মাতামহ বিষণ্ণ হলেন। জগদম্বার ছবির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
পিতা বললেন, নিন, প্যাক আপ। আপনার আর এখানে থাকা চলবে না। এখানে থাকলে সেবা হবে না। কে দেখবে! ওষুধ আছে, পথ্য আছে।
বাহাদুর ঘুম-জড়ানো গলায় বললে, আমি পারব বাবু। আমাকে সব বলে যান।
তুমি পারবে। তোমাদের আমি ভীষণ বিশ্বাস করি, শ্রদ্ধা করি। তোমরা হলে গ্যালান্ট ফাঁইটার, তবে একটা কথা কী জানলে, একটু লেখাপড়ার জ্ঞান না থাকলে সব উলটে-পালটে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। তা ছাড়া ও বাড়িতে একজন সেবাপরায়ণা মহিলা আছেন। যদ্দিন আছেন তদ্দিন একটু দেখাশোনা করতে পারবেন। তারপর তো নিজেদের আপনজন এসেই যাচ্ছে। তখন আর আমাদের পায় কে?
মাতামহ বললেন, তার মানে?
আপনার নাতবউ আসছে। এই মাসেই আমি আশীর্বাদ সারব।
ও সেই মেয়েটি! একেবারে তুলসী কেটে বসানো। হরিশঙ্কর তদ্দিন আমি বাঁচব, কী বলে? এইতে তো আমার পরমায়ু, তাই না।
সোনালি একটা ওষুধের ফয়েল হাতে তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, একটা খেয়ে নেব এখন?
না, খালি পেটে নয়। কিছু খেয়ে তারপর।
অ’, তা আশীর্বাদে আমি যাব তো!
আপনি ছাড়া আশীর্বাদ হবে?
কী মজা! কী দিয়ে আশীর্বাদ হবে?
হিরের নাকছাবি।
ফাসক্লাস, ওই নাকে যা মানাবে না? তুলসীর নাকে একটা হিরের নাকছাবি ছিল, কী হল বলল তো?
পুড়ে গেল।
পুড়ে গেল?
হ্যাঁ, পুড়ে গেল। নাকেই ছিল, দেহের সঙ্গে ছাই।
হিরেও পোড়ে?
সব পোড়ে, সব পোড়ে। পৃথিবী একটা হোপলেস প্লেস। একটা জিনিসও থাকে না। সবই চলছে, চলেই যাচ্ছে। আমি পঙ্কজকে বলব, ও তোমার শীতের শেষফেস চলবে না, সুনার দি বেটার। আমি সময়কে বিশ্বাস করি না, ট্রেচারাস টাইম। আচ্ছা, আপনার কি দয়ামায়া নেই?
কেন? কেন?
আমি এখনও অফিসের জামাকাপড় ছাড়িনি। নিন উঠুন, আর কত দেরি করবেন?
আমি যদি কাল যাই হরিশঙ্কর!
আবার আপনি কালকে বিশ্বাস করছেন? এই মুহূর্তে আপনি কি জানেন, কাল কী হতে পারে আর না পারে! কেউ জানে? এই যে তুলসী ভীষণ দই খেতে ভালবাসত। কবিরাজ বলে গেলেন, বেশ আমি আর বাধা দেব না। চামচে দুয়েক ভাল মিষ্টি দই রুগিকে দিতে পারেন। সন্ধেবেলা বলে। গেলেন। আমি ভাবলুম, অত তাড়ার কী আছে, কাল সকালে দেওয়া যাবে। ভোররাতে তুলসী চলে গেল। রাসকেল কাল। আই হ্যাভ নো ফেথ অন হিম। বর্তমান ছাড়া আমি কিছু জানি না, জানতে চাই না। অতীত আমার স্মৃতিতে। ভবিষ্যৎকে আমি হাসিমুখে গ্রহণ করি। গেট আপ।
মাতামহ মিউমিউ করে একটা ছুতো বের করলেন, বাড়িটা হরিশঙ্কর এতটুকু একটা ছেলের ভরসায় ফেলে রেখে যাওয়া কি ঠিক হবে!
বড় আপনি বিষয়মুখী! কী সোনাদানা আছে যে চোরে নিয়ে যাবে! ভিত থেকে উপড়ে বাড়িটা তো আর চোরে নিয়ে যেতে পারবে না।
সঙ্গে কী কী নোব?
