ব্রহ্মচারীজি এরপর লিখছেন, “উঁহার কোন চেষ্টায়ই বাধা দিতে আমি সাহস পাইলাম না। মনে হইল এই অবস্থায় উঁহাদের অসাধ্য কার্য কিছুই নাই। আমার কোন বিরুদ্ধ ব্যবহারে যদি উঁহার মর্মে ও অভিমানে আঘাত পড়ে, এখনই যুবতী আমার নামে কুৎসিত কথা বলিয়া, চিৎকার করিয়া দশজনকে একত্রে করিবেন, এবং মুহূর্ত মধ্যে আমাকে অপদস্থ করিয়া চিরকালের মতো। আমার অখ্যাতি অপযশ দেশে বিদেশে রটনা করিবেন। এক দিবস আমি বিষম বিপদ উপস্থিত বুঝিয়া আতঙ্কে অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম। ঠাকুর কতবার বলিয়াছেন– পুরুষ অভিভাবক : উপস্থিত না থাকলে কোন গৃহস্থের বাড়ীতে ক্ষণকালও অবিবাহিত যুবকের থাকা উচিত নয়।মনে হইল ঠাকুরের এই অনুশাসন বাক্য, সামান্য জ্ঞানে অগ্রাহ্য করিয়াই আজ আমি বিপন্ন হইলাম। তখন গুরুদেবের অভয়-চরণ স্মরণ করিয়া পুনঃ পুনঃ তাঁহাকে প্রণাম করিতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ কামিনী অতিরিক্ত সাহসে বিষম চঞ্চলতা প্রকাশ করিয়া অবশেষে “ও হরি! তাই তুমি ব্রহ্মচারী।” বলিয়া সলজ্জ হাসিমুখে অন্যঘরে চলিয়া গেলেন।
তারপর কী হল! নিজের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাইনি কাকিমা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন চা হাতে।– কী পড়ছ অত মন দিয়ে?
গম্ভীর গলায় বললুম, বই।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কী বই?
একটা বই।
বাবুর রাগ হয়েছে?
রাগ হতে যাবে কোন দুঃখে?
হ্যাঁ, হয়েছে তো। কাটা কাটা কথাতেই বোঝা যাচ্ছে। কী করব বলো? বুড়োর যেন ছেলেমানুষের মতো বায়না!
কাকিমা টেবিলের ওপর চায়ের কাপ রেখে আমার চেয়ারের পিঠে বুক ঠেকিয়ে মাথায় হাত রেখে দাঁড়ালেন। মাথার চুলে সরু সরু আঙুল খেলছে। চুড়ির শব্দ হচ্ছে রিনিঠিনি। শ্বাসপ্রশ্বাসে ঘাড়ের কাছে অতি কোমল কিছুর ওঠা-পড়া। গা শিরশির করছে। আয়েশে চোখ বুজে আসছে। শিথিল থেকে শিথিলতর হয়ে পড়ছি। কোমল অন্ধকার কম্বলের মতো ঘিরে আসছে চারপাশ থেকে। আমিও কি সাধক ব্রহ্মচারীর মতো এঁকে প্রণাম করব? পায়ে ধরব? পা যে বড় সর্বনেশে অঙ্গ। পদযুগলে যে আমার মাতৃদর্শন হয় না। মন যে অন্যভাবে উতলা হয়ে ওঠে।
চিবুকটি মাথার ব্রহ্মতালুতে রেখে, আলগা দুটো হাত আমার দু’কাঁধের ওপর দিয়ে বুকের কাছে। মৃণালকাণ্ডের মতো ফেলে, মহিলা বড় আদরের গলায় বললেন, কী, তুমি চা খাবে না?
আমার ভেতরে আমার মৃত্যু হল। রমণীর সোহগে গলে গিয়ে, শুভ্র সুগোল দুটি হাত নিজের মুঠোয় চেপে ধরে বললুম, নিশ্চয়ই খাব। না খেয়ে পারি!
