আজ্ঞে হ্যাঁ।
সামনে উঠে বোসো। ডক্টর সেন।
নামেই বাঙালি। চেহারায়, সাজপোশাকে পাকা সাহেব। টকটকে ফরসা মুখে সোনার ফ্রেমের চশমা। চোখদুটো চাপা অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে। গাড়ি মুখ ঘুরিয়ে মাতামহের বাড়ির দিকে ছুটল। আমার ডান পাশে ডাক্তারি ব্যাগ, যন্ত্রপাতি শুয়ে আছে। একটু পরেই লাফিয়ে উঠবে। গাড়িতে যেতে যেতে মনে হল, আমার জীবনে শূন্যতার পরিমাণ খুব বেড়ে গেছে, যে কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ছি ক্রমশই। আমি যদি মুটেমজুরও হতে পারতুম মনের চেহারা ফিরে যেত!
ডক্টর সেন খুব মৃদু স্বরে কথা বলেন। গলা কিন্তু বেশ গম্ভীর, একধরনের ঝংকারও আছে। ডক্টর সেন বললেন, কে দেখছেন?
পিতা বললেন, কেউ না। জীবনের এই প্রথম অসুখ।
বয়েস?
প্রায় সেভেন্টি ফাইভ।
একেবারে ভার্জিন সিস্টেম। দেন ইট উইল বি ইজিয়ার ফর মি।
সারাপথে এই কটিমাত্র কথা। দু’জনে দু’জনের ভাব নিয়ে বসে রইলেন। গাড়ির চাকা মাইল খেয়ে চলেছে। সংকীর্ণ পথ, বিশাল গাড়ি। সবেগে সদম্ভে ছুটতে পারছে না। গাড়ির রূপ দেখে দু’পাশের মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। আর আমার বেশ অহংকার হচ্ছে। মনে হচ্ছে সাধারণ স্তর থেকে কত ঊর্ধ্ব স্তরে উঠে পড়েছি। মনের কতরকম মতিভ্রম!
বাহাদুর এসে দরজা খুলে দিল। পিতা জিজ্ঞেস করলেন, বাবু কোথায়?
বুড়াবাবু পুজোয় বসেছেন।
পিতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ডক্টর সেন। তিনি কপাল কুঁচকে বাড়িটার দিকে তাকালেন। নারকেল পাতা ঝুলে এসেছে। বাতাসে ঝিরিঝিরি কাঁপছে। ভেবেছিলাম মাতামহ বোধহয় দোতলায় আস্তানা নিয়েছেন। না, তিনি যেখানে যে-ঘরে ছিলেন, সেই ঘরেই আছেন। সেই নারকেল গাছের তলায় আউট হাউসে। ঘরের মাঝখানে বসে আছেন আসনে স্থির হয়ে। মায়ের ছবি ঝুলছে দেয়ালে, একপাশে কাত হয়ে। জগদম্বার সঙ্গে মাতামহের বড় সুন্দর সম্পর্ক। মা কখনও ডান পাশে কাত, কখনও বাঁ পাশে, কখনও সোজা। কখনও আদর, কখনও গালাগাল।
দরজার সামনে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে। মাতামহ বসে আছেন আমাদের দিকে পেছন ফিরে। স্থির অচঞ্চল দীপশিখার মতো। পিতা আমাকে ইশারা করে বললেন, যাও, ভেতরে যাও, আসন। থেকে ভোলো। ভেতরে গিয়ে আসনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লুম। চোখদুটো বোজা। মুখে একটা অলৌকিক উদ্ভাস। অত্যাশ্চর্য একটা কিছু দেখে যেন পুলকিত! শ্বাসপ্রশ্বাস অতি ধীর। ডাকতে সাহস পেলুম না। এমন মানুষের জন্যে ডাক্তার কী হবে! তবু ফিসফিস করে বাতাসের সুরে ডাকলুম, দাদু। দ্বিতীয়বার ডাকতেই শরীরে একটা মৃদু কম্পন লাগল। তৃতীয়বার ডাকতেই মাতামহর চোখদুটো নীচের দিকে অল্প একটু খুলে গেল। যেন করমচা দ্বিধাবিভক্ত হতে চলেছে। লাল ভেলভেট। আমাকে দেখতে পেয়েছেন। মৃদু একটুকরো হাসি নেমে এল ঠোঁটের কোণে। দুটো চোখ এবার পুরো খুলে গেল। শ্রীরামচন্দ্রের চোখের মতো আরক্তিম। দু’কোণে, তলার দিকে জল টলটল করছে। সারামুখে এমন এক ধরনের হাসি, যে-হাসি মানুষ চেষ্টা করে হাসতে পারে না। বাঁ হাত মাথায় রেখে বললেন, কী রে কখন এলি?