নিজেকে নেবেন। আর আমরা নোব ওষুধ। নাথিং লেস, নাথিং মোর।
রাত বেশ হয়েছে। তবু রিকশা পাওয়া গেল। একটু পরেই সিনেমার রাতের শো ভাঙবে। পাশেই সিনেমা হল। সব তীর্থের কাকের মতো সিটে পা তুলে বসে ছিল। রিকশা নিয়েও দু’জনের কিছু বচসা হয়ে গেল। মাতামহ বললেন, একটা রিকশাই যথেষ্ট। নাতিটাকে কোলে নিয়ে নোব। পিতা বললেন, না দুটো। দুটো, একটা, একটা, দুটো।
একজন রিকশাঅলা রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়েই রইল। আর একজনের ভাগ্য দুলতে লাগল। দুটো বলমাত্র সে তড়াক করে লাফিয়ে নামে, একটা শুনলেই সিটে উঠে পড়ে। পিতার সিদ্ধান্তের ওপর কারুর চড়ে বসার ক্ষমতা নেই। শেষে আমরা দুই এক ভাগে দুটো ঝকঝকে রিকশায় উঠে বসলুম। ফুরফুরে বাতাসে রিকশা ভেসে চলল। মাতামহ আমার পাশে। আমার একটা হাত নিজের মুঠোয় চেপে ধরে বললেন, কেমন আছিস রে?
ভাল দাদু।
আমার কী মনে হচ্ছে জানিস, আমরা যেন কলকাতার বাইরে চেঞ্জে এসেছি। তোর মনে হচ্ছে না!
আমারও তাই মনে হচ্ছে।
হ্যাঁরে, আমরা আর কোনওদিন একসঙ্গে বাইরে যেতে পারব না!
কেন পারব না? আপনি ভাল হয়ে উঠলেই আমরা মধুপুর কি শিমুলতলা যাব।
না রে, হরিদ্বার। সেই স্টেশন থেকে বেরোলেই মহাদেবের মূর্তি। মাথার ওপর এক হাত তুলে ঘটি ধরে জল ঢালছে। ওদিকে গঙ্গা বয়ে চলেছে, হর হর শব্দে। আহা, সে কী জায়গা রে! সব প্রদীপ ভাসিয়েছে ভক্তরা, ফুল ভাসিয়েছে। নেচে নেচে, ভেসে ভেসে চলেছে। সে কী দৃশ্য রে! হর হর গঙ্গে।
মাতামহ ভাবে বিভোর হয়ে গঙ্গা স্তোত্র আবৃত্তি করতে শুরু করলেন,
দেবি সুরেশ্বরী ভগবতি গঙ্গে
ত্রিভুবনতারিণী তরল তরঙ্গে।
শঙ্কর মৌলিনিবাসিনী বিমলে।
মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে ॥
হঠাৎ স্তোত্র থামিয়ে নিজের মনেই বলতে লাগলেন, ওঃ কত বছর বেঁচে আছি! পাগল বলে কিনা আমি রেকর্ড খারাপ করে দিলুম। একশোর আগে যাওয়া যাবে না। আমার দিন যায় বৃথা কাজে, রাত্রি কাটে নিদ্রায়। শূন্য জীবনে একশো বছর বেঁচে লাভ কী? তারা, কোন অপরাধে সংসারগারদে দাসখত লিখে নিয়েছ হায়! মাতামহ হঠাৎ ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন।
কী হল? আপনি কাঁপছেন কেন? জ্বর আসছে?
কাঁপতে কাঁপতে বললেন, মাঝে মাঝে আমার ওরকম হচ্ছে রে! ভয় নেই। তুই আমাকে একটু জড়িয়ে ধর। ঠিক হয়ে যাবে।
মাতামহ যেন শিশুর মতো হয়ে গেছেন। বেশ করে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলুম। আর সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে কেমন একটা পরিবর্তন এসে গেল। মনে হল দেবালয়ে কোনও পবিত্র বিগ্রহকে আলিঙ্গন করেছি। ধূপ, ধুনো, গুগুল, চন্দনের গন্ধ নাকে এসে লাগছে। তরঙ্গের মতো মাতামহের শরীর থেকে একটা কিছু আমার শরীরে চলে আসছে।