চিবুকটা ঘষে দিয়ে, বুকের কাছে হাত খেলিয়ে কাকিমা বললেন, আমার লক্ষ্মী ছেলে। তুমি চা খাও, আমি আসছি। বুড়োকে ভাগাই।
ঘাড় ঘুরিয়ে কাকিমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে গিয়ে ছোট্ট চুল-ঘেরা কপালের দিকে নজর পড়ে গেল। কপালের মাঝখান থেকে টিপটা অনেকখানি ডানপাশে সরে গেছে। কেন গেছে? কী করে গেছে? নানা সন্দেহে মন আবার জল থেকে সদ্যতোলা এক মুঠো কুচো কঁকড়ার মতো লাফাতে লাগল। কাকিমা নীচে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়ালেন। সেই চেকচেক শাড়িটা আজ পরেছেন। স্বাস্থ্যেরও যেন কিছু উন্নতি হয়েছে। মুখ যেন মোমের মতো মসৃণ, কপালের দুটো পাশ ঝকঝক করছে। শাড়ির আঁটসাঁট বাঁধনে শরীরে অদ্ভুত এক ছন্দ খেলা করছে। দেখব না, দেখতে চাই না, তবু চোখ উড়ে যাচ্ছে।
রমণীরে, সৌন্দর্য্যে তোমার
সকল সৌন্দৰ্য্য আছে বাঁধা।
বিধাতার দৃষ্টি যথা
জড়িত প্রকৃতি সনে
দেব-প্রাণ বেদ-গানে সাধা!
এ আবার কোথা থেকে কী লাইন এসে গেল! পড়ছিলুম সাধকের সাধন-জীবনের বিভ্রান্তির কথা। আলো আসতে আসতে অন্ধকার ঘিরে এল। অবশেষে ব্রহ্মচারীজির কী হল–
‘আমি তখন স্পর্ধিত মনে ভাবিতে লাগিলাম–”ব্রহ্মচর্যের নিয়ম পালন করিয়া, নিশ্চয়ই আমার অপূর্ব শক্তিলাভ হইয়াছে; তাই ঈদৃশ ব্যাপারে আমি নির্বিকার অবস্থান করিতে সমর্থ হইয়াছি। আমি যথার্থই সাধনরাজ্যের পিচ্ছিল পন্থা অতিক্রম করিয়া, নিরাপৎ ভূমি লাভ করিয়াছি।” কিন্তু হায়, এই প্রকার অযথা অহংকারের কয়েকদিন পরেই আমার সর্বনাশ হইয়াছে বুঝিলাম। ঘটনার সূত্র ধরিয়া ধীরে ধীরে আমার ভিতরে আগুন লাগিল। বেড়াপাক বহ্নির কালধূমে দুর্লভ ব্রহ্মচর্যের উজ্জ্বল দীপ্তিকে অন্তর্হিত করিল। আমি পূর্বের অপূর্ব পবিত্র অবস্থা হইতে স্খলিত হইলাম।‘
বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কাঠ কাটার সময় যেরকম শব্দ হয় সেইরকম একটা শব্দ সদর রাস্তায় উঠেই থেমে গেল। গাড়ির দরজা বন্ধের শব্দ হল। আবার গাড়ি! আবার এই অসময়ে কে এলেন! চকোলেট রঙের নতুন একটা গাড়ি বাড়ির সামনে থেমেছে। বিদেশি গাড়ি। বেশ লম্বাটে চেহারা। এ গাড়ির পেট্রলেও বিদেশি সুবাস। পেছনের দরজা খুলে পিতৃদেব নেমে এসে ওপর দিকে মুখ তুলে তাকালেন। সোজা অফিস থেকে আসছেন। সেই ধরনের ব্যক্তিত্ব মুখেচোখে এখনও লেগে রয়েছে। পোশাক পরিচ্ছদ অনেকটা ডক্টর বি সি রায়ের মতো। চেহারাতেও বেশ কিছুটা মিল আছে।
এতক্ষণের সৎ-অসৎ চিন্তা মাখানো আমার মুখটি দোতলার বারান্দায় ঝুলে ছিল। আঙুলের ইশারায় নীচে ডাকলেন। যেন মুক্তি পেলুম! নিজের চেষ্টায় নিজের থেকে বেরোতে পারছিলুম না। ক্রমশই এক অতলান্ত ইন্দ্রিয়ের জগতে ডুবতে বসেছিলুম।
পিতা বললেন, তুমি প্রস্তুত?