আমি একা নই। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখুন।
মাতামহ খুব ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরালেন। কোনও উত্তেজনা নেই, তাড়াহুড়ো নেই। গন্তব্যের সীমায় পৌঁছে গেলে মানুষ বোধহয় এইরকমই মন্থর হয়ে আসে। শূন্য ঘট আর পূর্ণ ঘটে যে তফাত। মেঝেতে বাঁ হাত ফেলে শরীরকে বাঁ দিকে সামান্য মোচড় মেরে মাতামহ আসন ছেড়ে উঠলেন, কী ব্যাপার! তোমরা?
পিতা বললেন, হ্যাঁ, আমরা। ডক্টর সেন এসেছেন। আপনাকে পরীক্ষা করবেন।
আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।
পিতা বললেন, এখানে কেন? ওপরে গেলে হয় না?
হরিশঙ্কর, ইটাই যে আমার স্বস্থান।
ডক্টর সেন বললেন, এ ঘরেও কোনও অসুবিধে নেই।
মাতামহ বললেন, একটু আছে। তেমন সাজানো গোছানো নয়, তা ছাড়া পাখা নেই।
পাখা কী হবে? পাখার কোনও প্রয়োজন নেই। জুতো কি খুলতে হবে?
না না, জুতো পরেই আসুন। এ ঘরে সবই চলে।
ঘরে একটা হাতল-ভাঙা ধুমসো চেয়ার। পালিশ নেই। কাঠের দানা বেরিয়ে পড়েছে। চেয়ারে একটা কম্বলের আসন পাতা। মাতামহ চেয়ারটা দেখিয়ে ডক্টর সেনকে বললেন, বসুন।
আমরা বসলুম চৌকির ধারে। মাতামহ দাঁড়িয়ে রইলেন। পিতা বললেন, আপনি বরং শুয়ে পড়ুন।
মাতামহ ভয়ে ভয়ে বললেন, হরিশঙ্কর, এঁকে মনে হচ্ছে খুব বড় ডাক্তার। বড়লোকের ডাক্তার। অনেক টাকা ভিজিট। আমার যে ভীষণ লজ্জা করছে।
ডক্টর সেন বললেন, লজ্জার কোনও কারণ নেই। ডাক্তারদের চেহারা একটু ভারিক্কিই হয়। ইনি আমার মাস্টারমশাই। ছাত্রজীবনে এমন শিক্ষক পেয়েছিলুম বলেই আজ দাঁড়াতে পেরেছি। আমিও মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে।
মাতামহ যেন সামলে উঠলেন। খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। মুখে হাসি ফুটল, বললেন, তা হলে একটু করে চা হোক ভাড়ে।
হোক, আপত্তি নেই।
একটা করে নানখাতাই বিস্কুট।
সেটা কী জিনিস?
ওই যে গো, এত বড় বড়, সুজি আর মিষ্টি দিয়ে তৈরি করে, খাস্তা মুচমুচে।
আপনার তো বেশি মিষ্টি খাওয়া উচিত হবে না।
আমি তো খাব না। আমি তো কিছু খেতেই পারছি না।
কেন? কী অসুবিধে হচ্ছে?
ডাক্তার, আমি খুব ভোজনবিলাসী ছিলুম। অশিক্ষিত গেঁয়ো লোক যেমন হয় আর কী! লোভী। সেই লোভী বামুন এখন মরেছে। বেটি বললে, দাঁড়া, এমন করে দোব, যা মুখে দিবি সব অমনি গা গুলিয়ে বেরিয়ে যাবে।
