল। মুখে এক ধরনের হাসি, যেন পুরো ব্যাপারটাই বড় মজার। শরীর শরীর খেলা।
পিতা বলতে লাগলেন, ইমিডিয়েটলি ওষুধ।
টেবিলের ওপর রাখা নানারকম ওষুধ থেকে তিনি সঠিক ওষুধটি খুঁজতে লাগলেন। কাকিমা একপাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি চা খাবেন?
না, এত রাতে আর চা নয়। তুমি বরং একটু গরম জল আনন। ওঁকে চট করে একটু ওষুধ খাইয়ে, দিই।
ওষুধটা দেখিয়ে দিয়ে আপনি জামাকাপড় ছাড়ুন। আমি ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছি।
পারবে তো বউঠান?
আপনি দেখুন না পারি কি না।
পিতৃদেবের ওপরেও কাকিমার স্বাভাবিক একটা কর্তৃত্ব এসে গেছে। মেয়েরা চট করেই কেমন সংসারের হাল ধরে নেয়। ভয়ডরও কম।
মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, তুমি এবার সেরে নাও। রাত অনেক হল। তুমি আমার জন্যে অত ভেবো না। তোমার ভাবনা কে ভাববে গো?
কাকিমা বিছানার দিকে সরে গিয়ে সামনে ঝুঁকে মাতামহর কপালে হাত রাখলেন। পিতা সেদিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলেন, কী? গরম?
হ্যাঁ, সামান্য ছ্যাকহ্যাঁক করছে।
তুমি বরং দু’পাশে দুটো পাশবালিশ দিয়ে বেশ ঘন করে দাও। মাথার দিকের জানলাটা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। পায়ের দিকেরটা খোলা থাক।
কাকিমা মাতামহের দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কষ্ট হচ্ছে আপনার?
না বউমা, তেমন কষ্ট কোথাও হচ্ছে না। তোমরা সব খাওয়াদাওয়া করে নাও। আমি ততক্ষণ একটু বেড়িয়ে আসি।
বেড়িয়ে? কোথায় বেড়াতে যাবেন?
যেসব জায়গায় গেছি, সেইসব জায়গায় মনে মনে বেড়িয়ে আসি।
কাকিমা খাটের কাছ থেকে সরে আসতে আসতে বললেন, জ্বর বেশ বাড়ছে।
পিতা ইশারায় কাকিমাকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে গেলেন। ডক্টর সেন কী বলে গেলেন আমিও শুনেছি। শরীরের প্রধান একটি যন্ত্র বিকল হয়ে গেছে। যে-যন্ত্রের ওপর নির্ভর করছে। মানুষের জীবনমরণ।
কেমন এক গা-ছমছমে পরিবেশে রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হল। অনেকটা নমো নিত্যং ভঙ্গিতে। ঘড়ি জানিয়ে দিলে রাত বারোটা হল। কাকিমা আজ মাতামহের ঘরে মেঝেতে বিছানা করে শোবেন। পাশের ঘরে পিতৃদেব। দু’ঘরের মাঝের দরজাটা ভেজানো থাকবে। ওপাশে আমার ঘরে আমি। সাতসকালেই আমাকে বেরোতে হয়। আমার নাকি নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় ঘুমোনো উচিত।
পিতৃদেব বললেন, তুমি এখুনি আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ো। অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে। টেক কমপ্লিট রেস্ট। প্রয়োজন যদি হয় ডেকে তুলব।
কাকিমা বললেন, তুমি ঘরে যাও। তোমার দুধ আমি দিয়ে আসব।
দুধ? দুধ আমি খাই না।
তা খাবে কেন? খালি চা খেয়ে শরীর নষ্ট করবে।
পিতা বললেন, ঠিক হয়েছে, এইবার তুমি শক্ত পাল্লায় পড়েছ।
ঘরে এসে অবাক হয়ে গেলুম, কাকিমা কখন এসে পরিপাটি করে আমার বিছানাটি করে রেখে। গেছেন। আলোটা আপাতত নেবানোই থাক। জানলার বাইরে প্রশস্ত রাত। বাতাস আজ খুব। উতলা। কেন? কার জন্যে! কোথাও যেন একটা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আবার কি আসছে ঘাতক?
জানলার দিকে মুখ করে চেয়ার টেনে বসলুম। কালো আকাশের গায়ে জানলার গরাদ লম্বা লম্বা। লাইন টেনেছে। বহু দূরে শ্মশানের দিক থেকে সমবেত কণ্ঠ ভেসে আসছে। আসছে, বলো হরি হরি বোল। বামুণ্ডুলে প্রবীর ওপাশের বাড়িতে বেহালা ধরেছে। সরু সুতোর মতো সুর ভেসে আসছে। পৃথিবী ক্রমশই যেন নেতিয়ে পড়ছে। যারা পেরেছে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। যারা জাগবার তারা জেগে আছে।
ধীরে ধীরে ভেজানো দরজা খুলে গেল। পদশব্দ, কাঁধের কাছে কোনও স্পর্শ, কাপড়ের আঁচল থেকে উঠে আসা বাতাসের ঝাঁপটার অপেক্ষায় আড়ষ্ট হয়ে রইলুম। জোর করে একটা ভাবতন্ময়তা আনার চেষ্টা। দরজা থেকে জানলার কাছ, সামান্য ব্যবধান। সময় চলে যায়। কোথায়। কী? কেউ তো এলেন না। আর ধৈর্য নেই। ঘাড় ঘোরাতেই হল। ভেবেছিলুম অন্ধকার এই ঘরে একটি ছায়ামূর্তি দেখতে পাব। হাতে দুধের গেলাস। লাল মেঝের দিকে তাকালে দেখব সাদা দুটি পা। কোথায় কী! দরজার একটা পাল্লা সম্পূর্ণ খোলা। বাতাসে মৃদু মৃদু কাঁপছে। শূন্য বারান্দা সোজা চলে গেছে উত্তরে। দরজা খুলে গেছে, কেউ কিন্তু আসেননি।
ব্যাপারটা কী হল? দখিনা বাতাসে উত্তরের দরজা খোলে কী করে! যত গা-ছমছমে ব্যাপার কি আমার জীবনেই ঘটবে! বারান্দা পেরিয়ে মাতামহের ঘরে এলুম। খাটের এক পাশে পিতা, আর এক পাশে কাকিমা। মাতামহ বলছেন, আমার তানপুরাটা নিয়ে আয় পিন্টু। বাঁধ, আজ ডি-শার্পে বাঁধ। সুর দিয়ে বেটির চরণ ছোব। আহা! কী সুন্দর জায়গা। ওই দেখ, আকাশের গায়ে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়। হেসে হেসে আমার মা চলেছে। দে দে তানপুরোটা দে।
পিতা বললেন, কী হল বলো তো! এইটুকু সময়ের মধ্যে এত প্রবল জ্বর এসে গেল! ডিলিরিয়াম!
মাতামহ বললেন, আমি হারিনি, হরিশঙ্কর। আমি হারিনি। আমি এখনও দৌড়োচ্ছি। ঠিক পারব। পেরে যাব। আমার এখনও দম আছে।
কাকিমা বললেন, জলপটি দোব বটঠাকুর?
তার আগে থার্মোমিটার লাগাব?
কী দরকার! আমি হাতেই বুঝতে পারছি তিনের ওপর, চারের কাছাকাছি।
মাতামহ বলতেন, খুলে ফেল, খুলে ফেল, সিন্দুকের ডালাটা খুলে ফেল, ওরে গুপ্তধন আছে। গুপ্তধন।
