আমি অবাক হয়ে বললুম, এই তো ভাল ছিলেন, এর মধ্যে জ্বর এসে গেল, এত প্রবল জ্বর!
তাই তো ভাবছি! আমার মনে হয় ডাক্তারের কথা শুনে মনোবল ভেঙে পড়েছে। মন দিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। নিয়ে এসো, জলপটিই নিয়ে এসো। তুমি পা দুটো দেখো তো!
চাদর তুলে পায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলুম, বরফের মতো ঠান্ডা। পিতা বললেন, জ্বর আরও বাড়বে। দেব নাকি এক পুরিয়া হোমিওপ্যাথি?
কাকিমা বললন, দিন না।
অ্যালোপ্যাথি চলছে।
চলুক।
টেবিলের ওপর ওষুধের বাক্স তুলে পিতা ওষুধ খুঁজতে লাগলেন। গোল গোল গর্ত থেকে একটি করে শিশি তুলছেন, লেবেল পড়ে ছেড়ে দিচ্ছেন, টুকুস করে শব্দ হচ্ছে। শব্দ মৃদু, কিন্তু এই পরিবেশে বড় ভৌতিক। যেন যমে-মানুষে দাবা খেলা চলেছে। কোলরিজের কবিতার লাইন মনে 9965: The naked hulk alongside camel And the twain were casting dicel The game is done! I have won! I have won! Quoth She, and whistles thrice.
চারটি মাত্র ওষুধের গুলি, তাও তিনটি গেল মুখে, একটি গড়িয়ে পড়ে গেল। পিতা বললেন, হবার হলে তিনটিতেই হবে।
দুটো বোতলে গরম জল ভরে পায়ের পাতায় সেঁক চলতে লাগল। ওদিকে জোয়ারের জলের মতো রাত ক্রমশই বাড়ছে। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব শব্দ উঠছে। কাদের বাড়ির শিশু কাঁদছে। ব্রঙ্কাইটিসের রুগি কেশে উঠছে। ছাদের আলসেতে বসে পেঁচা ডেকে গেল। বাসার পাখি রাত শেষ হয়েছে ভেবে দু’বার ডেকে উঠেই মায়ের পাখার ঝাঁপটা খেয়ে থেমে গেল। কে একজন ও মা করে ডেকে উঠলেন। প্রবল বাতাস থেকে থেকে চারপাশ দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। রাতের আসর খুব জমেছে।
রাত দুটো নাগাদ মাতামহ একটু শান্ত হলেন। জ্বরের প্রকোপ সামান্য কমেছে। অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছেন। বেশ জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস পড়ছে। শিশু যেমন ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে হেসে ওঠে, মাতামহের মুখেও সেইরকম হাসি খেলে যাচ্ছে। কিছু একটা হচ্ছে যা আমরা জানি না। মানুষ কখন যে কোন জগতে চলে যায়!
পিতা বললেন, নাও বউঠান, তুমি এবার একটু শুয়ে পড়ো।
পিন্টুর দুধটা স্টোভ জ্বেলে আর একবার গরম করে দিই।
তুমি এখনও দুধের কথা ভাবছ? মেয়েরা কাজের হলে যে কত কাজের হয়! তোমার স্বভাবটি ঠিক তুলসীর মতো। সংসার একেবারে মাথায় করে রেখেছ। আচ্ছা সে কোথায় গেল, প্রফুল্ল! বড় ভাবিয়ে তুললে তো!
কাকিমা করুণ মুখে বললেন, বটঠাকুর, আপনি একটু সন্ধান করবেন! তার তো কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই।
হ্যাঁ, এবার করতে হবে। আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। দাঁড়াও, এদিকটা একটু সামলে নিই। নাও, তুমি দুর্গা বলে শুয়ে পড়ো। আজ আর দুধের হাঙ্গামা করতে হবে না। ঘড়ি কী বলছে দেখেছ! রাত ফিকে হয়ে আসছে।
নিজের ঘরে ঢুকে কেমন যেন একটা অতিপ্রাকৃত অনুভূতি হল। আকাশে একখণ্ড সাদা মেঘ উঠেছে। গোটাকতক তারা নেমে এসেছে নীচে। দপদপ করে জ্বলতে জ্বলতে একটা উল্কা মাটির কাছাকাছি এসে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হতে লাগল, আমার ঘরের দেয়াল ছাদ সমস্ত ঘেরাটোপ অদৃশ্য হয়ে গেছে। মহাশূন্যে চেয়ার পেতে বসে আছি। প্রচণ্ড বাতাসে চুল উড়ছে। এলোমেলো। বিশালের এই অনুভূতি বেশিক্ষণ সহ্য করা গেল না। নিজেকে এত অসহায়, এত নগণ্য মনে হল, কেমন যেন একটা ভয় এসে গেল। নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে বুক কেঁপে উঠল। হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালতে জ্বালতে মনে হল, আমরা কীসের এত বড়াই করি, বিশাল শূন্যতায় মুঠো মুঠো প্রাণ অসংখ্য জোনাকির মতো জ্বলছে আর নিবছে। সৃষ্টিবৃক্ষের ডালে ডালে কখনও নাচছে, কখনও স্থির। ড্রয়ার টানার শব্দে নিজেই চমকে উঠলুম। তারছা আলোয় মুকুর সেই খাম। যেন এক জীবন্ত প্রাণী। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি। শেষ প্রহরের ঘণ্টা বাজছে। দূরে।
১.৫৫ হেসে নাও এ দুদিন বই তো নয়
খামটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। খুলব কি খুলব না। কত অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মনের গতি পালটে যায়। হঠাৎ দেহমুখী হয়ে উঠেছিল। আকার, আকৃতি, কণ্ঠস্বর, মহিলাদের অন্তর্বাস, অলংকারের শব্দ, শ্বাসপ্রশ্বাস, স্পর্শ যেন মধুর মতো মন-মাছিকে টেনে নিত। নিজেকে মনে হত প্রবৃত্তির অতলে এক বৃহৎ অক্টোপাস। সবকটা শুড় দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। মনের ম্যালেরিয়া হঠাৎ কোন কুইনিনে ছেড়ে গেল! ছেড়েছে, না আবার কেঁপে কেঁপে আসবে!
পিতৃদেব ঠিকই বলতেন, ঈশ্বরটিশ্বর জানি না বাপু, সার কথা হল নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্ব। দূরে বসে নিজেকে দেখো। যেই বেচাল দেখবে উঠে এসে কান ধরে মারো দুই থাপ্পড়। নিজের। শাসনে নিজেকে না রাখতে পারলে সব অনুশাসনই কাগজের ওপর কালো কালির হরফ।
আজ এই ঊষাকালে প্রথম বুঝলুম, এর চেয়ে সত্য আর কিছু নেই। কী আমি গুরু গুরু করে বাইরে ঘুরে মরছি। মন না রাঙায়ে কাপড় রাঙালে কী হবে যোগী! মন্দিরে তোর নেইকো মাধব শাক কুঁকে গোল করলি পোদো। মাধবকে আগে বসাতে হবে। যার পিতা এমন তার কি অমন হওয়া সাজে! সবাই বলে আমগাছে আমই হয়, আমড়া হয় না। তা হলে! তা হলে, এসব আমি কী ভাবি। কেন আমি ওসব করি! কী পাওয়া যায় ওতে! জীবনের পথ কোন মহাশিখরের দিকে চলে গেছে। অমৃতের পথ। আত্মোপলব্ধির পথ।
