তার মানে নশিয়া?
হ্যাঁ নশিয়া।
কী খাচ্ছেন তা হলে? আজ কী খেয়েছেন?
সত্যি কথা বলব?
সত্যিই তো বলবেন, তা না হলে চিকিৎসা হবে কী করে?
হরিশঙ্কর, তুমি রাগ কোরো না, আমি সত্যি বলছি। দুটো আলুর চপ আর একগাল মুড়ি।
দু’জনে সমস্বরে বললেন, আলুর চপ?
ওই যে বললুম, লোভ। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তারপর থেকেই পেট ফুলতে শুরু করল। বুকে পেটে এক হয়ে জয়ঢাক। খাদ্যটা বেশ বার করেছি কিন্তু। কম খরচে। একদিন খেলে দুদিন আর হাঁ করতে হয় না।
ডক্টর সেন বললেন, চা এখন থাক। আগে আপনাকে পরীক্ষা করি।
মাতামহ বললেন, একটা কথা বলব? তোমরা রাগ করবে না বলো? আমার নোটিশ এসে গেছে। ভেতরে যেখানে যা যেমন আছে, সেইরকম থাক। শুধু শুধু নাড়ানাড়ি করে লাভ কী? জমি থেকে গাছ উঠেছিল, শেকড় নামিয়েছিল, রস শুষেছিল, ডালপালা মেলেছিল, এবার শুকোবার পালা। দেখতে পাচ্ছি, কাঠুরিয়া আসছে কাঁধে কুড়ুল নিয়ে।
ঘরের বাতাস থমথমে হল। ডক্টর সেন বললেন, তবু তো বলে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।
পিতা হাত ধরে মাতামহকে চৌকির ছোবড়া-ওঠা বিছানায় বসিয়ে দিলেন। ডক্টর সেন এগিয়ে এসে নাড়ি টিপে ধরলেন। শুরু হল পরীক্ষা। বুক, পেট, পিঠ, পায়ের ফোলা পরীক্ষা। পিঠের দিকে কোমরের ওপরে ভীষণ ব্যথা। ডক্টর সেনের হাত পড়তেই মাতামহ কুঁকড়ে গেলেন। ফাঁস ফাঁস শব্দ করে প্রেশার মাপা হল। এই যন্ত্রটি দেখে মাতামহ ভীষণ আনন্দ পেলেন। হাতের ওপরে জড়ানো রবারের তাগাটি বারেবারে দেখছেন আর বলছেন, ঠিক যেন রেল কোম্পানির পোটার। বুকে একটা পেতলের চাকতি লাগালেই হয়। ফোঁস ফোঁস করে বাতাস ঠেলে, ফিস করে হাওয়া বের করে ডক্টর সেন যখন যন্ত্রের পারদস্তম্ভকে তুলছিলেন আর নামাচ্ছিলেন, তখন মাতামহের যেন আরও আনন্দ! প্রশ্ন করলেন, ডাক্তার, মানুষের ভেতরটা কি ঠিক এইরকমই ছটফট করে? লোভে, লালসায়, কামনায়?
শিরার ওপর স্টেথিসকোপের গোল ঠান্ডা চাকতি চেপে ধরে ডক্টর সেন নীরবে মাথা নাড়লেন।
১.৫৪ About, about, in reel and rout
রাত ধীরে ধীরে গড়াচ্ছে। ক’টা বাজল কে জানে। দশটা-টশটা হবে হয়তো! বাইরে বাতাস ছেড়েছে। নারকেল গাছের পাতা থেকে থেকে দুলে উঠছে। আমরা তিনটি প্রাণী গোল হয়ে বসে আছি। মাঝখানে পড়ে আছে একগাদা ওষুধপত্তর। কোনওটা সোনালি রাংতা মোড়া, কোনওটা রুপালি। ছোট বড় ওষুধের ফাঁইলে তরল টলটল করছে। পিতার মুখ অসম্ভব গম্ভীর। দরজায় পিঠ রেখে বাহাদুর তুলছে। মাতামহের মুখ যথারীতি প্রসন্ন। শিশু যেন চলন্ত গাড়ির জানলায় বসে জগৎ দেখছে।
হঠাৎ মাতামহ নীরবতা ভঙ্গ করলেন, তোমরা অত ভাবছ কেন বলো তো? যেতে হয় যাব। আবার ফিরে আসব, আবার যাব। একদিন তো যেতেই হবে হরিশঙ্কর। আজ আর কাল। কে থাকবে চিরকাল!
হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে আপনি একটা রেকর্ড নষ্ট করে দিলেন।
কী রেকর্ড! আমি তো কোনও কিছু নষ্ট করিনি।
আমার একটা গর্ব ছিল, আপনি অন্তত মিনিমাম নব্বই বছর থাকবেন, একশো হলে আরও খুশি হতুম। শুধু থাকা নয়, বহাল তবিয়তে থাকা। দাঁত থাকবে, চোখ থাকবে, হাত, পা, বুদ্ধি নিজের বশে থাকবে। আমার বিশ্বাস ছিল, আপনি হয়তো ফেল করবেন না। ইউ হ্যাভ মিজারেবলি ফেলড।
মাতামহ খুব আশা নিয়ে বললেন, তোমার কি মনে হয় পঁচাত্তর খুব একটা কম বয়েস?
পঁচাত্তর একটা বয়েস হল! বিদেশে পঁচাত্তর বয়সে প্রাইম মিনিস্টার হয়, প্রেসিডেন্ট হয়। গ্ল্যাডস্টোনের কথা ভাবুন। কেন চার্লি চ্যাপলিন! সত্তর না আশি বছর বয়েসে আবার বিবাহ। করলেন। জানেন, রাশিয়ার একটি অঞ্চলে মানুষের পরমায়ু দেড়শো, একশো আশি, দুশো। তার মানেটা কী? জীবনটাকে ভাগ করুন, শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়, বার্ধক্য। পঁচিশ বছরে তাদের দুধের দাঁত পড়ে, নতুন দাঁত ওঠে। পঞ্চাশে শুরু হয় যৌবন। আশিতে প্রৌঢ়, একশোতে বার্ধক্য। আপনি আমার মনোবল ভেঙে দিলেন। আমাদের ব্যায়াম, কুস্তি, আপনার সাধনভজন, উপবাস, সব, সব ভস্মে ঘি ঢালা।
মাতামহ অপরাধীর মতো মুখ করে বললেন, এবারকার মতো তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও হরিশঙ্কর। আর কখনও এমন হবে না। কেন এমন হল বলো তো!
ত্রৈলঙ্গস্বামী কত বছর বেঁচে ছিলেন মনে আছে?
সবাই বলে তিনশো বছর।
সেই জায়গায় সেভেন্টি ফাইভ! হোপলেস। আপনি আমাকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিলেন। এর চেয়ে বড় পরাজয় ভাবা যায় না।
তোমার কি মনে হয়, আমার অসুখটা খুবই খারাপ?
শরীরের দুটো মেজর পার্টস একেবারে নষ্ট করে ফেলেছেন। কমপ্লিটলি আউট অফ অর্ডার। আর আপনি এতই উদাসীন, ভেতরে এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে চলেছে, কিছু টেরই পেলেন না। ধরা পড়ল শেষ সময়ে। এখন কী হবে!
কেন? এইসব ওষুধ খাব। চুপ করে শুয়ে থাকব। যা তা খাব না। খাবার ইচ্ছে থাকলেও খেতে পারব না। আচ্ছা, আমার কী হয়েছে বলো তো?
আপনার কিডনি দুটো আর কাজ করছে না।
যাক গে, না করুক গে। চোখদুটো আর মাথাটা তো কাজ করছে। হাতদুটো দেখো, এখনও গুলো ফোলালে অনেক নবকার্তিক ঠিকরে বেরিয়ে যাবে। এ বয়েসে কিডনি নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় না। নাতিটা রয়েছে, বলা ঠিক হবে কি?
হ্যাঁ হ্যাঁ, ও এখন সাবালক।
মাতামহ ফিসফিস করে বললেন, হাবসি খোঁজাদের ও দুটো কেটেই দিত। আপদ একেবারে চুকেই যেত। পিতা হতাশ হয়ে বললেন, ও মাই গড! কোথায় কিডনি আর কোথায় কী! অ্যানাটমি সম্পর্কে কোনও জ্ঞানই নেই। হোয়্যার ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস, দেয়ার ইট ইজ ফলি টু বি ওয়াইজ।
